নিউটন যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো সেই বিখ্যাত আপেলটি আবারও আকাশে ছুড়ে দিয়ে বলতেন—
“দেখলে! আমার হিসাব এখনো ঠিক আছে!”
আর পাশে দাঁড়িয়ে আইনস্টাইন হয়তো মুচকি হেসে বলতেন—
“তোমার হিসাব ঠিক আছে, তবে মহাবিশ্বটা তার চেয়েও অনেক বেশি রহস্যময়!”
কারণ, মহাবিশ্বের বিশাল পরিসরে মহাকর্ষ কীভাবে কাজ করে—এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক বড় পরীক্ষায় পাওয়া গেছে চমকপ্রদ ফল। শত শত কোটি আলোকবর্ষ দূরের মহাজাগতিক কাঠামোতেও মহাকর্ষের আচরণ প্রচলিত তত্ত্বগুলোর পূর্বাভাসের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই মিলে যাচ্ছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক প্যাট্রিসিও এ. গ্যালার্ডো। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ৪০ জনেরও বেশি গবেষক এই গবেষণায় অংশ নিয়েছেন। গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চিলির আটাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত আটাকামা মহাজাগতিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণ তথ্য
মহাকর্ষ আসলে কী?
মহাকর্ষকে খুব সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়—এটি এমন একটি আকর্ষণ বল, যার কারণে ভরযুক্ত বস্তু একে অপরের দিকে টান অনুভব করে।
আপনি যদি একটি বল ওপরে ছুড়ে দেন, সেটি কিছুটা ওপরে উঠে আবার নিচে ফিরে আসে। কারণ পৃথিবীর মহাকর্ষ বলটিকে নিজের দিকে টেনে নেয়।
স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষের এই আচরণকে গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর সূত্র অনুযায়ী, দুটি বস্তুর মধ্যকার দূরত্ব যত বাড়বে, তাদের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণ তত কমবে।
পরে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মহাকর্ষকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। আইনস্টাইনের মতে, মহাকর্ষকে শুধু একটি আকর্ষণ বল হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। ভর ও শক্তি মহাকাশ–সময়ের কাঠামোকে বাঁকিয়ে দেয়, আর সেই বাঁকানো কাঠামোর মধ্য দিয়েই বস্তু ও আলো চলাচল করে।
অর্থাৎ নিউটনের সূত্র আমাদের মহাকর্ষের একটি অত্যন্ত কার্যকর হিসাব দেয়, আর আইনস্টাইনের তত্ত্ব মহাকর্ষের আরও মৌলিক ব্যাখ্যা দেয়।
এবার পরীক্ষা মহাবিশ্বজুড়ে
পৃথিবীর আশপাশে বা সৌরজগতের মধ্যে মহাকর্ষের নিয়ম ভালোভাবে কাজ করে—এটি বিজ্ঞানীরা বহু পরীক্ষায় দেখেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই নিয়ম কি বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের মহাবিশ্বেও কাজ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের গতিবিধি এবং মহাবিশ্বের প্রাচীন আলোর বিভিন্ন পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—এক আলোকবর্ষ হলো আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে। আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার গতিতে চলে। ফলে শত শত কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো বস্তু পর্যবেক্ষণ করা মানে আসলে মহাবিশ্বের অত্যন্ত প্রাচীন সময়ের দিকে তাকানো।
কাজে লাগানো হয়েছে মহাবিশ্বের প্রাচীন আলো
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ।
CMB হলো বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া প্রাচীন আলোর অবশিষ্ট বিকিরণ। সেই আলো আজও মহাবিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
বিজ্ঞানীরা CMB-কে অনেকটা মহাবিশ্বের শিশুকালের একটি ছবি হিসেবে বিবেচনা করেন।
এই প্রাচীন আলো মহাবিশ্বের বিভিন্ন কাঠামোর মধ্য দিয়ে আসার সময় মহাকর্ষীয় প্রভাবের মুখোমুখি হয়। গ্যালাক্সি, গ্যালাক্সি ক্লাস্টার এবং অন্যান্য বিশাল কাঠামোর মহাকর্ষ আলোকে সামান্য বাঁকিয়ে বা তার বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনতে পারে।
এই পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে পদার্থ কীভাবে ছড়িয়ে আছে এবং মহাকর্ষ কীভাবে কাজ করছে—তার একটি ধারণা পান।
কিন্তু গ্যালাক্সিগুলো এত দ্রুত চলছে কেন?
এখানেই আসে ডার্ক ম্যাটারের রহস্য।
বিজ্ঞানীরা যখন গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন, তখন দেখা যায়—অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদার্থের পরিমাণ দিয়ে বস্তুগুলোর গতি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।
সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক।
ধরুন, একটি ছোট মোটরসাইকেল একটি রাস্তায় চলছে। তার গতি দেখে আপনি যদি হিসাব করেন, তাহলে তার ইঞ্জিনের শক্তি ও ওজনের সঙ্গে গতি মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কথা।
কিন্তু যদি দেখা যায়, মোটরসাইকেলটি এমন গতিতে ছুটছে যা তার দৃশ্যমান শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়, তখন আপনি ভাববেন—এর পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো শক্তি কাজ করছে।
মহাবিশ্বেও বিজ্ঞানীরা অনেকটা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।
গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের দৃশ্যমান তারকা, গ্যাস ও অন্যান্য পদার্থের ভর দিয়ে তাদের পর্যবেক্ষিত গতি এবং মহাকর্ষীয় প্রভাব পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন।
তাহলে কি মহাকর্ষের সূত্র ভুল?
একসময় বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—সমস্যাটি কি মহাকর্ষের সূত্রে?
যদি মহাবিশ্বের বিশাল দূরত্বে মহাকর্ষ পৃথিবী বা সৌরজগতের মতো আচরণ না করে, তাহলে প্রচলিত মহাকর্ষ তত্ত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।
এ ধরনের ধারণার মধ্যে রয়েছে পরিবর্তিত নিউটনীয় গতিবিদ্যা বা MOND–এর মতো বিকল্প তত্ত্ব। এসব তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য হলো, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে প্রচলিত মহাকর্ষের নিয়ম পরিবর্তন করে গ্যালাক্সির অস্বাভাবিক গতিবিধি ব্যাখ্যা করা।
অন্যদিকে আরেকটি ব্যাখ্যা হলো—মহাকর্ষের নিয়ম ঠিকই আছে, কিন্তু মহাবিশ্বে এমন বিপুল পরিমাণ পদার্থ রয়েছে যা আমরা সরাসরি দেখতে পাচ্ছি না।
এই অদৃশ্য পদার্থই হলো ডার্ক ম্যাটার।
নতুন গবেষণা কী বলছে?
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে মহাকর্ষের আচরণ প্রচলিত মহাকর্ষ তত্ত্বের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই দেখা গেছে।
অর্থাৎ, মহাবিশ্বের বিশাল পরিসরে গিয়ে মহাকর্ষের নিয়ম হঠাৎ সম্পূর্ণ বদলে গেছে—এমন শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এটি ডার্ক ম্যাটারের ধারণাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
কারণ যদি মহাকর্ষের নিয়মই মোটামুটি ঠিক থাকে, তাহলে গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের অস্বাভাবিক গতিবিধি ব্যাখ্যা করতে অদৃশ্য কোনো ভরের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ডার্ক ম্যাটারের রহস্য সমাধান হয়ে গেছে।
বরং বলা যায়, রহস্যের একটি দরজা আরও শক্তভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, আর অন্য একটি দরজা আরও বড় হয়ে খুলেছে।
ডার্ক ম্যাটার দেখা যায় না, তাহলে বিজ্ঞানীরা জানলেন কীভাবে?
ডার্ক ম্যাটারের সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো—এটি আলো শোষণ, প্রতিফলন বা নির্গমন করে না বলেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তাই সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে এটিকে সরাসরি দেখা যায় না।
কিন্তু কোনো কিছু সরাসরি দেখা না গেলেও তার প্রভাব দেখা যেতে পারে।
যেমন বাতাসকে আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু গাছের পাতা নড়তে দেখে বুঝতে পারি বাতাস আছে।
ঠিক তেমনই গ্যালাক্সির গতি, গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের কাঠামো এবং আলোর গতিপথে মহাকর্ষীয় প্রভাব বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পান।
মহাবিশ্বের কতটা ডার্ক ম্যাটার?
মহাবিশ্বের মোট পদার্থ–শক্তির হিসাব করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমরা যে সাধারণ পদার্থ দেখি—যেমন নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যাস, ধূলিকণা এবং আমাদের চারপাশের বস্তু—তা মহাবিশ্বের মোট উপাদানের খুব ছোট একটি অংশ।
এর বাইরে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার এবং আরও রহস্যময় ডার্ক এনার্জি।
ডার্ক ম্যাটার মহাকর্ষীয়ভাবে পদার্থকে একত্রিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করা হয়। আর ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের দ্রুততর প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়।
অর্থাৎ আমরা মহাবিশ্বের যে অংশ দেখতে পাই, সেটিই পুরো মহাবিশ্বের গল্প নয়।
তাহলে কি নিউটন ও আইনস্টাইনই শেষ কথা?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
বিজ্ঞানে কোনো তত্ত্বকে সত্য প্রমাণ করার চেয়ে তার সীমা ও কোথায় তা ব্যর্থ হতে পারে—সেটি খুঁজে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিউটনের মহাকর্ষের সূত্র দৈনন্দিন জীবনে এবং অনেক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের ক্ষেত্রে অসাধারণভাবে কার্যকর। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষ বা মহাজাগতিক পরিস্থিতিতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা আরও নির্ভুল ব্যাখ্যা দেয়।
আবার মহাবিশ্বের অদৃশ্য পদার্থ ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে বর্তমান তত্ত্বগুলোও এখনো অসম্পূর্ণ।
তাই নতুন গবেষণার গুরুত্ব হলো—এটি বিজ্ঞানীদের প্রচলিত মহাকর্ষের নিয়মকে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা করার সুযোগ দিয়েছে।
রহস্য এখনো রয়ে গেছে
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো একই—
ডার্ক ম্যাটার আসলে কী?
এটি কি কোনো অজানা মৌলিক কণা?
এটি কি এমন কোনো পদার্থ, যা আমাদের বর্তমান প্রযুক্তিতে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না?
নাকি মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণার মধ্যেই কোথাও বড় কোনো অসম্পূর্ণতা রয়েছে?
বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষাগার, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং বিশাল টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করে সেই উত্তর খুঁজছেন।
আর এখানেই এই গবেষণার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।
নিউটনের হাতে আপেল পড়েছিল পৃথিবীতে। আইনস্টাইন মহাকর্ষকে দেখেছিলেন মহাকাশ–সময়ের বাঁক হিসেবে। আর আজকের বিজ্ঞানীরা সেই একই মহাকর্ষের আচরণ খুঁজছেন বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের মহাবিশ্বে।
এখন পর্যন্ত মহাবিশ্ব যেন বলছে—
মহাকর্ষের পুরোনো নিয়মগুলো এখনো টিকে আছে। কিন্তু সেই নিয়মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ডার্ক ম্যাটারের রহস্যই হয়তো আগামী দিনের পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি।









