চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও নোবেলজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী

‘অবশ্যই রাইনার উইস। এবং সম্ভবত কিপ থর্ন। এই দুইয়ের পর যদি কেউ নোবেল পান, তবে কে হবেন, আমি নিশ্চিত নই।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত এক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী গত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি আমার এক প্রশ্নের জবাবে সম্ভাব্য নোবেলজয়ীর ব্যাপারে এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তার নাম লরেন্স ক্রাউস। তার সঙ্গে একই বিষয়ে দীর্ঘ আলাপ হচ্ছিল। তিনদিন পর তিনি আমাকে বললেন ‘এমন পরীক্ষণের জন্য সম্ভাব্য নোবেলজয়ীর তালিকায় আপনি ব্যারি ব্যারিশের নামটাও যোগ করতে পারেন।’

ঠিক এই তিন বিজ্ঞানীই অর্থাৎ রাইনার উইস, ব্যারি ব্যারিশ ও কিপ থর্ন এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আলবার্ট আইনস্টাইনের অনুমান করার ঠিক শতবর্ষ পর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করার স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের এই পুরস্কারে সম্মানিত করেছে নোবেল কমিটি।

একটি বিষয়ে এক বছরে সর্বোচ্চ তিনজনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করার কৃতিত্বের জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ নোবেল তো দেওয়া হবেই, কিন্তু কারা পাবেন পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কারটি? গত বছর এ প্রশ্নটি করেছিলাম সংশ্লিষ্ট তরঙ্গ সনাক্তকারী সংঘ লাইগোর সাত বিজ্ঞানীকে। এদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই মার্কিন বিজ্ঞানী। এবং এই দলের বাইরে লরেন্স ক্রাউস। কতটা ফলেছে তাদের ভবিষ্যদ্বাণী?

পৃথিবী থেকে কোটি আলোক বর্ষেরও দূরে দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে একশ ত্রিশ কোটি বছর আগে জন্ম নিয়েছিল যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, সেই ঢেউই প্রমাণিতভাবে সনাক্ত করেছিল লাইগো বা লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্রাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুবই দুর্বল। এরা সাধারণত বস্তুর সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয় না। ফলে আমাদের চারপাশে সব সময়ই থাকার পরও আমরা তাদের অনুভব করতে পারি না।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ধারণা দিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, ১৯১৬ সালে। ঠিক একশ বছর পর ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি লাইগোর বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন, ধরা দিয়েছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কার কি হিগস-বোসন কণা (ঈশ্বরকণা নামে যা জনপ্রিয় হয়েছে এবং যা আবিষ্কারের মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০১ সালে সংশ্লিষ্ট দুই বিজ্ঞানীকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়েছে) আবিষ্কারের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ? গত বছর প্রশ্নটা করেছিলাম কিপ থর্নকে যিনি নোবেল পেয়েছেন। উত্তরটা তখন সরাসরি দেননি থর্ন। তবে প্রশ্নটা না এড়িয়ে বলেন, ‘এই তুলনার বিচারভার বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদদের। তবে যারা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে কাজ করছেন, তারা মনে করেন, শেষ এক দশকের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এ আবিষ্কার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।’

ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ক্যালটেক) এই পদার্থবিজ্ঞানী ব্যাখ্যা করেন, ‘কেননা, আমাদের চারপাশের মহাশূন্যকে বোঝার জন্য এ হলো সম্পূর্ণ নতুন এক পথের শুভযাত্রা। ব্রহ্মা- কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে তত্ত্ব দাঁড় করানো এবং উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরখ করে দেখা যে, সত্যিই আমাদের ধারণা সত্য কিনা। বাস্তবিক অর্থে এটা বড় এক ঘটনা।’

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যদি সেই আবিষ্কারের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে কি এ ক্ষেত্রেও নোবেল আসবে, শিগগিরই? অ্যালান উইনস্টাইন যিনি তখন লাইগোর ক্যালটেক শাখার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তিনি ইমেইলে আমাকে বললেন, ‘আমি কোনো কল্পনা পাড়তে চাই না।’ কিন্তু অন্যরা অবশ্য মনের কথা গোপন করেননি আমার কাছে। এদের একজন ভারতের ব্যাঙ্গালুরুর টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের বিজ্ঞানী আর্কিসম্যান ঘোষ যিনি লাইগোর একজন গবেষক। তিনি ইমেইলে বলেন, ‘এই আবিষ্কারটা অতি-অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাবে।’

লরেন্স ক্রাউস। ছবি: ন্যান্সি ডাল

সংঘের অন্যতম পদার্থবিজ্ঞানী শেন লারসন আমাকে বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষই ঠিক ভাবছে, এই আবিষ্কারেরও নোবেল পাওয়া উচিত।’ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘লাইগো যে বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, আমি মনে করি, নিরলস এই প্রয়াস এরই মধ্যে (নোবেল পাওয়ার) দরকারি বৈশিষ্ট্য পূরণ করেছে।’

আর একই প্রশ্নের জবাবে লরেন্স ক্রাউস, যিনি এই আবিষ্কারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, তিনি বলেছিলেন, এই আবিষ্কার নিশ্চয়ই নোবেল পাওয়ার দাবি রাখে।

তবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে নোবেল পুরস্কার কিন্তু অতীতেও এসেছে। যদিও তখন এই তরঙ্গ ধরা পড়েনি। কিন্তু ১৯৭৪ সালে নতুন ধরনের পালসার আবিষ্কার করে এই তরঙ্গ যে সত্যিই আছে, আইনস্টাইনের তত্ত্বকে শক্ত ভিত দিয়েছিলেন জোই টেইলর এবং রাসেল হালস নামে দুই বিজ্ঞানী। কৃতিত্বস্বরূপ তাদের ১৯৯৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়। তবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হাতেনাতে ধরা পড়া, কিপ থর্ন যাকে বলেছেন ‘চোখে ধরা পড়া নয় বরং কানে শুনতে পাওয়া’- এমন ঘটনা লাইগোর মাধ্যমেই প্রথম।

বিশ্বব্যাপী এক হাজারের বেশি বিজ্ঞানী লাইগোর হয়ে কাজ করছেন, কয়েক দশক ধরে। তাহলে নোবেল দেওয়া হলে কে বা কারা পাবেন পুরস্কারটা? নাকি পুরো লাইগো দলটি?

মার্কো ড্রাগো। ছবি: ডেইলি মেইল

মূলত ঘোষণার ছয় মাস আগেই লাইগো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করেছিল। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জার্মানিতে গবেষণাকালে সংঘের ইতালীয় বিজ্ঞানী মার্কো ড্রাগো এই তরঙ্গ প্রথম অবলোকন করেন। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি যেহেতু তরঙ্গটি ধরার ব্যাপারে প্রথম, তিনি কি নোবেল পাবেন? উত্তরে ইতালির ইউনিভার্সিটি অব ট্রেন্টোর এই পদার্থবিজ্ঞানী বলেন, ‘এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার। আমি তো নোবেল পুরস্কারের প্রত্যাশা করছিই। তবে আমার জন্য নয়।’

মার্কো একই সঙ্গে জার্মানির হ্যানোভারে আলবার্ট আইনস্টাইন ইনস্টিটিউটেরও গবেষক। সেখানে ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট ফর গ্রাভিটেশনাল ফিজিকসের ল্যাবেই তিনি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কার করেন। ঘোষণার পর আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু আমার গবেষণার ফল নয়। আমি চিন্তাই করতে পারি না যে, আমাকে নোবেল দেওয়া উচিত। তবে আমি মনে করি, যারা এই গবেষণার প্রথম পথ দেখিয়েছিলেন, তাদের এই সম্মান দেওয়াটা সততার কাজ হবে।’

তারা কারা, যারা ফাঁদ পেতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরার ফন্দি দেখিয়েছিলেন, যা সফল হয়েছে বলে স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল পেতে পারেন?

বিজ্ঞাপন

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লরেন্স ক্রাউস বলেন, ‘অবশ্যই রাইনার উইস। এবং সম্ভবত কিপ থর্ন। এই দুইয়ের পর যদি কেউ নোবেল পান, তবে কে হবেন, আমি নিশ্চিত নই।’

একই ধারণা লাইগোয় সম্পৃক্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানী সেলিম শাহরিয়ারের। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানী আমাকে দেওয়া ইমেইলে সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি মনে করি, নোবেলটা তাদেরই পাওয়া উচিত যারা প্রায় ৪০ বছর আগে এই প্রকল্পটা চালু করেছিলেন। যথাসম্ভব তালিকার শীর্ষে থাকবেন এমআইটির রাইনার উইস এবং ক্যালটেকের কিপ থর্ন। সাধারণত তৃতীয় আরেকজন নোবেল পেয়ে থাকেন। তবে আমি নিশ্চিত নই, কাকে বেছে নেওয়া হবে।’

সেলিম শাহরিয়ার। ছবি: গুগল

রাইনার উইস হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) পদার্থবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক। সেলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘এমআইটিতে আমার পিএইচডির অ্যাডভাইজার ছিলেন শাউল এজেকিল। প্রয়াত এই বিজ্ঞানীর পিএইচডির অ্যাডভাইজার ছিলেন উইস।’

ব্যারি ব্যারিশ হচ্ছেন ক্যালটেকের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ব্যারি ব্যারিশ ও কিপ থর্নের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। আর উইসের জন্ম জার্মানিতে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরেক মার্কিন বিজ্ঞানী যুক্ত আছেন লাইগো দলে। তার নাম দীপঙ্কর তালুকদার। যুক্তরাষ্ট্রের অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদার্থবিজ্ঞানী গত বছর ইমেইল সাক্ষাৎকারে এই লেখককে বলেন, ‘আমি আশা করছি, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে অন্তত রোনাল্ড ড্রেভার, কিপ থর্ন ও রাইনার উইসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে।’

হ্যাঁ, উইস ও থর্নের বাইরে এই রোনাল্ড ড্রেভারই নোবেল পাবেন বলে ভেবেছিলেন অনেকে। এ বছর মার্চে ড্রেভার মারা যান। যা হোক, লরেন্স ক্রাউস মাত্র তিন দিনের মাথায় আমাকে বললেন, ‘এমন পরীক্ষণের জন্য সম্ভাব্য নোবেলজয়ীর তালিকায় আপনি ব্যারি ব্যারিশের নামটাও যোগ করতে পারেন।’

লরেন্স ক্রাউস যেন নোবেলের পল। ঠিক ঠিক তার অনুমান করা তিন বিজ্ঞানীই নোবেল স্বীকৃতিটা পেলেন। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে গতকাল মঙ্গলবার যোগাযোগ করেছিলাম এই অধ্যাপকের সঙ্গে। পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল ঘোষণার পরপরই ইমেইলে তাকে বললাম, আপনার কথা তো শতভাগ ফলেছে। প্রতিক্রিয়ায় ক্রাউস বলেন, ‘অপূর্ব তিন পদার্থবিজ্ঞানীদের একটা জুটি এটা, যারা চমৎকার একটা আবিষ্কার করেছেন। এদের একজনকে ছাড়াও এমন আবিষ্কার সম্ভব ছিল না। আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা বোধহয় বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা ছিল সাহসী, উচ্চাশী এবং স্বাপ্নিক। তারা তাদের পেশাজীবনের বেশিরভাগ অংশই উৎসর্গ করে দিয়েছেন এই আকাঙ্ক্ষায়। তাদের সক্ষমতা ও কর্মদক্ষতায় এর প্রতিফলন ঘটেছে। আজ পদার্থবিজ্ঞানের জন্য বড়দিন। মহাদিন এই তিন খাঁটি ভদ্রলোকের জীবনে এবং অবশ্যই এই দিন শত শত বিজ্ঞানীদের জন্যও অনেক আনন্দের দিন যারা এই প্রকল্পে সম্পৃক্ত রয়েছেন।’

নোবেল ঘোষণার পর আলাপ হয়েছে সেলিম শাহরিয়ার ও দীপঙ্কর তালুকদারের সঙ্গেও।

দীপঙ্কর তালুকদার। ছবি: গুগল

সেলিম শাহরিয়ার আমাকে লিখেছেন, ‘সত্যিকার অর্থেই এটা দারুণ একটা খবর। তারা তিনজনই এমন পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার।’ তার কাছে জানতে চাইলাম, ড্রেভার মারা না গেলে কি তিনি নোবেলটা পেতেন? সেলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, রন ড্রেভারের জীবনাবসান না ঘটলে তিনি হয়ত উইস ও থর্নের সঙ্গে তিন বিজয়ীর একজন হতে পারতেন। কিন্তু মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেওয়ার তো রীতি নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাইনার উইস নোবেল পেয়েছেন বলে আমি বিশেষ করে বেশি খুশি। বলতে পারেন, তিনি হচ্ছেন আমার অ্যাকাডেমিক দাদু (আমার অ্যাডভাইজারের অ্যাডভাইজার)। এবং তিনি আমার থিসিসের কমিটিতেও ছিলেন।’ সেলিম শাহরিয়ার যোগ করেন, ‘আমি খুব গর্বিত লাইগোর হয়ে কাজ করতে পেরে। বিশেষ করে বাংলাদেশি হিসেবে এই প্রয়াসের অংশীদার হতে পেরে আমি খুব গর্বিত।’

পদার্থবিজ্ঞানে এবারের নোবেল নিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে দীপঙ্কর তালুকদার গতকাল ইমেইলে আমাকে বলেন, ‘এক কথায় যোগ্য, যথোপযুক্ত।’ অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করা ছিল এই শতকের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানগুলোর মধ্যে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার।’ হাজারো বিজ্ঞানী যারা লাইগোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তাদের পক্ষ থেকে [তিন জন বিজ্ঞানী] এই স্বীকৃতি পাচ্ছেন বলে আমি ভীষণ রকম খুশি।’

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যে বস্তুর সঙ্গে ‘মোটেও মেশে না’, এর কি কোনো ইতিবাচক দিক আছে? গত বছর এ প্রশ্ন করেছিলাম বাংলাদেশের অন্যতম বিজ্ঞানচিন্তক আসিফকে। পেশাদার এই বিজ্ঞানবক্তা টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘আছে বৈকি। দুটো কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যদি কোনো বাধা ছাড়াই বা বস্তুর সঙ্গে মিলন ছাড়াই আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে ওই তরঙ্গ যে তথ্য বা বার্তা বহন করে আনে তা পুরোপুরি অস্পৃশ্য রয়ে যায়।’ বিজ্ঞান লেখক আসিফ এই বার্তাকে ‘সংরক্ষিত বার্তা’ (ভার্জিন ম্যাসেজ) বলে অভিহিত করেন।

সালেহ্ হাসান নকীব। ছবি: ফেসবুক

কখনও যদি মহাবিস্ফোরণে (বিগ ব্যাং) সৃষ্ট হওয়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আমরা ধরে ফেলতে পারি তাহলে, ‘মহাবিশ্ব ও নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু’ গ্রন্থের সহ-লেখক আসিফ বলেন, ‘আমরা ওই তরঙ্গে খোদাই করা আদিবার্তা থেকে জেনে যেতে পারব ব্রহ্মা- সৃষ্টির রহস্য, দেখতে পাব সেই জন্মলগ্নের সব দৃশ্য।’

বাংলাদেশের পদার্থবিজ্ঞানী সালেহ্ হাসান নকীব ৩ অক্টোবর টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি মনে করি, হিগস-বোসন কণা আবিষ্কারের চেয়েও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক যিনি পদার্থের পরমপরিবাহিতা নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি মন্তব্য করেন, ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করার মাধ্যমে মহাবিশ্বকে দেখার জন্য আমাদের নতুন চোখ তৈরি হয়েছে।’

২০১৬ সালের প্রথম ঘোষণার পর ওই বছরই মধ্য জুনে আবার বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করার খবর দিয়েছেন। এরই মধ্য দিয়ে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে জন্ম নিয়েছে নতুন এক বিপ্লব, নতুন এক শাস্ত্র। জ্ঞানের নতুন এ ধারাকে বলা হচ্ছে ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ জ্যোতির্বিদ্যা’। লাইগোর বিজ্ঞানীরা ওই বছর এই লেখককে দেওয়া ইমেইল সাক্ষাৎকারে এর মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানে এ এক বিশাল বাঁকবদল।’

বিজ্ঞাপন