চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তফসিলের পরে ভোট বন্ধ!

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করে উচ্চ আদালত যেদিন (৬ মে, রোববার) আদেশ দিলেন, তার ঠিক ৯ দিন পরেই (১৫ মে) এখানে ভোট হবার কথা ছিল। তার মানে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ আগে এই নির্বাচন স্থগিত করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই আদেশের পরে নির্বাচন কমিশনও গাজীপুরে সকল ধরনের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড স্থগিত করেছে।

সংবিধানের ১২৫ (গ)অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পরে কোনো নির্বাচনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে যুক্তিসংগত নোটিশ ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে আদালত কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ বা নির্দেশ দেবেন না। এখন প্রশ্ন হলো, গাজীপুর সিটির নির্বাচন স্থগিত চেয়ে একজন জনপ্রতিনিধির রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট যে আদেশ দিলেন, তার আগে নির্বাচন কমিশনকে ‘যুক্তিসংগত নোটিশ’ ও ‘শুনানির সুযোগ’ দেয়া হয়েছিল কি না?

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেছেন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত এ নির্দেশনা দিয়েছেন, ইসির কোনো আইনজীবী সেখানে ছিলেন কি না, সেসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না।

স্মরণ করা যেতে পারে, গত ১৭ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচন স্থগিত করে হাইকোর্ট যেদিন আদেশ দিয়েছিলেন, তখনও এই প্রশ্ন উঠেছিল যে, নির্বাচন কমিশনকে ‘যুক্তিসংগত নোটিশ’ দেয়া হয়েছিল কি না? ওই সময়ে একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক খবরে নির্বাচন কমিশন সচিবের বরাতে বলা হয়, তারা এ বিষয়ে কোনো নোটিশ পাননি। তবে আদেশের দিনে আদালত থেকে মৌখিক খবর পেয়ে কমিশনের প্যানেল আইনজীবী অনধিক পাঁচ মিনিটের জন্য শুনানিতে অংশ নেন, যদিও এ ব্যাপারে তিনি কমিশনের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন না এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি কমিশনের পরামর্শও নেননি। তিনি শুনানিকালে আদালত থেকে সময়ও চাননি (প্রথম আলো, ২২ জানুয়ারি ২০১৮)।

যে যুক্তিতে গাজীপুরের এই নির্বাচন স্থগিত হলো, সেই একই যুক্তিতে অর্থাৎ সীমানা জটিলতা বিষয় এক রিটের প্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছিলেন হাইকোর্ট। যদিও সেই তিন মাস সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে গত ১৭ এপ্রিল। অবশ্য ঢাকা উত্তরের নির্বাচনটি যে শেষমেষ আটকে যাবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা ছিল। কিন্তু গাজীপুর নিয়ে এরকম কোনো শঙ্কা ছিল না। ফলে রোববার দুপুরে যখন উচ্চ আদালদের আদেশটি জানা যায়, সেটি অনেককেই বিস্মিত করেছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে সাভারের ছয়টি মৌজাকে (শিমুলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বড়বাড়ী, ডোমনা, শিবরামপুর, পশ্চিম পানিশাইল, পানিশাইল ও ডোমনাগ) গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। কিন্তু তা নিষ্পত্তি না হওয়ায় পুনরায় রিট দায়ের করা হলে আদালত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিতের আদেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ ২০১৩ সালের রিটের আদেশ এলো ৫ বছর পরে, ভোটের ঠিক আগ মুহূর্তে!

 

বিজ্ঞাপন

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে গাজীপুর সিটি

রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সিটির নির্বাচনটি এমন সময়ে স্থগিত করা হলো যখন প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। বড় দুই দলের মেয়র প্রার্থীদের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ থাকলেও ভোটের পরিবেশ যথেষ্ট শান্তিপূর্ণই ছিল এবং বড় কোনো নাশকতার আশঙ্কা ছিল না। একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতো বলে ধারণা করা যায়। সেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং সেইসাথে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হবার বাড়তি সুবিধার কারণে জয়ের পাল্লা মোটামুটি তার পক্ষে ভারী ছিল বলেই আন্দাজ করা যায়। সুতরাং সরকারের ‘ইঙ্গিতে’ বা ‘হস্তক্ষেপে’ এই নির্বাচনটি স্থগিত হয়েছে-এমন কথা বলা মুশকিল। যদিও বিএনপির তরফে বলা হচ্ছে, নিজেদের দলের প্রার্থীর ভরাডুবি জেনেই আদালতের মাধ্যমে নির্বাচন স্থগিত করেছে সরকার

গাজীপুর সিটি এমনিতেই ঘনবসতিপূর্ণ, প্রচুর শিল্প-কারখানার কারণে পরিবেশগত নানা ঝুঁকিতে থাকা নগরী। সে হিসেবে এখানের রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ, পরিবেশ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন হবার কথা ছিল, তা হয়নি। কারণ এখানের মেয়র ছিলেন বিএনপির লোক। সরকারবিরোধী লোক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকলে যে আখেরে জনগণের ক্ষতি হয়, তার উদাহরণ আমরা সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীতেও দেখেছি। ব্যতিক্রম অবশ্য কুমিল্লা। সেখানেও অন্য রাজনীতি আছে।

তবে গাজীপুরে যদি নির্বাচনটি হয়ে যেত এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী জয়ী হতেন, তাহলে গত ৫ বছর ধরে সয়ে আসা এই মহানগরীর মানুষের বঞ্চনার অবসান হতো। কিন্তু এখন ভোট না হওয়ায় নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নিশ্চয়ই এখান একজন প্রশাসক বা আমলাকে বসানো হবে। আমলাদের দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা সংবিধানের ৫৯ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হবার কথা।

যেদিন গাজীপুর সিটির নির্বাচন স্থগিত করা হলো সেদিন সরকারের অংশ এবং একইসঙ্গে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছেন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থগিতের খবরে সাধারণ মানুষের মনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। গাজীপুরের ভোট স্থগিত করার এই ঘটনাটি আসলেই আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় তৈরি করেছে কি না বা করবে কি না, অথবা এই নির্বাচনের সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা কঠিন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)