চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী কি সত্যিই ঘুষ ও দুর্নীতি কমাতে চান?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় বলেছেন, দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং এর অর্জনসমূহ সমুন্নত রাখতে সরকার দুর্নীতি বিরোধী লড়াই অব্যাহত রাখবে।

তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তা বিশ্বে বিরল। তাই জনগণ যেন সেবা পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বেতন যেহেতু বেড়েছে তাই ঘুষ-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।’

ঘুষ-দুর্নীতি কমাতে প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা অনেকটাই যেন হঠাৎ আলোর ঝলকানি। কারণ দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সমাজে এখন আর দুর্নীতি নিয়ে আর তেমন কাউকে কিছু বলতে শোনা যায় না। দুর্নীতি দমন কমিশন মাঝে মাঝে একে-ওকে আটক করে, নোটিশ পাঠায়, মামলা করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই কমিশন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনও আস্থার মনোভাব সৃষ্টি হয়নি। তুলনামূলকভাবে দুর্বল আমলা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থক ব্যবসায়ী ও খুচরা নেতাদের বিরুদ্ধে কমিশন মাঝে মাঝে ভূমিকা পালন করে বটে। কিন্তু ক্ষমতাধর আমলা, ব্যবসায়ী, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দুর্নীতির ব্যাপারে কমিশনকে মোটেও আগ্রহী মনে হয়নি। এদিকে প্রথাগত রাজনৈতিক বুলির বাইরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও উদ্যোগ নিতে সরকারের মধ্যেও খুব একটা উৎসাহ লক্ষ করা যায়নি।

জাঁকালো জীবনযাপন (ostentatious living) এবং দৃষ্টিকটু ভোগ (conspicuous consumption) বাংলাদেশে এখন দৃষ্টিকে পীড়িত করে না। যাদের জ্ঞাত আয়-ব্যয়ে বিরাট রকমের অসঙ্গতি আছে তাদের অনেকে যখন বিএমডব্লিউ, পোরশে, পাজেরো, ভলভো বা তার চেয়েও দামি গাড়ি গর্বভরে প্রদর্শন করেন এবং সেদিকে অনেকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তখন দুর্নীতির নিন্দনীয় দেহরেখা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়। আমাদের দেশে এক শ্রেণির মানুষের বিলাসবহুল জীবনযাপনের চিত্র দেখলে বোঝা যায়, তারা কতটা ভোগবিলাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বলা বাহুল্য, এই ভোগবিলাসের মূলে রয়েছে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ-সম্পদ।

সবচেয়ে যেটা ভয়ঙ্কর সেটা হলো, এই দুর্নীতি সম্পর্কে কেবল অভ্যস্ততা নয়, এক ধরনের মাইন্ড-সেটও গড়ে উঠেছে সমাজে। দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজরা অতীতের মতো আর সমাজের ঘৃণিত ব্যক্তি নয় বরং রোল-মডেল বা অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে এ ধরনের একটি বিকৃত মূল্যবোধ প্রবিষ্ট করাতেই সম্ভবত দুর্নীতি ও অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিত্ত-বৈভবের এক নগ্ন প্রদর্শনবাদ লক্ষ করা গেছে সাম্প্রতিক সময়ে। নানা ফিকিরে শুল্ক রেয়াতের সুযোগ ব্যবহার করে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির প্রতিযোগিতা, টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেল প্রতিষ্ঠা, বিঘাকে বিঘা জুড়ে বাগানবাড়ি নির্মাণ, বিদেশে দোকান-ফ্ল্যাট-মার্কেট-কমপ্লেক্স-রিসোর্টের মালিক হওয়া- এসবই ঘটেছে গত কয়েক বছরে।

অথচ দুর্নীতি আমাদের জীবনে নিত্যদিনের অভিশাপ এবং জাতীয় জীবনে এক বড় কলঙ্ক। দুর্নীতি দূর করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। শুধু মুখের কথায় দুর্নীতি দূর হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্র হচ্ছে দুর্নীতির সূতিকাগার। আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এটা করতে হলে সবার আগে নেতৃত্বকে সৎ হতে হবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন জনপ্রশাসনকে ধ্বংস করে ফেলেছে। প্রশাসনে যারা এখনও ‘করাপ্ট’ হয়নি তারাও ধান্ধাবাজ হয়ে গেছে। অফিসের কাজে তাদের উৎসাহ কমে গেছে। দলবাজি সরকারের পাওয়ারের স্ট্রাকচারের ভেতর ঢুকে গেছে। যারা ক্ষমতায় থাকে তারা কিভাবে চালাবে এর ওপর নির্ভর করে জনপ্রশাসন। রাজনীতিবিদরাই এর নিয়ন্ত্রক। কাজেই আন্তরিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া দুর্নীতি বন্ধ করা বা কমানো সম্ভব সম্ভব নয়।

আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি দমনে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য সবার আগে দরকার কোনও আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হলে তার চাকরির মেয়াদ তখনই শেষ করে দেওয়া। অকাল অবসরের পরেও তার পেনশন থেকে অন্তত বিশ শতাংশ করে টাকা কেটে নেওয়া। এ ছাড়া অভিযোগ ওঠার তিন মাসের মধ্যে তদন্তের অনুমতি বা অভিযোগ খারিজ করার রিপোর্ট দিতে হবে বিভাগীয় প্রধানকে। অভিযোগ কেন খারিজ করা হলো, তা যুক্তি দিয়ে জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও কেবিনেট সচিবের কাছে প্রতি তিন মাসে রিপোর্ট দিয়ে জানাতে হবে, কোনও আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তদন্তের অনুমতির বিষয়টি ঝুলে রয়েছে কিনা। দুর্নীতির মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ অ্যান্টিকরাপশন আদালত খুলতে হবে। দশ বছর বা তার বেশি সময় ধরে যে সব দুর্নীতির মামলার নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলি দ্রুত মীমাংসার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারক এবং নাগরিক সমাজের একজন বিশিষ্ট প্রতিনিধিকে নিয়ে কমিটি গড়তে হবে। এই কমিটিই মামলাগুলো বিবেচনা করে রিপোর্ট দেবে।

Advertisement

দরপত্র ডাকার বিষয়টিতে স্বচ্ছতা আনতেও সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা দরকার। ন্যায়পাল নিয়োগের বিধানও কার্যকর করা যেতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তাদের তদন্ত করার ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিদের এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে হবে।

প্রশাসনে বদলি, পদোন্নতি ও প্রচলিত নিয়োগ পদ্ধতি নীতিমালা অনুযায়ী না হলে দুর্নীতির জন্ম দেয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। এসব সমস্যা দূর করতে পারলে এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করে ওপরে ওঠার সুযোগ বন্ধ হলে প্রশাসনে হতাশা থাকবে না। দুর্নীতি দমনের স্বার্থে চিহ্নিত দলীয় এবং অযোগ্য কর্মকর্তাদের প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।

প্রত্যেক সম্পন্ন নাগরিকের জন্য কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। সময়মতো কর পরিশোধ যদি ন্যায়ানুগতা ও দায়িত্বশীল আচরণ এবং সামাজিক পুঁজির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়, তাহলে বলতে হবে বাংলাদেশে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা অতি নিম্নমানের। আয়কর না দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক বিরাট অপরাধ। কিন্তু বাংলাদেশে অন্তত আশি লাখ ব্যক্তি করের আওতায় আসার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে বারো লাখের বেশি কর দেন না। আমরা খাবারের বেলায় ‘হালাল’ খুঁজি, কিন্তু উপার্জনের বেলায় তা মানি না! এই স্ববিরোধিতা থেকে সরে আসতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীকে এমন একটা বার্তা দিতে হবে, দুর্নীতিপরায়ণ হলেই তাকে অবশ্যই সম্ভাব্য পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাহলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দুর্নীতির শাস্তিগুলো দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত। যদি কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাহলে যে কোনও জনস্বার্থের দায়িত্বসম্পন্ন পদে বা নির্বাচন থেকে বিশ বছর বিরত থাকার কঠিন ব্যবস্থা নিতে হবে। যাদের শাস্তি দেওয়া হবে তাদের সম্পর্কে জনমনে ঘৃণা তৈরি করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, দুর্নীতি প্রতি বছর আমাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির শতকরা অন্তত ৪%-৫% গ্রাস করে ফেলে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি মানুষেরই একটি সম্পদের বিবরণী থাকতে হবে। দেশে-বিদেশে যেখানেই তার সম্পদ থাকবে তার বিবরণ ওই হিসাবে থাকবে। কেউ তার কোনও সম্পদ বিক্রি করলে সেটি তার হিসাব থেকে বাদ যাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তা যে কিনবে তার হিসাবে যুক্ত হবে। এই পদ্ধতিতে ব্যাংক হিসেব থেকে শুরু করে আয়কর পর্যন্ত সবকিছুই একটি বোতামের নিচে নিয়ে আসা যাবে; আর এগুলো যদি ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় তবে সাধারণ জনগণ যেমন হয়রানির স্বীকার হবে না, তেমনি যদি কেউ কোনও রকম সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা করে তা ধরাও খুব সহজ হবে। এসব ব্যাপারে অনেক দেশ সফল হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

দুর্নীতিবাজ চেনা আমাদের দেশে খুবই সহজ। কে কতো টাকা আয় করেন, কিভাবে করেন-সরকারকে তা জানতে হবে। একজন ব্যক্তির কয়টা বা কতো টাকা দামের গাড়ি আছে, কয়টা বাড়ি বা ফ্ল্যাট আছে, কতো জমি আছে, তাদের সন্তানরা কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করেন, এসব প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার ব্যয় কতো, একজন ব্যক্তি কতোটা ভোগবিলাসি জীবনযাপন করেন-এসব লক্ষ করলেই বোঝা যায়, সে দুর্নীতি বা অবৈধ আয়ে চলে কিনা! প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই দুর্নীতি বন্ধ করতে চান, তাহলে সবার আগে মন্ত্রী-এমপিদের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসেব নিতে হবে। তারপর অভিযান শুরু করতে হবে সচিবালয়ে। সপ্তাহে না হলেও, মাসে অন্তত একবারও যদি মন্ত্রিপরিষদ কিংবা সচিব কমিটির সভায় দুর্নীতির বিষয়টি এজেন্ডা হিসেবে যুক্ত করেন, তাহলেও সুফল ফলবে।

আর হ্যাঁ, ভোগবিলাস নয়, ত্যাগের মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে। শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের দৃশ্যমান বিলাসিতা ত্যাগ করতে হবে। যে সম্পদ সমাজে দৃষ্টিকটু বৈষম্য ও সামাজিক উত্তেজনা বাড়ায়, তা চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সমাজের ভালোর জন্য হতে পারে না। যারা সমাজে নেতৃত্ব দেবেন তারা যদি আচরণে ও ভোগে সংযত থাকেন তাহলে সবার জন্য সেটা মঙ্গলময় হবে। আর প্রধানমন্ত্রীই এ ব্যাপারে পথ দেখাতে পারেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)