চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রচ্ছদে শিল্পের নামে চলছে কারসাজি

বাঙালির সপ্তম ঋতু (পর্ব-১৬)

কম্পিউটার থেকে প্রিন্টের নির্দেশ দিলেই মূদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে কাগজে ছাপা হয়ে যায়। ছাপা কাগজ ভাজ করে ওপরে একটি কাভার লাগিয়ে বাঁধাই করলেই বই। হয়ে গেল কাগজের লেখা থেকে বই। আর কোনো যাদুবিদ্যা নেই বইয়ের ভূবনে। ভেতরের মাল-মশলা লেখকের ভাবনা। তার সঙ্গে বইয়ের হয়ে ওঠার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রচ্ছদের ছবি দেখে মানুষ বই কিনে ফেলে, তাই প্রচ্ছদে আকর্ষণ রাখা হয়। কী সেই আকর্ষণ? ছবির ভেতরে ছবি? ছবির কাব্যিক ফিউশন? নাকি রঙের খেলা? আমাদের শিল্পভূবনে প্রচ্ছদ শিল্পের দিকপাল কাইয়ুম চৌধুরির আঁকা প্রচ্ছদ বইয়ের উপজীব্য তুলে ধরেছে। প্রচ্ছদই বইটিকে মহিমান্বিত করেছে। সেইসব কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিখাদ প্রচ্ছদ শিল্প রচনা করছেন কেউ কেউ। কবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা অনুসৃত হচ্ছে না।

কম্পিউটার এক যাহাবাজ জিনিশ। মানুষের ইতিবাচক ক্ষমতাকে সে যেমন তীক্ষ্ণ করে তুলতে পারে, বিরাট দরজা খুলে দিতে পারে নেতিবাচক ক্ষমতারও। আর গুগল হচ্ছে এক সমুদ্র। যেখানে স্বচ্ছ পানি যেমন আছে। নোংরা পানিও আছে। ভেতরেই আছে আবর্জনার ভাগাড়। বাণিজ্যসন্ধানীরা অনলাইনে পৃথবীর সবকিছুর সহজ সমীকরণ দিয়ে রেখেছে। আপনি কী করতে চান? গুগলের সব সমর্থন পাবেন। বইয়ের কাভার তো মামুলি ব্যাপার। কোটি কোটি ছবি আছে গুগলে। সুবিধামতো বের করে নিন। গ্রাফিক্সে একটির মাথা আরেকটির লেজ আকাশ কুসুম চিন্তা নিয়ে বসিয়ে দিন, যার কোনো মানে নেই সেটিই হয়ে উঠবে সবচেয়ে অর্থবোধক। এমন ধারণাকে সম্বল করে অসংখ্য প্রচ্ছদশিল্পী পয়দা হয়ে গেছে। তাদের কাছে শিল্প এমন এক বিষয়, মূর্ত করতে পারলে দামী, আর বিমূর্ত করতে পারলে মহামূল্যবান। তারা জানে যা এক নিমিষে বোঝা যায় না, তাই বিমূর্ত। ব্যবসা জমে গেলে, তাকে আর পায় কে? শিল্পেরও মাস্টার হয়ে যায় সে।

Reneta June

এখন এইসব প্রচ্ছদের ছড়াছড়ি। দেশের প্রকাশনা বাণিজ্যর সবচেয়ে বড় আড়ত বাংলাবাজারে রাতারাতি কত উপায়ে যে বই তৈরি হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই। দেখা যাচ্ছে একাধিক প্রকাশক একই বই প্রকাশ করছে ভিন্ন ভিন্ন নামে। প্রচ্ছদ আলাদা, নাম আলাদা। কখনও লেখাও ভিন্ন ভিন্ন নামের। বাংলাবাজারে বই নিয়ে এত বৈচিত্র্যময় (?) নেতিবাচক কাজ হয়, তার কোন ইয়ত্তা নেই।

বিজ্ঞাপন

এই ইস্যুতে অন্যসব বিষয়ের গভীরে যাওয়ার দরকার দেখছি না। প্রচ্ছদ নিয়ে প্রচ্ছদ শিল্পীরা বেশ হতাশ। তারা বলছেন, পুস্তক প্রকাশনা শিল্পের যতখানি উৎকর্ষ ঘটেছে তার সঙ্গে প্রচ্ছদ শিল্প যথাযথ সঙ্গত করতে পারছে না। তার মানে যন্ত্র সহযোগে প্রচ্ছদ তৈরি হচ্ছে বেশি। সেখানে শিল্পীর আঁকা ছবির ব্যবহার কম। সেখানে শিল্পের নামে এক ধরণের কারসাজি চলছে। এতে লেখক বা লেখার তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, লাঞ্ছিত হচ্ছে প্রচ্ছদ শিল্প।

বলতেই হবে কোনো কোনো শিল্পীর হাত ধরে প্রচ্ছদ শিল্প আধুনিক মুদ্রণ যুগের প্রতিনিধিত্ব করছে। তারা শিল্পের ধারাবাহিকতা রেখে চলেছেন। ধ্রুব এষ এর কথা বলতেই হবে। বলতে হবে সব্যসাচী হাজরার কথা। আরো অনেক শিল্পী রয়েছেন এই শিল্পে। তারা গভীর যত্নে কাজ করে চলেছেন। প্রচ্ছদ শিল্পকে এগিয়ে নিতে তাদের পরীক্ষা নীরিক্ষারও শেষ নেই। কিন্তু তাদের শিল্প চিন্তা ও মর্যাদা রক্ষায় গুগল করা ছবিতে ইচ্ছেমতো ফোটোশপ করে প্রচ্ছদ বানানোর কারসাজি বন্ধ হওয়া দরকার।