চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধর্ষণের শিকার নারীদের জন্য সহানুভূতি জাগে, ভালোবাসা নয়!

নারী দিবস আসছে। সবাই সেদিন নারীদের নিয়ে স্ট্যাটাস দিবে। কেউ মায়ের সঙ্গে, কেউ বোনের সঙ্গে, কেউ বউ, ভাবী, প্রেমিকা কিংবা অনুপ্রেরণা দেয় এমন কোন নারীর সঙ্গে। আর আমার মনে পড়ছে ৮ই মার্চ ২০১৭, দুপুরের সময়টা। রেডিও সংবাদ উপস্থাপনা ছিলো আমার। সহকর্মী প্রিয়া কুন্ডুর প্রতিবেদনে প্রথম শুনলাম ধর্ষণের শিকার হওয়া একজনের লড়াইয়ের কথা। সেই দিনের দুপুর আর মৌরির (ছদ্মনাম) কণ্ঠ আজও আমায় নাড়া দিয়ে যায়। প্রায় এক বছর হলো তার গল্প শুনেছি। এখনও আমার কানে বাজে তার শব্দগুলো। তার ফোঁপানো কান্নার আর্তনাদ! কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিলো তার। সেদিন মৌরি রেডিওতে হাজারো শ্রোতাকে জানিয়েছিলো কীভাবে আপন চাচাতো ভাই সংসারে সাহায্য করার ছলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বাবাহীন ছোট্ট মৌরির উপর। অন্যায় না করেও ভয়াবহ স্মৃতির সেই যন্ত্রণা আজও বয়ে চলছে মৌরি। মৌরির কন্ঠ আমাকে সেদিন কাঁদিয়েছিলো! মনে হচ্ছিল, পথে ঘাটে প্রতিদিন নানা রকম হয়রানি যেখানে সহজে এড়ানো যায় না, সেখানে মৌরি কীভাবে বয়ে চলছে এই মানসিক ক্ষত!

মা-ভাই-বোন নিয়ে আজ মৌরি প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। বিয়ে করেননি এখনও। কেন করেননি তার উত্তরটাও সোজাসাপ্টা। সে এখনও কোন ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারে না। যাকে মৌরি বিয়ে করবে, সে মানুষটি যে কোনদিন কোন মেয়ের সাথে অন্যায় করেনি বা বিয়ের পর কোন অন্যায় করবে না, তার গ্যারান্টি কী? এমনটা হলে মৌরির পক্ষে তা মেনে নেয়া সম্ভব হবে না। তাই তার কাছে এখন একা থাকাই শ্রেয়!

বিজ্ঞাপন

আরেকটা মেয়ের গল্প বলি। তার নাম জয়া (ছদ্মনাম)। বয়স তখন তার তেরো কি চৌদ্দ। অ্যাবিউজের পাশাপাশি ধর্ষণের স্বীকার হয় পরিবারের কাছের এক আত্মীয় দ্বারা, যে কিনা প্রভাবশালী। বাবা-মা সমাজের ভয়ে কখনও মুখ ফুটে কথা বলেনি। আর সেটা মেনে নিয়ে এখনও স্বাভাবিক মানুষের মতোই বেঁচে আছে জয়া। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সেই স্মৃতি এখনও পোড়ায় তাকে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় আত্মহত্যাই সমাধান। জয়ার কাছে সবিনয়ে জানতে চাইলাম, আচ্ছা বাবা মায়ের উর্ধ্বে গিয়ে কখনও ওই ধর্ষকের বিচার করার চিন্তা করেননি?

জয়া বললেন, কার কাছে বিচার চাইব! পুলিশের কাছে, সরকার, সমাজের কাছে। কি যে বলেন! জানেনই তো এই সমাজ ধর্ষণের বিচার চাইতে পারে। তবে সেটা এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ কিংবা মাসখানেক। কিন্তু ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে আপন করে ক’জন? আমাদের জন্য ওই এক এনজিও, না হলে পূনর্বাসন কেন্দ্র। সাধারণ মেয়ে হিসেবে আমি কি তখন বাঁচতে পারব? বলেন?

বিজ্ঞাপন

উল্টো প্রশ্ন শুনে কিছুটা বিব্রত হলাম। যাই হোক। জয়ার কাছে জানতে চাইলাম বাবা-মা ছাড়া ধর্ষণের কথা কখনও কি কাউকে বলেছেন?

বললেন, বাবা-মা ছাড়া আরেকজন জানে। যাকে ভালোবেসেছিলাম। জানি না কেন তাকে বলেছিলাম। মনে করেছিলাম, হয়তো এই মানুষটা আমার খুব কাছের কেউ। কিন্তু না! আমি ভুল ছিলাম। আমাদের মতো মেয়েদের জন্য সহানুভূতি হয়। কিন্তু আমাদের জন্য কারও ভালোবাসা জন্মায় না! নাটক সিনেমায় যা দেখায়, বাস্তবতা তার চাইতে অনেক বড় কঠিন। সবাই তো আর মহামানব না। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ চাওয়া পাওয়া থাকে। এগুলো মানতে শিখে গেছি। আমি এখন আমার মতো করে ভালোই আছি। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি ব্যাপারটাকে ভুলে যেতে বা অস্বীকার করতে পারব না। যতদিন আছি একটু ভালোভাবেই বেঁচে থাকতে চাই, কষ্টটাকে সাথে নিয়েই।

মৌরি আর জয়ার গল্প শুনে তাজ্জব বনে যাই। কতটা শক্ত তারা। ধর্ষণের শিকার হয়েও তারা আজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। হয়তো তারা অপরাহ উইনফ্রে কিংবা ম্যাডোনার মতো বিশাল মঞ্চে লড়াইয়ের কথা বলতে পারেনি, জীবন যুদ্ধকে জয় করে তারা আজও অপ্রকাশ্য। তারপরও তারা বেঁচে আছে। তারাও আপনার আমার মতো স্বাভাবিকভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু অজানা এক ভয় তাদের সেই স্বপ্নটাকে কালো চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। সেই চাদরে ঢাকা পড়ে মৌরি আর জয়ারা।

কিছু করার সাধ্য না থাকলেও শুধু বলব, ভালো থাকুক মৌরী আর জয়ারা। তোমাদের মেঘের কালো আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ুক সব বৃষ্টি। তোমাদের জীবনে নেমে আসুক শুভ্র ভোরের আলো, যে আলোয় নি:শ্বাস নেবে তোমরা!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View