চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুত্তেরিকা, সেই কমিউনিস্টই থেকে গেলাম, ইলিয়াসদা: কবীর সুমন

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা ভাষাভাষি মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন কথা সাহিত্যিক। লেখালেখির জীবনে উপন্যাস মাত্র দুটি। একটি ‘চিলে কোঠার সেপাই’, অন্যটি ‘খোয়াবনামা’। রেইনকোট, নিরুদ্দেশ যাত্রা, দুধভাতে উৎপাত,মিলির হাতে স্টেনগানসহ এরকম গল্প আরো বেশকিছু প্রখ্যাত গল্প আছে তার। অল্প লেখা থাকলেও তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে বেশ দাপুটে লেখক হিসেবে সমাদৃত। ১২ ফেব্রুয়ারি ছিলো এই কথাসাহিত্যেকের মৃত্যুদিন। তাকে স্মরণ করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন কলকাতার আরেক প্রখ্যাত গীতিকবি ও শিল্পী কবীর সুমন। স্ট্যাটাসে মূলত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে তার সাক্ষাৎ, লেখককে নিয়ে তার মূল্যায়ণই ঠাঁই পেয়েছে। আখতারুজ্জামানকে নিয়ে কবীর সুমনের স্মৃতিচারণাটি হুবুহু তুলে ধরা হলো-

‘‘আমার এক ছেলে মেহদির লেখা থেকে জানলাম আজ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন।

আমার ঘটনাবহুল, অভিজ্ঞতাবহুল জীবনে ‘পুরুষ’ ও ‘মানুষ’ যে অল্প কয়েকজনকে দেখেছি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁদের একজন।

তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’ দিয়ে শুরু। রক্তমাংসের মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় ডাক্তার স্থবির দাশগুপ্তর মাধ্যমে। স্থবির ছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিকিৎসক। দক্ষিণ কলকাতার একটি নার্সিং হোমে স্থবির ক্যান্সার আক্রান্ত তাঁর এই রুগীকে বাঁচানোর জন্য তাঁর একটি পা কেটে বাদ দিতে বাধ্য হন। বাংলাভাষার এক সেরা কাহিনীকার, গদ্যকার ও ভাবুকের সঙ্গে আমার আলাপ হয় অপারেশনের আগের দিন। ঐদিনই দেখা করতে চেয়েছিলেন তিনি আমার সঙ্গে।

নার্সিং হোমে পৌঁছে প্রথম পরিচয় হয়েছিল তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে। রুগীর ঘরে রুগী ছিলেন না, ছিলেন তাঁর স্ত্রী। শান্ত, বিষণ্ন, কিন্তু এক টুকরো হাসি তাঁর চোখে। বললেন – ‘উনি বাইরে হাঁটাহাঁটি করছেন।’ – বাইরে বারান্দায় দেখি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সেই প্রথম দেখছি। ভেতর থেকে উঠে আসা এক রাশ আবেগের সঙ্গে লড়াই চলছে আমার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখিনি, সতীনাথ ভাদুড়িকে দেখিনি, হেমিংওয়ে স্টেইনবেক কামু মোপাসাঁ টলস্টয় মার্ক টোয়েন বার্নার্ড ম্যালামাড ঠোমাস মান হেনরি মিলার রেমণ্ড কার্ভার গার্সিয়া মার্কেস- আরও কতজনকে দেখিনি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে দেখছি। একটা আস্ত কৌম বাংলাকে দেখছি। একটু ভারি চেহারার মানুষটি হাঁটছেন – পায়জামা পাঞ্জাবী পরা।

‘জীবনে শেষবারের মতো নিজের দুই পায়ে হেঁটে নিচ্ছি, বুঝলেন সুমন।’

তাঁর চিকিৎসক ডাক্তার স্থবির দাশগুপ্ত কাছেই ছিলেন- ডাক্তার হিসেবে ততটা নয়, বরং ইলিয়াসভক্ত বন্ধু হিসেবে।

এ কথা সে কথার মাঝখানে আমি বলেছিলাম – ইলিয়াসদা, ‘phantom limb’ হতে পারে কিন্তু। সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলে তিনি বলেছিলেন – জানি, সুমন, আমি প্রস্তুত। -আমার দুঃখ শুধু একটাই। সারা বাঙলাদেশ আমি প্রায় পেয়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছি। আর পারব না।

সার্জারি ও এম্পিউটেশনের দু’দিনের মাথায় তিনি আমায় ডেকে পাঠান। আমায় দেখামাত্র দুষ্টুদুষ্টু একটা হাসি হেসে খিজিরের স্রষ্টা আমায় বলেছিলেন- সুমন! হয়েছিল! হয়েছিল কিন্তু!

চুলকোচ্ছিল।

আপনি কী করলেন ইলিয়াসদা?

হাসলাম। বেদম চুলকুনি কেটে বাদ দেওয়া পা-এ। আর আমার বেদম হাসি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের জন্য তহবিল তোলার লক্ষ্যে গানের অনুষ্ঠান করতে ঢাকা গেলাম। দেখা করতে চেয়েছিলাম একমাত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে। শহীদ তো আমেরিকায়। রিকসায় চেপে গেলাম ইলিয়াসদার বাড়ি। এক প্রকাশক বন্ধু আমায় নিয়ে গেলেন।

উনি আমায় প্রথমেই যা বলেছিলেন তা লিখতে পারব না এখানে – কথাটা এত মজার ও এতটা সত্যি – ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’র একটি সংলাপ ধার করে নিয়ে বলতে পারি – কী বিভৎস মজা, কী বিভৎস সত্যি।

খানদুই বই উপহার দিলেন আমায়। আমি বললাম- আমি যে কোনও উপহার আনিনি ইলিয়াসদা। তিনি বললেন আপনি যে গানগুলি উপহার দিয়ে চলেছেন আমাদের, সুমন, তার একটির কথা উল্লেখ করে আপনার কাছে জানতে চাই- মরার আগে ‘বিশ্বজুড়ে যৌথ খামার’ কি দেখতে পাবো না।

আমাদের এই সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতার কজন ইলিয়াস-ভগ্নাংশও আমার গান ঐভাবে শুনেছেন। তাঁর সমান কেউ ছিলেন না, নেই। তাঁর ক্ষমতার ছোট্ট একটু ভগ্নাংশর অধিকারী?

বিদায় জানানোর সময়ে আমি বারবার বারণ করা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি এক পায়ে- একটা টেবিল ধরে।

আপনার সঙ্গে আর দেখা হলো না, ইলিয়াসদা। আপনার দেওয়া বই-এ আপনার হাতের লেখা দেখি কখনও। নিয়মিত না। আমারও সময় হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

‘বিশ্বজুড়ে যৌথ খামার’ দেখে মরব বলে মনে হচ্ছে না, ইলিয়াসদা।

আপনার একটি পা থেকে গেছে এই দেশে- এই বিভক্ত দেশের পশ্চিম দিকটায়। আমার শহর কলকাতায়। আপনার বাকি শরীর মিশে গেছে পূব দিকের মাটিতে। আপনার একটি পা- এই দিকে।

অদ্ভূত লাগছে আজ, ইলিয়াসদা। আমার দেহ থেকে কাটা যায়নি কিছু। কিন্তু মন থেকে? এক সময়ে নিজেকে কমিউনিস্ট বলতাম। তারপর এক শ্রেণীর কমিউনিস্ট এখানে যা যা করলেন। আমার অনেক কিছু এখানকার ভদ্রশ্রেণী মাঝেমাঝেই কেটে থাকেন। ‘কাটুয়া’ নামে ডাকেনও অনেকে। কিন্তু ঐ যে ‘বিশ্বজুড়ে যৌথ খামার’ দেখার এক ধরণের স্বপ্নটা। ওটা এখনও ঘাই মারছে শরীরের ভেতরে।

দুত্তেরিকা, সেই কমিউনিস্টই থেকে গেলাম, ইলিয়াসদা।

আমার মন ও ভাবনার নানান জায়গায় “phantom limb”-