চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রতীকের আত্মহত্যার তদন্ত ও জড়িতদের বিচার দাবি

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান প্রতীকের আত্মহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও এ ঘটনার সাথে জড়িত শিক্ষকদের বিচার দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ এর ব্যানারে ‘মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ’ অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

মানববন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। ঢাবির বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকও তাদের সাথে সংহতি জানান৷ মানববন্ধন থেকে তারা প্রতীকের আত্মহত্যার তদন্ত সাপেক্ষে সুষ্ঠু বিচার ও প্রতীকের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান৷

উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন ড. সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, আমি একজন শিক্ষক হিসেবে বলছি এটা একটা খুন, এই খুনের দায় প্রতীকের বিভাগের কোনো শিক্ষক এড়াতে পারেন না৷

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চেয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কারো কাছে বিচার চাওয়ার সুযোগ নেই৷ আমরা আপনার কাছেই সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি৷

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীকরা আছে এবং প্রতিদিন তারা গুমরে গুমরে মারা যাচ্ছে। আমি মনে করি, একজন শিক্ষকের সব চাইতে বড়গুণ, সব চাইতে বড় যোগ্যতা তিনি কত ভালো ক্লাস নেন সেটি না। তিনি কত বড় পন্ডিত সেটি না। আমার বিবেচনায় এবং আমি যেটি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষকের সব চাইতে বড় গুণ হল তিনি তার শিক্ষার্থীদের কতটা ভালোবাসেন।

‘‘তাদের কতটা ভালো চান এটি দিয়ে হতে পারে একজন শিক্ষকের মূল্যায়ন এবং সে মূল্যায়নে আমার বিবেচনায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতীকের শিক্ষক যারা, তারা শূন্য নাম্বার পেয়েছে। আমার বিভাগের একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিবেন, আমি শিক্ষক থাকায় অবস্থায় এটা আমার পক্ষে মানা সম্ভব না। এই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম একজন শিক্ষার্থী তার সুপারভাইজার পাবেন না। এটা আমার বিশ্বাস করতে বোধ হয় না।’’

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনাকে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘এটা আমি তিনভাবে দেখেছি। আমি দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক যে রাজনীতি করেন, সে রাজনৈতিক মতাদর্শে কোনো শিক্ষার্থীকে তিনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে চান। অথবা তার বাড়ি কোথায়? এরকম খুবই জঘন্য একটা ব্যাপার, এটা তো বিশ্ববিদ্যালয় হয় না, এটা তখন আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়। আর দ্বিতীয় বিষয় যেটা সেটা হলো ব্যক্তিগত আনুগত্য। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকের প্রতি কতটা আনুগত্য থাকবে। অথচ আমরা মনে করি, জ্ঞানের চর্চা হতে হবে উম্মুক্ত জায়গায় মুক্তভাবে, বদ্ধ জায়গায় জ্ঞানের চর্চা হয় না। সে জায়গাটি আমরা নির্মাণ করতে পেরেছি?’’

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, শিক্ষকদের কথা শুনলে সবারই শ্রদ্ধা চলে আসে, কিন্তু এরকম ঘৃণ্য কথা শুনলে শ্রদ্ধা না এসে লজ্জা আসে৷ এ ঘটনা যদি আংশিক সত্য হয় তাহলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোনো শিক্ষক এর দায় এড়াতে পারেন না৷

তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়৷ যে কোনো সমস্যা নির্দিষ্ট নিয়মে সমাধান করতে হয়, আত্মহত্যার মাধ্যমে নয়৷

ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক কাজী নাজনীন চৌধুরী বলেন, একজন মা হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে এবং একজন বোন হিসেবে এ ঘটনা খুবই কষ্টের৷ আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি৷

তাইফুর রহমান প্রতীকের বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাওহিদা জাহান খোলা চিঠিতে বলেন, ‘জিইবি বিভাগে গত নিয়োগে অনার্সে ১ম ছাত্রকে শিক্ষক হিসেবে নেয়া হয়েছে৷ কিন্তু এবার তারা বিজ্ঞাপনে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও কেন ভাইবা কার্ড দেননি? কিন্তু আমরা সে বিষয়ে কিছু বলিনি৷ আমার ভাই কেবল অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই আবেদন করেছিল৷ একজন সুপারভাইজার কীভাবে তার ছাত্রকে আবেদন করতে মানা করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর আমার শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় নেই৷ তবু আমরা সেটি হাসি মুখে মেনে নিয়েছি৷ আমাদের পরিবার থেকে আমার ভাইকে পড়াশুনা করতে বলা হয়েছে৷’

যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাকিম আরিফ এর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন সাদেকা হালিম। ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. সালমা নাসরীন প্রমুখ।

তাইফুর রহমান প্রতীকের মাস্টার্সের পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সেখানে প্রতীক অনার্সে ৩.৮২ সিজিপিএ নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তবে মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টারে তার সিজিপিএ কমে ৩.৫৮ হয়। আর দ্বিতীয় সেমিস্টারে তার সিজিপিএ নেমে হয় ৩.০৮। মাস্টার্সে দুই সেমিস্টার মিলিয়ে মেধাতালিকায় ৭ম স্থান অধিকার করেন।

সাধারণত স্নাতকে ৩.২৫ সিজিপিএ পেলে একজন শিক্ষার্থী তার মাস্টার্স কোর্স চলাকালীন নির্দিষ্ট বিষয়ের থিসিসের জন্য বিভাগে আবেদন করতে পারেন। সেই থিসিসের সুপারভাইজার হিসেবে বিভাগের কোনো শিক্ষক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সুপারভাইজার নম্বর কম দেওয়াসহ একাধিক শিক্ষকের মানসিক নির্যাতনের ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।