চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রণব মুখার্জী: গ্রামের পল্টুর রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার গল্প

এক গ্রামের ছেলের লড়াই। যদিও আজ তিনি দেশের, দশের। তবুও বীরভূমের এই বাঙালির লড়াইকে মনে রাখবে পুরো ভারত।

১৩ সংখ্যাটিকে সাধারণত ‘আনলাকি’ হিসেবেই মানে বাঙালিরা। তবে এই ১৩ সংখ্যাটিকেই সৌভাগ্যের রাস্তা হিসেবে দেখতেন। তিনি ভারতীয় রাজনীতির চাণক্য। দুর্ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে তাঁকে সৌভাগ্যে পরিণত করার দক্ষতা সবার থাকে না। তবে বীরভূমের কীর্ণাহারের মিরাটি গ্রামের এক ছাপোষা বাড়ির বঙ্গ সন্তানের তা ছিল। যিনি ভারতের সফল ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি। প্রণব মুখোপাধ্যায়। বহুত্ববাদে তিনি বিশ্বাসী। আলোচনায় রাজনীতির শেষ কথা, তিনি বলতেন। এনিয়ে তাঁকে কংগ্রেসের ঘরে বাইরেও বহুকথা শুনতে হয়েছে। তবুও তিনি লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল।

বিজ্ঞাপন

উল্টো স্রোতে ভাসার চরম দক্ষতা নিয়েই বহু সাধারণের মধ্য থেকে তিনি অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন ক্রমশ ভারতীয় রাজনীতির গণ্ডিতে। তাই সম্ভবত তাঁর ভাবনার গতিপ্রকৃতিও আশপাশের বহু সাধারণের চাইতে অনেকটাই আলাদা ছিল। সে কারণেই বাংলা তথা জাতীয় রাজনীতির ‘চাণক্য’ বলে তাঁকে সম্মানিত করা হতো। নিজের দল কংগ্রেস তাঁকে বহু সময়ই ‘ডিজাস্টার ম্যানেজার’ হিসেবে পেয়েছে। পাল্টাতে থাকা রাজনীতির পরতে পরতে কীভাবে দাপট ধরে রাখতে হয়, তা আগামীকে চিনিয়েছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। আর সেকারণেই কংগ্রেসের হাইকমান্ডে বহু দুর্যোগে কখনও ডাক এসেছে ‘প্রণবদার’ জন্য, আবার দুর্গাপুজোর চণ্ডীপাঠের জন্যও বীরভূমের কীর্ণাহারের মিরাটির বাড়ি থেকে ডাক এসেছে আদরের ‘পল্টু’র। সদাহাস্য সেই মুখ। চণ্ডীতলায় পুজো সেরে কথা বলছেন গ্রামের মানুষের সঙ্গে। সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। গ্রামের পল্টুর রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার গল্প।

বীরভূমের কীর্ণাহারের কাছেই মিরাটি গ্রাম। গ্রামে মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজো অনেক পুরোনো। বাড়ির আদি পুরুষ কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় বহু বছর স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য লড়েছেন। জেলবন্দি ছিলেন দশ বছর। সেই কামদাকিঙ্করের ছেলেই প্রণব মুখোপাধ্যায়। ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর যাঁর জন্ম গ্রামে।

বীরভূমের সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস ও আইন শাস্ত্র ছিল তাঁর বিষয়। স্নাতোকোত্তর পাশ করার পর তিনি বিদ্যাসাগর কলেজে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ছিলেন। এক কালে সাংবাদিকতাতেও হাতেখড়ি হয় তাঁর। ‘দেশের ডাক ‘ নামক সংবাদপত্রে তিনি কয়েক বছর কাজ করেন।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক পরিবারে ছোট থেকে মানুষ প্রণব মুখোপাধ্যায় রাজনীতির পরতে পরতে নিজেকে সজাগ রেখেছেন। কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর আত্মিক যোগ পরিবার সূত্রে। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রথমবার কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্যসভায় যোগ দেন। তারপর ১৯৭৫ থেকে ৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩ সালে কেন্দ্রীয় শিল্পোন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের দোর্দণ্ডপ্রতাপ হিসেবে পদার্পণ শুরু করেন।

ইতিহাস, আইন আর রাষ্ট্রবিজ্ঞনের ছাত্র প্রণব মুখোপাধ্যায় বহু বছর ভারতের অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন, দক্ষতায়। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল এই দায়িত্ব তাঁকে বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। সেই সময় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫ অর্থমন্ত্রীর তালিকায় ছিলেন প্রণব।

ইন্দিরা গান্ধি নিহত হওয়ার পর রাজীব গান্ধী কংগ্রেসের মসনদে আসতেই ধীরে ধীরে হাত শিবিরের মূল স্রোত থেকে সরে যান প্রণব মুখোপাধ্যায়। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তাঁকে কতটা কুঁড়ে খেয়েছে তা বলাই বাহুল্য। রাষ্ট্রীয় সমাজবাদি কংগ্রেস নামে আলাদা দলও তিনি গঠন করেন। এরপর রাজনীতির অলিন্দে তাঁর সোচ্চার আত্মপ্রকাশ হয় পিভি নরসিমহা রাওয়ের হাত ধরে। প্রধানমন্ত্রী রাও পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের পদে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে বসান। ফের মন্ত্রিসভাতেও তাঁকে ফিরিয়ে নেয় কংগ্রেস।

২০০৪ সালে জঙ্গিপুর আসন থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি রূপে প্রণব মুখোপাধ্যায় সংসদে পা রাখেন। সেই নির্বাচনে অধীর চৌধুরি ও প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জুটি কার্যত মাতিয়ে দেয় কংগ্রেস হাইকমান্ডকে। এরপর বিভিন্ন সময় দেশের প্রতিরক্ষা, অর্থ, বিদেশ, জাহাজ, পরিবহন শিল্প সংক্রান্ত মন্ত্রকের মন্ত্রী হয়েছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।

বাঙালিকে যে গর্ব আগে কেউ দিতে পারেননি, তাই দিয়েছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখোপাধ্যায় শপথ নিতেই তিনি প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গ ইতিহাসেও জায়গা করে নেন। কীর্ণাহারের মিরাটি গ্রামের ছাপোষা বাঙালি ঘরের সন্তান প্রবেশ করেন ভারতের রাষ্ট্রপতির রাজভবনে। সে সফরের পরতে পরতে লড়াইয়ের বহু দাগ। আজীবন দেশ বিদেশ থেকে বহু সম্মাননা প্রণব মুখোপাধ্যায় পেয়েছেন। সম্মানিত হয়েছেন পদ্মবিভূষণে। সম্মান পেয়েছেন ভারতরত্ন’র। দুই সন্তান শর্মিষ্ঠা ও অভিজিৎকে সঙ্গে নিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় ও স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের জীবন আগাগোড়াই ছিল মিডিয়ার লেন্সে। তবে স্ত্রী বিয়োগের পর থেকে খানিকটা রাজনৈতিক ভাবধারায় বদল দেখা যায় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জীবনে। মোদী সরকারের প্রথম দুবছরের মাথায় তিনি কংগ্রেসি ভাবধারায় বিশ্বাসী হয়েও, গিয়েছিলেন বিশ্বহিন্দু পরিষদের সভায় বক্তব্য রাখতে।

সোমবার বিকেলে ২১ দিনের লড়াই শেষে, তিনি দিল্লীর সেনা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। মঙ্গলবার দিল্লীতে তাঁর শেষ কৃত্য।