চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশ যেভাবে এগিয়ে যাবে

দেশে কিংবা বিদেশে যে যেখানেই থাকি না কেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকেই স্বদেশের প্রতি অফুরান ভালবাসা, সুতীব্র আবেগ, মায়াময়ী সুশীতল স্পর্শ অনুভব করে থাকি। প্রকৃত অর্থে স্বদেশের প্রতি, নিজ দেশের প্রতি, নিজ জন্মভূমির প্রতি আবেগের বহি:প্রকাশ বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। আমরা প্রত্যেকেই দেশকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে থাকি, পরম মমতায় দেশকে আগলে রাখার বদ্ধপরিকর শপথে উজ্জীবিত হয়ে দেশমাতার তরে যথার্থ ভূমিকা রাখতে চেষ্টার কমতি নেই। তবে কিছু ব্যতিক্রম যে রয়েছে সেটাও কিন্তু সঠিক। কেন তারা ব্যতিক্রম সে বিষয়ে অনুসন্ধান করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

সারমর্ম হচ্ছে, দেশের জন্য কাজ করা, দেশের তরে মঙ্গল বয়ে আনা, দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে কর্তব্য পালন করার মনোবাসনা প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। অনেকেই হয়তো নানা জটিলতা, কর্মব্যস্ততা ও বাধা বিপত্তির কারণে দেশসেবায় মনোনিবেশ করতে পারেন না। তবে অন্যভাবে বললে বলা যায়, নিজের সেবা করা অর্থাৎ নিজের উন্নতিকল্পে, নিজের পরিবারের উন্নতিকল্পে কাজ করলেও দেশের সেবা হয়ে থাকে। কারণ, আপনি আমি নিজেদেরকে উন্নত এবং আধুনিক করতে পারলে দেশ প্রকারান্তরে অগ্রগতির সোপানে উন্নীত হবে। কাজেই মূল কথা হচ্ছে, ব্যক্তিকে নিয়ে দেশ, ব্যক্তির উন্নতি মানেই দেশের উন্নয়ন তবে সেই উন্নয়ন যত বেশি সামষ্টিক ও অর্থবহ হবে ততই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ও অগ্রসর হবে মনে করি।

বিজ্ঞাপন

একজন মানুষ যখন বিদেশে অবস্থান করেন কিংবা বাড়ির বাইরে কর্মস্থলে থাকেন দেশে ফিরে বা গ্রামে ফিরে ইতিবাচক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের মনোবাসনা নিয়ে দেশে ও বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু আসার পর দেখা যায়, পরিবর্তনযোগ্য কাজ করার মনোবাসনা ব্যাপৃত হলেও উপযুক্ত সঙ্গী বা যোদ্ধার অভাবে কাজ করতে পারছেন না। আবার এমনও দেখা যায় আপনি কাজ করতে ইচ্ছুক কিন্তু বিভিন্ন জায়গা থেকে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন কোন কোন ক্ষেত্রে হুমকির কথাও শোনা যায়। এ বিষয়গুলোকে ঝেড়ে ফেলতে হবে অন্যথায় সমাজের কাঙ্খিত পরিবর্তনের প্রত্যাশা সমীচিন হবে না। কাজ করার সুযোগ দিতে হবে কর্মউদ্দীপ্ত মানুষগুলোকে, তাদের দেখাদেখি অনেকেই যদি সমাজ পরিবর্তনের ভূমিকা পালনে অগ্রণী দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে তাহলেই সমাজেই কাঙ্খিত পরিবর্তন আসবে। আবার এমনও দেখা যায়, গ্রামে বড় হওয়া প্রতিষ্ঠিত মানুষগুলো সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, বিষয়টা কোনভাবেই কাম্য নয়। কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই, বাধা বিপত্তিকে পায়ে পদদলিত করে কাজ সুসম্পন্ন করার মাঝেই স্বার্থকতা নিহিত রয়েছে। আর এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন, কাজের মূল্যায়ন রয়েছে, হয়তোবা সেটি মানুষের মননে প্রোথিত হতে সময় লাগবে কিছুদিন কিন্তু যৌক্তিক কাজের মূ্ল্যায়ন হবেই।

বিজ্ঞাপন

করোনাকালে বৈশ্বিক দুর্যোগের ভয়াবহতা থেকেও আমরা শিক্ষা নিতে পারিনি- এ সমস্যাকে আমরা জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারনি নানাবিধ কারণে-এসব প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে উঠতে হবে যে কোন মূল্যে। যদি আমরা করোনাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারতাম তাহলে কিন্তু করোনা প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার সাথে সাথে মাস্ক, স্যানিটাইজার, হেক্সিসল ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল সামগ্রীর মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেতো না। এই ধরনের নীতিহীনতা, হীনমন্যতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যান্য দেশে যেখানে দেখা যায়, জাতীয় প্রয়োজনে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বাজারদর ক্রেতাদের সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে হাতের নাগালের মধ্যে রাখা হয় সেখানে আমাদের দেশে কতিপয় চক্র পৈশাচিকভাবে মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখে। এ ধরনের দৈন্যতা, হীণতা আমাদের দেশের সামগ্রিকতাকে বিনষ্ট করে দেয়। কাজেই, ব্যবসায়িক সম্প্রদায়কে ব্যবসার অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ম নীতির অনুসরণ ব্যতিরেকে লাইসেন্স বাতিলের বিষয়াদি যাচাই বাছাই করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

সরকারি খরচের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; পত্রিকার পাতায় মাঝে মধ্যে খবরের শিরোনাম হয় অমুক প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য অতজন কর্মকর্তার বিদেশ সফর। এ রকম খামখেয়ালি বেহায়াপনার কোন দরকার হয় না, আমাদেরকে আরো সচেতন ও দেশপ্রেমের বহি:প্রকাশ ঘটাতে হবে কাজে কর্মে ও কথাবার্তায়। দেশে করোনা আসার ফলে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে পত্রিকার পাতায় উঠে আসে খবরগুলো দেখে দেশপ্রেমিক মানুষ মাত্রই দ্বিধাগ্রস্থ ও শঙ্কিত হয়ে উঠেন। সবাই মিলে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যার যার জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে দেশের প্রতি পবিত্র দায়িত্ব পালন করি। সরকারি সেক্টর থেকে যে কোন মূল্যে দুর্নীতির রাহুগ্রাসের লাগাম টেনে ধরতে হবে, এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হতে পারে।

মাঝে মধ্যে পত্রিকার পাতায় দেখা যায়, একযোগে অতজন কর্মকর্তার পদোন্নতি; পাশাপাশি এ সংক্রান্ত তথ্যও দেওয়া থাকে কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে সবাইকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে যদিও ততসংখ্যক পোস্ট থাকে না যার জন্য নতুন করে পোস্ট সৃষ্টি করতে হয়। কাজেই, সবক্ষেত্রে নীতিমালার প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরী। আবার এমনও দেখা যায়, বছরের পর বছর চলে গেলেও নানা কারণে যোগ্য ব্যক্তিদের পদোন্নতি আটকিয়ে রাখা হয়। ন্যায্যতার ভিত্তিতে যার যা পাওনা তার সবটুকুই উপযুক্ত ব্যক্তিতে প্রদান করা উচিত, নাহলে কর্মক্ষেত্রে ভারসাম্য নষ্ট হয়। প্রমোশন, পদায়ন ইত্যাদির ক্ষেত্রে একটি সুষ্ঠু ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন অবশ্যাম্ভাবী যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রার্থী যখন উপযুক্ত হবেন তখন তার পদোন্নতি প্রাপ্তিতে কোনরূপ ঝামেলা পোহাতে না হয়। দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে আনুগত্য, আত্মীয়করণ, দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ রক্ষা করা ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিন্তু সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করতে পারে না। যোগ্যতা, পেশাগত দায়বদ্ধতা, কর্মদক্ষতা, পেশার প্রতি আন্তরিকতা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্ব প্রদান করা উচিত তাহলেই উক্ত ব্যক্তির নিকট হতে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব পাওয়া যাবে যা আমাদের সকলের জন্যই মঙ্গলজনক।

নিয়োগ বাণিজ্যের যে খবর শোনা যায় তা বন্ধে সকল ধরনের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যদিও পূর্বের ন্যায় নিয়োগ বাণিজ্যের খবর ইদানিংকালে খবরের শিরোনাম হয় না। তার মানে দাঁড়ায়, নিয়োগ বাণিজ্য কমেছে তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। নিয়োগ বাণিজ্য করে যারা চাকুরিতে প্রবেশ করে তাদের যোগ্যতা অন্যদের তুলনায় কম বিধায় তারা বাণিজ্যের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। আপনাকে আমাকে মনে রাখতে হবে এই কম যোগ্যতর প্রার্থীকে যদি আমরা কোন না কোনভাবে চাকুরিতে অন্তর্ভুক্তিতে সহযোগিতা করে থাকি, তাহলে আমাদেরও কিন্তু বিশাল দায়ভার থেকে যায় দেশের প্রতি। কেননা, এই প্রার্থীরাই কিন্তু আগামী ২৫-৩০ বছর উক্ত সেক্টরে কাজ করবে এবং তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা অবান্তর। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নতি ও দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যে বন্ধে সকলকে একাট্টা হতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা করতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের পূর্বে ব্যাপকভাবে যাচাই বাছাই করতে হবে। কারণ হিসেবে বলা যায়, যাচাইয়ের জন্য যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাদের আন্তরিকতা ও সততা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কেননা, ছোট একটি গ্রামে ৩-৪টি প্রাইমারি স্কুলের অনুমোদন অবান্তর মনে হয় আমার কাছে। হলফ করে বলা যায় কোন স্কুলেই আপনি সন্তোষজনক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও উপস্থিতির হার আশাব্যঞ্জক পাবেন না। তাহলে অনুমোদন কিভাবে দেয় সেটি কিন্তু একটি বড় আকারের প্রশ্ন হিসেবে থেকে যাচ্ছে। আবার একটি নতুন স্কুল অনুমোদনের জন্য পূর্বে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সাথে ন্যূনতম দূরত্বের বিষয়টিও মানা হয় না এমনো অভিযোগ রয়েছে। কাজেই অনুমোদন প্রদানের ক্ষেত্রে আরো বেশি নজরদারি ও স্বচ্ছতার প্রয়োজন রয়েছে মনে করি। পাশাপাশি পাঠদানের বিষয়ে নজরদারি রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে আন্তরিকতা নিয়ে অগ্রগামী হতে হবে ভবিষ্যৎ উন্নত, আধুনিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মর্মে। কাজেই, উপর্যুক্ত আলোচনায় বেশ কিছু সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সমস্যাগুলোকে সমাধানের চেষ্টা ও পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে বাংলাদেশ একটি সুখী সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিগণিত হবে নিঃসন্দেহে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)