চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পাখিদের জন্য শোকগাথা

এখানে আমাদের কোনো অপরাধ নেই দৃশ্যত, তারপরও মনটা বিক্ষিপ্ত অন্তহীন অপরাধের গ্লানিতে। একসঙ্গে এত পাখির শবদেহ। বাতাসে বাতাসে কত যে শোকাহত পাখির কান্নার রোল, হিসাব নেই। পাখিদের স্বজনেরা নিশ্চয়ই মাথা কুটছে এখানো সেখানে। কেঁদে ভাসাচ্ছে বুক। আহা বেলাবেলি মাঠ ঘাট পেরিয়ে ঝড় বৃষ্টিহীন শান্ত নিরিবিলি কোনোখানে পালানো গেলে হয়তো বরণ করতে হতো না এমন মৃত্যু।

একসঙ্গে পঁচিশ হাজার ঘুমন্ত পাখির ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসেছিল হানাদার হয়ে। আর ওই রাতটি হয়েছিল কালরাত। সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ঢলনগর গ্রামের বেশ কয়েকটি রাস্তায় সারি সারি পাখিশব। পথিকের চলার পথ রুদ্ধ। চারদিকে শুনশান। ওই পথে মানুষের চলবার জো নেই আর, পথগুলো জুড়ে আছে প্রকতি জননীর একঝাঁক চঞ্চল সন্তানের নিথর দেহ। যাদের গলায় ছিল মিষ্টি সুর, সরু ঠোঁটে ছিল মোহময় প্রাচুর্য, দেহে ছিল নীলচে সবুজ, খয়েরি, হলুদ, টিয়ে, কালো হিরের বর্ণ। সারাদেশের মানুষ কি জানতো এত সব পাখির খবর? ধলনগরের ঘন সবুজ বৃক্ষরাজির ভেতর কবে কবে গড়ে উঠেছে স্বপ্নিল সাম্রাজ্য? আসলে তো রাজ্যের রাজা প্রজা ওরাই। আমরাই গড়েছি উপনিবেশ দিনের পর দিন। ওদের অধিকারের আকাশে আমরাই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। ওদের বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস ক্ষেত্রে ঘুরে ঘুরে ওড়ে আমাদেরই কার্বন, ওদের প্রাকৃতিক আবাসন বৃক্ষলতা, বন-বনানী আমাদেরই ক্রীড়াক্ষেত্র। যেখানে আমাদের ধংসের খেলা ওদের জীবনমৃত্যু।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় কালিনদীর তীরবর্তী গ্রাম ধলনগর। পাশের গ্রাম কুশলিবাসা। এই গ্রামগুলো এখনও বাংলার হারিয়ে ফেলা কৃষি জনপদের সন্ধান দেয়। মানুষের জীবনমাণের খুব বেশি উন্নতি হয়নি। বহু মানুষ এখনও প্রতৃতিনির্ভর জীবন কাটান। মাঠে ফসল বৈচিত্র যেমন টানেনা তাদের একইভাবে মন সায় দেয় না জীবনকে আমুল পাল্টে দিয়ে নাগরিক হয়ে ওঠার পক্ষেও। এই কারণেই এখানে প্রকৃতির ঐশ্বর্য অন্যরকম। মানুষের সঙ্গে গাছপালা ও পাখ-পাখালির সম্পর্ক গভীর। একথা কেউ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেন না। কিন্তু সবার মনই যেন থাকে প্রকৃতির পক্ষে। ঐতিহ্য আর পুরনো দিনের ঘোর কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চান না তারা।

যতদূর জানা যায়, পাখির অভয়াশ্রমটি গড়ে উঠেছে গত দশ বছরের মধ্যে। কিছু প্রাকৃতিক ও কিছু মানুষসৃষ্ট বনোজি বাগান মিলিয়ে পাখিদের এই একান্নবর্তী বসতি। স্থানীয়রা বলেন, দশ রকমের পাখি থাকে ওরা রাজ্যে। এর মধ্যে সুই চোরা (স্থানীয় নাম), দুই তিন রকমের শালিখ, ঘুঘু, দোয়েল ছিল। কেউ কি গড়ে তুলেছিল তা? পাখিরাই গড়ে তুলেছিল। মানুষের প্রশ্রয় ছিল শুধু। মানুষের রাজ্য আকস্মিক গড়ে ওঠে, ক্ষমতার পালাবদল হয়। পাখিদের কি তা হয়? পাখিদের রাজ্য গড়ে ওঠে দিনে পর দিন তার আলো, ছায়া, রং, নিরবতা, তাপমাত্রা, নিরাপত্তা আর সৌহার্দ্যর ওপর ভিত্তি করে। পাখি খাদ্য খুঁজে নেয়। বুনোট প্রাকৃতিক ক্রিয়া বুনতে থাকে ওরা। আমরা ঢাকায় বসে যখন পৃথিবী নামক গ্রহের বাস অযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগে ফেটে যাই তখন পাখিরা নিশ্চয়ই বলেছিল, এখনও এদেশেই এমন কোনো কোনো ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে পাখিদের মায়াবি বিচরণের সঙ্গে একটু একটু করে বাড়ে পৃথিবীর আয়ু আর আমার সোনার দেশের বাস উপযোগিতা।আহা, জিলজিলে সবুজ মোড়া অদ্ভুত পাখিগুলির সাথে এর আগে কোথাও দেখা হলোনা কেন। সরু চঞ্চুর পাখিগুলিই কি ছিল লালনের অচিন পাখি? খাঁচা ভেঙে যে পাখি পালায় অজানা অচেনা বনে। ধলনগর কি ছিল নেই অচিন বন? ওরা কোনো অতিথি ছিল না। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত বিশেষ করে উত্তর মেরুর কঠোর হিমবাহকে পেছনে ফেলে যেসব পাখি নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে আমাদের বাড়িতে আসে, তারা ঠিক ঠিক ফিরে যায় মৌসুম পেরুলে। কিন্তু আমাদের প্রাণবন্ত অহংকারি পাখিগুলি নিজের বাসায় তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নিয়েছে বিদায়। বুঝেও ওঠেনি, কি হচ্ছে পৃথিবীতে। আকাশ থেকে ঝরে পড়া একেকটি প্রকান্ড শিলার আঘাত নিভিয়ে দিচ্ছে একেকটি পাখির জীবন প্রদীপ। থপ করে গাছের নিচে পড়ছে তার তুলোর মতো নরম আর সামান্য ওজনের ছোট্ট দেহটি।

এইভাবে একে একে শত শত, হাজার হাজার। আহা, পাখিশব, তোমাদের মৃতদেহ যেন করছে রব, এই পৃথিবী দিনের পর দিন সত্যিই বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়ছে। তোমাদের এই গণ বিদায় মানে আমাদের ‘অশনী সংকতে’। তোমরা জীবন দিয়ে ঘন্টা বাজিয়ে গেলে, এই প্রিয় পৃথিবীতে এভাবেই কমছে প্রাণের অস্তিত্ব।

আদিত্য শাহীন, সাংবাদিক