চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তাড়াতাড়ি মানেই বাড়াবাড়ি!

যখনই কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটার পর প্রশাসনিকভাবে তাড়াতাড়ি কিছু করা হয়, তখনই বোঝা যায় সেখানে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের কিছু রয়েছে। সেখানে ঘাপলা আছে, এটা বুঝতে খুব বেশি কষ্ট হয় না সাধারণ মানুষের।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত ঘটনা হচ্ছে বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি দোষ স্বীকার করেছেন, বলে বরগুনার এসপির সংবাদ সম্মেলন। তার এই সংবাদ সম্মেলনকে হাইকোর্ট বলেছেন, এটা অযাচিত বা অনাকাঙ্খিতই নয়, বরং ন্যায়নীতি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পরিপন্থি।  রিফাত মারা গেল। তাকে যে মেরেছে সেও ক্রসফায়ারে মারা গেল। কত তাড়াতাড়ি ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। স্ত্রী মিন্নি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত, সুতরাং তাকে গ্রেপ্তার, কারাগারে প্রেরণ। অর্থাৎ সবকিছু দ্রুত ঘটাতে হবে- কেউ একজন আড়াল থেকে নির্দেশ দিচ্ছে আর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, এ রকমই যেন মনে হচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে বরগুনার কোনো আইনজীবী মিন্নির পক্ষে দাঁড়ালো না। মিন্নি দোষী কি নির্দোষ- সেটা আদালত বলবে। কিন্তু একজন আইনজীবী, যিনি পড়াশোনা করেই এই আইন পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন, যিনি জানেন একজন খুন করে এসেছেন, তারও আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে।  আদালতে যুক্তি, পাল্টা যুক্তির পর বা সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত সেই খুনি হেরে যাবে সেটা অন্য বিষয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই বিষয়ে সুরাহা হচ্ছে ততক্ষণ অপরাধীর জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু বড়ই আজিব মনে হয়েছে-বরগুনার কোনো আইনজীবীই প্রথমদিকে ওই মিন্নির পাশে এসে দাঁড়ায়নি।  সব সম্ভবের দেশ…
খুবই অবাক লেগেছে, কিছু আসামিকে আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করে বলেছে, কেন সুনাম দেবনাথকে আসামী করা হলো না?

মিন্নি-মিন্নির জামিন বহাল, মুক্তিতে বাধা নেইআমরা আর কত নাটক দেখবো? কত কুশলী এই নাটকের নির্মাতা! ধারাবাহিক নাটক যেন এই রিফাত শরীফ হত্যা মামলা। কত দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে প্রতিটি পর্বের।  দর্শককে টানতে পারছে এই নাটকের পেছনের কুশলী নাট্যকার।  সবশেষ ওই আসামীদের চিৎকার করে সুনাম দেবনাথের বিষয়টি বলা যেন সারা দেশের দর্শকের এই নাটকের পরবর্তী পর্বের জন্য উন্মুখ করে রেখে দিল।

তাড়াতাড়ি হলেই বাড়াবাড়ি হয়, তার প্রমাণ হচ্ছে-রিফাত মারা গেল, দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় মিন্নিকে নিয়ে নানা রকম তথ্য প্রচার শুরু হয়ে গেল। অর্থাৎ মিন্নির সব দোষ। কতটা প্রভাবশালী নাট্যকার হলে রিফাতের বাবাকে পকেটে নিয়ে এসে সমাজের সামনে বলানো হলো, তার পুত্রবধূ মিন্নিই এই হত্যার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছে। নাট্যকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ যেন বুঝতে না পারে যে, সেই নাটের গুরু, সে জন্য আড়ালে থেকে নয়ন বন্ডকেও সরিয়ে দিল। অথচ অভিযোগ রয়েছে, এই নয়ন বন্ডই ছিল নাট্যকারের মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার।

বিজ্ঞাপন

নয়ন বন্ডকে দৃশ্য থেকে সরিয়ে দিয়েই মিন্নি হল লক্ষ্যবস্তু। অর্থাৎ মিন্নিকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করতে পারলেই সে থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেই মতে পুলিশ প্রশাসনও ম্যানেজ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি করে মিন্নি কি স্বীকারোক্তি দিয়েছে রিমান্ডে মাইরের ভয়ে, সেটা পাবলিককে জানানো প্রয়োজন। যাতে পাবলিক এই নাটকের অবসানের গন্ধ পেতে চায়। কারণ মিন্নি স্বীকার দেয়া মানে আর কেউ এই মামলার ব্যাপারে আগ্রহী হবে না। যার নেতৃত্বে এই নাটকের সূচনা সে থেকে যাবে আড়ালেই।

এই হচ্ছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। আমরা কত দ্রুত নিজেদের মনকে পরিবর্তন করতে পারি সেটার নিয়ন্ত্রক হচ্ছে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। পত্রিকায় পড়ে আহা উহু করি। রিফাতকে মেরেই ফেলল এভাবে? আবার মনে মনে ভাবি, এবার ওই নয়ন বন্ডকে মেরে ফেলা উচিত। সেটাও হয়ে গেল। কারণ সে খারাপ মানুষ।  যখন নয়ন মারা গেল, মানুষের মনে স্বস্তি এল। তখন আবার আমাদের মনের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য মিন্নিকে সমাজে হেয় করা শুরু হল।  যেহেতু সে মেয়ে! সে কেন বন্ধুর জন্মদিনে এভাবে কেক খাওয়াতে গেল। আমাদের মনকে পরিবর্তনের পেছনের নাট্যকারকে দক্ষ না বলে উপায় নেই।  আমরা মনে মনে বললাম, আহারে মাইয়া তুই কেন গেলি ওই বদমাইসটার জন্মদিনে.. তোরও সমস্যা আছে।

ফাইল ফটো

এটা যখন প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলো নাট্যকার তখন সে খেলল অন্য খেলা। রিফাতের বাবাকে দিয়ে মানববন্ধন করালো মিন্নিকে গ্রেপ্তারের জন্য, এই হত্যার পেছনে মিন্নিই প্রধান। আমাদের মন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, পাঠক খেয়াল করছেন? তারপর ঢাকা থেকে যখন মানবাধিকার কর্মীসহ আইনজীবীরা বরগুনায় গেলেন তখন নাটকের দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে থাকলো। আমাদের মন আবার পরিবর্তন হতে থাকল-যখন মিন্নি জামিন পেল। আর আসামীদের চিৎকার শোনা গেল-সাংসদপুত্র সুনাম দেবনাথকে কেন আসামী করা হল না..তখন আমরা মনে মনে বলছি আসলে ওই ব্যাটাই মুল কারিগর।

সমাজ আমাদের মনকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, এ থেকেই কিছুটা বোঝা গেল। আমাদের সমাজে সব সম্ভব, এ কথা বলতেও কোনো দ্বিধা নেই। প্রকৃত আসামী ধরা পড়বে, যার যতটুকু দোষ তাকে সেই শাস্তি পেতেই হবে। এই তত্ত্ব কথাটি তারপরেও আমরা বিশ্বাস করি। কারণ আমরা নিজেদের সভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। তাড়াতাড়ি করে কোনো কিছুর বাড়াবাড়িতে বিশ্বাসী নয় সভ্য সমাজের মানুষ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View