চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তিনি কবে আসবেন?

তিনি যেন চিরবিরহী দেবদাসের পার্বতী। আসতে চেয়েও আসেন না। ধরা দিয়েও দেন না। এদিকে বিরহী আত্মা কেঁদে মরে! তার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমাদের রাজনীতির মাঠ শুকিয়ে কাঠ! এদিকে বাজারের তেজও কমে না। আমাদের মনমেজাজেও আজ উত্তাপের আভা। আদালত প্রাঙ্গণে নজিরবিহীন হৈহৈ রৈরৈ। একটু সুশীতল-বার্তার জন্য আমরা গভীর প্রতীক্ষায় আছি।

তিনি কবে আসবেন? আমরা যে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি পথপানে। অপেক্ষা করে আছি অসীম আগ্রহে। তিনি এলে স্বস্তি। শরীরে আরাম, মনে পরম নিশ্চিন্তি। এত তাপ-চাপ সামলে, এত অস্বস্তিতে দিনরাত কাটানো- আর যে সয় না!

সময় তো হয়ে গেল, ভোরের কুয়াশারা গেল কই? রাতেও দেখি ঝকঝকে আকাশ। কড়া রোদের কারণে সোয়েটার–মাফলার এখনও আলমারিতে পড়ে আছে বেজার মুখে। পেঁয়াজ-রসুন-কপি, সিম, বেগুন, টমেটোসহ সমস্ত আনাজের দাম আকাশছোঁয়া। মাছ-মাংস-চাল-ডাল-তেলেও উত্তাপ। টেনে–হিঁচড়ে বাড়ানো ফুলকপিতে স্বাদ মিলছে না। কমলালেবুর হালি এখনও নাগালের বাইরে। রসের হাঁড়ি খেজুর গাছের টঙে ঝুলছে চাতক পাখির মতো। কয়েক ফোঁটা পড়বে কবে? সকলেই তাই জানতে চায়, কই তিনি? কত দূরে?
অবশ্য খবর কিছু মিলছে। ঘোষণা হচ্ছে নানারকম। কখনও ঘোষণা হচ্ছে, বেশি দূরে নয়। আর মাত্র ক’টা দিনের পথ। পাহাড়ে বরফ পড়েছে। তাই আর চিন্তার কারণ নেই। সেই বরফের দেশ পেরিয়ে তিনি এলেন বলে। দেশের কিছু জায়গায় নাকি তার দেখা মিলছে। আবার কখনও ঘোষণা হচ্ছে, সময় লাগবে। পাহাড়ের বরফে আজকাল নাকি ভরসা নেই। হাওয়া–বাতাসের গতিপ্রকৃতি উল্টে–পাল্টে গেছে। কোন পথে সে চলবে ফিরবে ঘুরবে, আগাম যায় না বোঝা। আধুনিক যন্ত্রকেও বোকা বানিয়ে লুকোচুরি খেলে। ঘোষণা যা–ই হোক, বাধাবিপত্তির শেষ নেই। সমুদ্রের জলভরা মেঘ প্রাচীরের মতো তার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে বারবার।

এ বছর মৌসুমী বায়ু কিছুটা দেরি করে এসেছিল, আবার চলে গেছে আরেকটু দেরি করে। তাই তিনিও আসছেন কিছুটা দেরিতে। চলতি মৌসুমে তার দেরিতে আসার অন্যতম কারণ পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। একের পর এক পশ্চিমি ঝঞ্ঝার কারণে শীতল বাতাস প্রবেশ করতে পারছে না সমতল ভূখণ্ডে। তাই তিনি জাঁকিয়ে বসতে পারছেন না!

রাজধানীতে এই মুহূর্তে তার সাক্ষাতের আশা করা ঠিক হবে না। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের জন্য তাপমাত্রার পারদ কিছুদিন বেশ কম ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ফের স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর কম হলে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। কিন্তু রাজধানীর তাপমাত্রা এখনও ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। আপাতত ১৫ ডিসেম্বরের আগে তিনি পুরোপুরি আবির্ভূত হবেন না বলেই মনে করছে আবহাওয়া অফিস।

আবার এমন ফিসফিসানিও শোনা যাচ্ছে যে, এ সপ্তাহেই তিনি নাকি পৌঁছে যাবেন। কিন্তু মনে জাগছে শঙ্কা। রোদের উত্তাপ যে কমছে না! তিনি এলে শুধু কুয়াশা, কমলালেবুর আনন্দ নয়, কাটবে অসুখবিসুখের প্রকোপ। কমবে সর্দি, কাশি, জ্বরজারি। এমনিতেই তিনি এখানে বেশিদিন থাকতে চান না। গুছিয়ে বসার আগেই পালাই–পালাই ভাব। পালিয়েও যান। কে জানে কীসের এত তাড়া? তার ওপর যদি দেরি করে সফর কাঁটছাট করেন, আমরা যাই কোথায়? তাই অনুরোধ, প্লিজ আসুন। সকালের রোদে দাঁড়িয়ে বলি, আহ্, কী আরাম!

বিজ্ঞাপন

হোক না সে পুরোপুরিভাবেই রিক্ততার ঋতু! তবুও আমাদের কাছে অনেক প্রিয়। অনেকটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই দুই লাইনের মতো, ‘সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে।’

বাংলায় তার উপস্থিতি তো মাত্র হাতে গোনা ক’দিনের। বাকি সারা বছরই ঘেমে-নেয়ে কাবু থাকতে হয়। বাঙালি মধ্যবিত্তের এই কদিন যেটুক সুখ ভোগ। ভোরের কুয়াশা, হিমেল বাতাস, গরম চাদর, রঙিন সোয়েটার, হাল-ফ্যাসনের জ্যাকেট, বিচিত্র পিঠা। সেই সঙ্গে সার্কাস, পিকনিক, জঙ্গলে আর নদীর বুকে ভ্রমণ।

টানা গরম, আর তারপর অবিরাম বৃষ্টিতে নাকাল আমজনতার স্বস্তির আশ্বাস তো তিনিই। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও তিনিই শরীর ও মনকে রাখে সতেজ। এ এক অন্য অনুভূতি। তার মিষ্টি রোদ মাখা দিন ছোট হতে হতে ক্রমশ কম্বল-লেপে জড়ানো এক দীর্ঘ রাতে পরিণত হয়। কুয়াশা ভরা প্রাতঃভ্রমণে মাফলার, টুপি জড়ানো সকালে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে কিছু গসিপ ও খবরের কাগজে চোখ বোলানোর অনুভূতি সত্যিই বড় রোমাঞ্চকর। ঘরের এককোনে বসে তাপ পোহানো, ঠোঁট ফাটা শুস্ক ত্বক, ছাদে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়ানো, রাতে তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার তাড়া – এই সবই যেন একমাত্র তারই অবদান। ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এই সময়টাকেই বেছে নেয় বেড়াতে যাওয়ার জন্য।

তার উপস্থিতি মানে দিকেদিকে উৎব আর মেলার আয়োজন, মাঠে-ঘাটে খেলার তোড়জোড়।
নবান্ন-পিঠা উৎসব। তার উপস্থিতি গায়ে কাঁটা দিক। তিনি আসুন কুয়াশা নিয়ে। সর্ষেখেতের মায়া পেরিয়ে। বহুদিন কুয়াশায় খোলা পায়ে আমাদের হাঁটা হয় না। হেঁটে হেঁটে থেমে যাওয়া সব পথ অতিক্রান্ত হোক। পথের শেষ হোক গোধূলি। একঘেয়ে বেলা কাটাতে আজ তার কাছেই আমাদের আবদার!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: