চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঢাকা শহরে এতো ক্যাসিনো, কল্পনায় ছিলো না: মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া

মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে নিয়োগ পান এই বছরের ০৩ জানুয়ারি। দুই বছরের চুক্তিতে তাকে এই নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ছিলেন। এনবিআর এ মো. নজিবুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মোশাররফ হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর নরসিংদীর সন্তান মোশাররফ ১৯৮১ সালের বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সেতু বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব পদে নিয়োগ পান। একই বছরের ২৯ জুলাই পদোন্নতি পেয়ে সচিব হন তিনি। এ দায়িত্ব পালনকালে পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দিতে কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনকে ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বনানী থানায় মোশাররফ হোসেনসহ সাত জনকে আসামি করে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদক। মামলার পর মোশাররফ হোসেনকে ওএসডি বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়। ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর হাইকোর্ট থেকে বের হওয়ার পর গণপূর্ত ভবনের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে কয়েক দফায় রিমান্ড মঞ্জুর করে পরে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামিন পান মোশাররফ হোসেন। তদন্তের পর দুদক জানায়, আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুদক চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর ২০১৪ সালের অক্টোবরে পদ্মাসেতু দুর্নীতি মামলার অবসান ঘটে। সচিব মোশাররফ হোসেনসহ সাত আসামির সবাইকে অব্যাহতি দেয় আদালত। পরবর্তীতে কানাডার আদালতে দায়ের করা মামলাতেও খালাস পান আসামিরা। এরপর ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর শিল্প সচিব পদে নিয়োগ পেয়ে মোশাররফ ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। ওই বছরের ৩০ জুন অবসরোত্তর ছুটিতে পিআরএল এ যাওয়ার কথা ছিল মোশাররফের। তবে একদিন আগে ২৯ জুন পিআরএল বাতিল করে তাকে এক বছরের চুক্তিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে রেখে দেয় সরকার। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে জেলখানাটা মোশাররফ হোসেনকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তার কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। সম্প্রতি জাহিদ নেওয়াজ খানের পরিকল্পনা ও রাজু আলীমের প্রযোজনায় চ্যানেল আই এর টু দ্য পয়েন্ট অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারের চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযানসহ নানা প্রসঙ্গে সোমা ইসলামের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে কথা বলেন মোশাররফ হোসন ভুঁইয়া।

প্রশ্ন : শহরজুড়ে কালো টাকার খনি। এই কালো টাকার উৎস হিসেবে ঢাকা শহরে ৬০ টার বেশি ক্যাসিনো গড়ে উঠলো কিভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে আপনাদেরকে ফাঁকি দিয়ে?

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: প্রথমে ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির কথা বলি। আমাদের দেশে এতো ক্যাসিনো আছে তা আমার কল্পনায়ই ছিল না। আমি জানিই না। আমরা শুধু বড় বড় ক্লাব আছে গুলশান ক্লাব, ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাব এবং অফিসার্স ক্লাব- এই সব জায়গায় মাঝে মাঝে হাউজি খেলা হয় এবং তা এখনো চলছে। ক্লাবের মেম্বাররা বিনোদন হিসেবে হাউজি খেলে। এটা জুয়া খেলা হিসেবে না। পৃথিবীর অনেক দেশেই লাইসেন্সপ্রাপ্ত জায়গায় ক্যাসিনো চলে এবং সেখানে যারা যায়- তারা অনেকেই সময় কাটানোর জন্যে যায় এবং এইগুলো পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। আর আমাদের এখানে যা হচ্ছে তা খবরের কাগজ ও অন্যান্য অবস্থা দেখে বোঝা গেছে- এই সব জায়গায় শুধু জুয়া খেলা হচ্ছিল না? এখানে আরও অনেক ধরণের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছিল।চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এই সব জায়গায় বিরাট শ্রেণী গড়ে উঠেছে অপরাধীদের। চাঁদাবাজির ভাগাভাগির টাকা- যেখানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অপারেশন চালাচ্ছে সেখানেই সিন্দুক ভর্তি কোটি কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো নগদ টাকা এবং তা কোথা থেকে এলো সেই প্রশ্ন জাগে? কেউ কেউ বলে এইগুলো জুয়ার টাকা। জুয়ায় তো হারজিত হয়। কিন্তু একজনই জিতে এতো টাকা এক জায়গায় রেখেছে? তা কি করে হয়? নিশ্চয়ই এই টাকার অন্য কোন সোর্স আছে এবং এই টাকা অপরাধের মাধ্যমেই জমা হয়েছে। আরেকটা খবর আমরা শুনেছি এই সব টাকার অনেকটা আবার দেশের বাইরেও পাচার হয়ে গেছে।সেই টাকাও এই জুয়ার আড়ালে অন্য উৎসের টাকা।

প্রশ্ন : ক্যাসিনোর জিনিসপত্র কিভাবে কাস্টমস ফাঁকি দিয়ে দেশে আসলো?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: জুয়া এবং মদ দুইটাই নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধুর আমল ১৯৭৩ সাল থেকেই। মদের বিষয়- নিয়ন্ত্রিত কিছু জায়গায় বিদেশীদের জন্যে বৈধ। আমাদের কেউ যদি ভোগ করে সেক্ষেত্রে আলাদাভাবে করতে হবে এবং ওই সব নিয়ন্ত্রিত জায়গায় গিয়ে করতে হবে। যেমন, বড় বড় ক্লাবগুলোকে আমরা সীমিত আকারে এইগুলো আমদানির সুযোগ দিয়ে থাকি-একইভাবে পাঁচ তারা হোটেলগুলোতে। এইগুলো কাস্টমস এর হাই ডিউটি দিয়ে তা আনা হয়। আর বন্ডেড হাউজুগলোকে, যারা ডিপ্লোম্যাট আছেন তাদেরকে দেওয়ার জন্যে আমরা বৈধ করেছি। সেই পরিমাণই তাদের আনা দরকার যতটুকু তারা কনজিউম করে। আর ক্যাসিনোর জিনিসপত্র আমদানি নীতিতে বৈধ করা হয়েছে তা ঠিক নয়। আমদানি নীতিতে তা নজর এড়িয়ে গেছে। আমাদের দেশে যে ক্যাসিনো হবে তা তো আমরা কখনো চিন্তা করি নাই। তাই নিষিদ্ধ আইটেমের ভেতরে এটি যায়নি। আমদানি নীতিতে থাকে নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত কোনগুলি? এর বাইরে যেগুলো সে সবই আমদানি যোগ্য। আমদানি নিষিদ্ধ করা হয় নাই ক্যাসিনোকে। আমদানি নীতিতে বলে নাই যে, জুয়ার সামগ্রী আনা যাবে। ক্যাসিনো শব্দটা সেখানে বাদ পড়েছে এবং জুয়ার সামগ্রী এই জিনিসটাও হয়তো সেখানে আসে নাই। আমরা আসলে চিন্তা করি নাই যে, এই দেশে ক্যাসিনোর বিস্তার হবে।

প্রশ্ন : এই ঘটনায় আপনারা বুঝলেন, এখন কি হবে?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: এখন যে বিষয়টা হবে- আমি ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত আমাদের যে শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তর আছে তাদের মাধ্যমে সব দেখছি যা কনসাইনমেন্ট এ পর্যন্ত এসেছে। কিছু কিছু এর মধ্যে পাওয়া গেছে, খুব বেশি না। ক্যাসিনোর সামগ্রী ডিক্লেয়ার করে এনেছে। আমার মনে হয় আইসিডিতে, ঢাকা কাস্টমস হাউজে আর বেনাপোলে পাওয়া গেছে। জাস্ট একটা দুইটা করে পাওয়া গেছে। আর অন্য যে গুলো এসেছে তা মিস ডিক্লারেশন মাধ্যমে।তাদেরকে যদি আমি প্রশ্ন করি যে, তোমরা কেন ছেড়েছো? তখন এই জবাবটা আসবে যে, এটি তো আইনে নিষিদ্ধ নয়।

প্রশ্ন : তারা তো তাহলে অবৈধ কিছু করেনি- তাহলে আপনি এনবিআর থেকে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছেন?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: আমি আমদানীকারক এবং আমার অফিসারদের প্রশ্ন করবো। তারপরে তাদের জবাব এবং পরবর্তীতে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়- তার জন্যেই আমি এই জিনিসগুলো কিন্তু যাচাই করাচ্ছি।

প্রশ্ন : আমদানিতে এই সব নিষিদ্ধ না, তাহলে কেন আমদানীকারকদের উপরে আপনারা চড়াও হচ্ছেন?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: চড়াও না- বের করছি যে, কি পরিমাণ এসেছে? এরপরে কি ব্যবস্থা নেব সেটি আমরা দেখবো আইন এবং বিধি অনুযায়ী। এর জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। আর সরকারের যে বিষয়টি- আপনি দেখেন, প্রথমদিন আমাদের একজন মাননীয় রাজনীতিবিদ বলেছিলেন- পুলিশ এতো দিন কি করলো? এখন কেন ধরছে? এই বিষয়টা কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে এসে সাধারণ মানুষ এবং আমরাও যারা আছি- তারা এই ব্যাপারে এইভাবে সচেতন হয়েছি যে, এখানে শুধুমাত্র ক্যাসিনো চালানো হচ্ছে- তা নয়? এখানে অনেক অপরাধ হচ্ছে। সেই জন্যেই কালো টাকার খনি আপনারা বলছেন।যাদের নাম খবরের কাগজে এসেছে। যাদেরকে সন্দেহ করা হচ্ছে এখন তাদের এবং তাদের পরিবারের অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ব্যাংকের জমা টাকা ব্লক করে দিচ্ছি। কিন্তু আমার ধারণা এতে খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না। কারণ ওই টাকা তো ব্যাংকে যায়নি?

প্রশ্ন : সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনের অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখার জন্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই সংসদ সদস্যরা কিন্তু তাদের হলফনামায় নির্বাচন কমিশনে তাদের তথ্য- আয় ব্যয়ের হিসাব দেয়। আপনারা কেন সেইগুলো খতিয়ে দেখেন না? এদের ফাইলগুলো সবারই তো ট্যাক্স নাম্বার আছে? ট্যাক্স নাম্বারে কে কিভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ছে এনবিআর কেন সেই দিকে নজর দেয়নি?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: আমরা দেখছি।

প্রশ্ন : এখন কেন দেখা হচ্ছে?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: আগেও দেখেছি। ইলেকশনের পর থেকেই আমরা দেখছি। ভেতরে ভেতরে দেখে দেখে কাকে নোটিশ করছি, আর কাকে করছি না- এইগুলো আমরা খবরের কাগজে দেই না। সংসদ সদস্য বলেন, প্রাক্তন মন্ত্রী বলেন– আমরা তাদেরকে আমাদের হিসাব নিকাশের ভেতরে এনে ডিমান্ড করছি এবং অনেকের টাকাও ফ্রিজ করা আছে। আস্তে আস্তে টাকা দিচ্ছে তারা।যে অপ্রদর্শিত আয় আছে।তা যদি আমরা ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে জানতে পারি কিংবা আমরা জানতে পারি যে- কেউ সঞ্চয়পত্র কিনেছে বা অন্য কোন সেভিংস ইন্সট্রুমেন্ট কিনেছে তখনই কেবল আমরা ধরতে পারি। নগদ টাকা যেটা রেখে দেয় তা যদি আমরা ট্রেস করতে না পারি তাহলে কিন্তু তা আমাদের ধরার কোন উপায় নাই।

প্রশ্ন : কিন্তু জি কে শামীমের মত মানুষ। যার ৬ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন-একে কেন আপনারা নজরদারির ভেতরে আনেননি? প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরে আপনারা এতোটা অ্যাকটিভ হয়ে গেলেন?

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: জি কে শামীম একজন ঠিকাদার হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। কিভাবে তিনি ঠিকাদারি পাচ্ছেন না পাচ্ছেন, তা যারা তাকে কাজ দিয়েছেন তারা জবাবদিহি করবেন। তার ব্যাংক হিসাব যখন তলব করেছি। ব্যাংকের থেকে তার হিসাব কিতাব আসবে। তারপরেও যে বিষয়টা আমার ট্যাক্স অফিসাররা বলেছে- সরকারি যে সব কাজ তিনি করছেন। সেখান থেকে কিন্তু প্রত্যেক বিলের এগিনেস্টে আমরা অগ্রিম ইনকাম ট্যাক্স কেটে রাখি। অর্থাৎ তিনি যা ওই বিলের এগিনেস্টে পাবেন সেগুলোর ৫-৭ পারসেন্ট আমরা যে অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স কেটে রাখি- এরপরে তিনি আয়ের যে হিসাব দেবেন দেখা যাবে যে, তার কাছ থেকে আমরা অবশিষ্ট হয়তো সামান্য টাকা পাবো। কিন্তু তিনি যদি অন্য উপায়ে এই ঠিকাদারি বিজনেস ছাড়া অন্য কোন জায়গায় অর্থ গোপন করেন এবং সেগুলো ব্যাংকে রাখেন তাহলে হয়তো আমরা এটি থেকে অপ্রদর্শিত আয় দেখতো পাবো।

প্রশ্ন : অপ্রদর্শিত আয় সনাক্ত করছেন কিভাবে?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: মানুষকে আমরা আশ্বস্ত করে শেষ করতে পারি না। কারণ দুর্নীতি দমন কমিশন যদি কোন একজনকে ধরে মামলা করে তা থেকে বের হয়ে আসতে তার প্রায় ৫-৭ বছর লেগে যায়। সেই জন্যে তারা ভয় পায়। কিন্তু আমরা যে সুযোগটা দেই। সেটা কিন্তু ফাইন্যান্স বিল এর মাধ্যমে আমরা সংসদে পাশ করিয়ে দেই। কাজেই এটার ফলে যদি সে সুযোগ নেয় তখন দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করলেও দুদক জিততে পারবে না। সে বলবে যে, আমি আইন অনুযায়ী জরিমানা দিয়ে কিংবা সরকার প্রদত্ত সুবিধা গ্রহণ করে আমি আমার অপ্রদর্শিত টাকা দেখিয়েছি। তো এটাতে সে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু ওই জিনিসটা অনেকেই সাহস করেন না।এই বিষয়ে আমি দুদকের সাথে কথা বলেছি-এই সেক্টর যেখানে আমরা আইন করে এই বিষয় চালু করেছি সেখানে তোমাদের হাত দেওয়া ঠিক হবে না।

প্রশ্ন : অপ্রদর্শিত অর্থ নির্দিষ্ট পরিমাণ জরিমানা দিয়ে কয়েকটি খাতে বিনিয়োগ করলে- কোন প্রশ্ন করা হবে না? এই বিষয়ে মানুষের আগ্রহ আছে। আরেকটি বিষয়-২০১২ সালের সংশোধিত ভ্যাট আইনটি কার্যকর হয়েছে ১ লা জুলাই থেকে?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন যে, বাজেট পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি ৫০ মিনিটেরও বেশি সময় বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তার বক্তব্যে যাবতীয় বিষয় উঠে এসেছে। বরাদ্দ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে কোন কোন খাতে কতো ভ্যাট, আয়কর, ডিউটি ইত্যাদি আদায় করবো এবং একই সাথে কি কি প্রণোদনা দিচ্ছি আমরা ব্যবসায়ীদেরকে তার সব তিনি বলে দিয়েছেন। অপ্রদর্শিত আয়কে কালো টাকা বলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে নানা কারণে কিছু কিছু টাকা মানুষের হাতে এসে যায়। যেমন, মনে করেন- কেউ যদি একটা জমি গুলশান বা অন্য জায়গায় বিক্রি করে সে যে টাকায় রেজিস্ট্রেশন করে এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা তার হাতে এসে যায়। শুধু এটা না? আবার কখনো কখনো অনেক সময় দেখা যায় কারো কোন ভুলে টাকা এসে যায়। মনে করেন বিদেশ থেকে কেউ টাকা পাঠালো কিন্তু সেই টাকা সে যথাসময়ে রিপোর্ট করলো না- বিভিন্নভাবে খরচ করলো অথবা সে তার ইনকাম ট্যাক্স ফাইলে দেয়নি।সেসব কারণে যে টাকা তার হাতে এসে যায় এটি যদি সে সঠিকভাবে তার কাজে ব্যবহার করতে না পারে, বিনিয়োগ করতে না পারে তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন যে, আজকাল বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে তাই আমরা এবার বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় সঠিকভাবে ব্যয় করার জন্যে কিছু কিছু খাতের কথা বলে দিয়েছি। এটি আগেও ছিল। সব বছর বাজেটেই অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ থাকে।জরিমানা দিয়ে বৈধ করার সুযোগ থাকে। আমরা জরিমানা ব্যতীত এবার যদি হাইটেক পার্ক এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল এইগুলোতে বিনিয়োগ করে তাহলে শতকরা ১০ শতাংশ হারে ট্যাক্স দিয়ে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এটি একটি বিরাট প্রণোদনা আমরা দিলাম।বিনিয়োগকে এটি উৎসাহিত করবে। কেউ যদি সারাসরি বিনিয়োগ করতে চান সেটাও করতে পারবেন অথবা কেউ যদি দেশি এবং বিদেশী কোন বিনিয়োগকারীর সাথে জয়েন্ট ভেনচার করে যেতে চান তাও পারবেন।

প্রশ্ন : অপ্রদর্শিত অর্থ আর অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ অর্থাৎ ঘুষ, দুর্নীতি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ- এই দুটিকে যদি আলাদা করা যায় কোনভাবে তাহলে নৈতিকতার মানদণ্ড এবং রেগুলার যারা ট্যাক্স দেন তাদের জন্যে স্বস্তির জায়গা থাকে?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া : যারা ঘুষ বা অবৈধভাবে আয় করেন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন বা বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ইনকাম ট্যাক্স তৎপর আছেন। যাদের ট্যাক্স ফাইল নাই এবং যারা এই পর্যন্ত কিছুই হয় নাই কিন্তু সে যদি হঠাৎ করে কোটি কোটি টাকা এনে বিনিয়োগ করা শুরু করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আমাদের অ্যাকশন তো থাকবেই। সেই বিষয় বাদ দিয়ে আমরা যদি বিনিয়োগের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে এবারের বাজেটে যে সুযোগ আমরা দিয়েছি এর সুফল আসবে বলে আমরা মনে করি। তাছাড়া রিয়েল এস্টেট সেক্টরে একটা মন্দাভাব এতোদিন ছিল। আমরা এখানে কিছুটা সুষমকরণ করেছি যে, নির্ধারিত পরিমাণ ট্যাক্স দিয়ে প্রতিবর্গ ফুট হিসাব করে আমরা সেটা ধরেছি। সেই অনুযায়ী যদি তারা ট্যাক্স দিয়ে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে বিনিয়োগ করলে এই সেক্টর আরও চাঙ্গা হবে। এই সেক্টরকে আরও চাঙ্গা করতে আমরা আরও করতে যাচ্ছি তা হলো-রেজিস্ট্রেশনের খরচ কমিয়ে দিয়েছি। এখন মূল্যের শতকরা ১৪-১৫ শতাংশের মতো লেগে যায় রেজিস্ট্রেশনে। এই খরচ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রশ্ন : বলা হচ্ছে যে, এই বছরের বাজেটে ধনীরা অনেক লাভবান হবেন? ইনকাম ট্যাক্সে সারচার্জ সোয়া দুই কোটি থেকে তিন কোটি করাকে ওয়েস্টেজ বলছেন অনেকে?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া : ধনীদের কথা বলা হচ্ছে এই জন্য যে, আমরা আমদানি শুল্ক বিভিন্ন জায়গায় কমিয়েছি। কমিয়েছি কোথায়? প্রডাকশন সেক্টরে যেসব ম্যাটেরিয়ালস কাজে লাগে বিশেষ করে ’র ম্যাটেরিয়ালস হিসেবে কাজে লাগে সেইগুলো কমিয়েছি এবং তার কারণে যদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়-বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে। দেশের ইকনোমিক অ্যাক্টিভিটিজ বাড়বে তখন কিন্তু গরীব মানুষ কাজ পাবে। আপনি দেখেন- আমাদের দেশে এখন কেন দারিদ্রতা কমছে? কেন মঙ্গা নাই? সেটা হলো এই জন্যে যে, দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে।দেশে যতো ইকনোমিক অ্যাক্টিভিটিজ বাড়বে ততো গরীব মানুষের সুবিধা হবে।কাজেই আমরা যে বড় লোককে আরও বড়লোক করছি তা নয়। আমরা ইনকাম ট্যাক্সে সারচার্জ দুই কোটি পঁচিশ লাখ থেকে তিন কোটি করেছি- তা হলো, যারা ইনকাম ট্যাক্স দেয় এই জায়গায় সারচার্জ যে খুব বেশি আসবে তা কিন্তু নয়। মূল যারা ধনী- দুই কোটি পঁচিশ লক্ষ বা তিন কোটি টাকা যারা ইনকাম ট্যাক্স যারা ৪/৫ বছর দেয় তাদেরই অ্যাসেট হতে পারে। কিন্তু মূল যারা ধনী তারা কিন্তু এর অনেক বড় এবং তাদের কাছ থেকে এবার নতুন একটা জিনিস আমরা বলেছি তা হলো, হাই ইনকাম ইনডিভিউজ্যুয়ালস- যাদের ৫০ কোটি টাকার অ্যাসেট আছে। তাদের কাছ থেকে এখন আমরা শূণ্য দশমিক হারে কর ধার্য করেছি। কাজেই তারা আগে যে কর দিতো সারচার্জ এখন ৫-৬ লক্ষ টাকা বেশি দিবে। এই জিনিসটা এখনো কেউ বুঝতে পারেনি। পরবর্তী পর্যায়ে সেটা আসবে।

প্রশ্ন : ভ্যাট আইন নিয়ে কিছু বলবেন?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া : ভ্যাট আইনে আপনারা জানেন যে, দুই বছরের জন্যে একটা অব্যাহতি ব্যবসায়ীরা পেয়েছিল। তার মানে এই না যে, ভ্যাট ছিল না। ভ্যাট তো ছিলোই। ১৯৯১ সালের আইন বলবৎ ছিল। এখন আমরা যে ২০১২ সালের আইনটি সরকার যেটা পাশ করেছে তাতে ব্যবসায়ীদের সুযোগ সুবিধার দিক দিয়ে অনেক বেশি কিছু ছিল। আর আরেকটি বিষয় এখানে আছে তা হলো- অনলাইন এবং ডিজিটালাইজড। সেটা হওয়ার ফলে যা হবে তা হলো- চাপ বেশি পড়বে না। মানুষের উপরে চাপ বেশি পড়বে না। ব্যবসায়ীদের উপরেও চাপ বেশি পড়বে না। আদায়টা ঠিকমতো হবে। সেই জন্যে এটি করা হয়েছে এবং এই বছর আমরা কয়েকটা স্ল্যাব রেখেছি। পাঁচ, দশ, পনের, সাড়ে সাত- এটা হলো সাধারণ। আর দুই থেকে শুরু করে এই পাঁচের ভেতরে কয়েকটা স্ল্যাব আছে। আমরা সহনীয় করার জন্যে এটিকে প্রথম দিকে যা ছিল। ভ্যাট টার্ন ওভার অব্যাহতি প্রথমে যেটা ৩০ লক্ষ টাকা আগে ছিল তা ৫০ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। এরপরে টার্ন ওভার কর যেটা ছিল সেটাকে আমরা ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত করেছি। তিন কোটি টাকা পর্যন্ত যাদের বার্ষিক টার্ন ওভার তারা ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট দিলেই হবে। আর এর পরে স্থানীয় ব্যবসায় পর্যায়ে সাধারণভাবে যারা ব্যবসা করেন তাদেরকে একেবারে নিম্ন ধাপে রেখেছি।

প্রশ্ন : মাননীয় অর্থমন্ত্রী বারবার বলেছেন, এই আইনটি কার্যকর হলে মানুষের কমোডিটি অ্যাসেনশিয়াল এর উপরে কোন অভিঘাত আসেব না। এই বিষয়ে সংক্ষেপে জানতে চাই?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া : আমরা চিনি আমদানীর উপরে কিছু শুল্ক বসিয়েছি।হিসাব করে দেখেছি- পাঁচ টাকা চিনির দাম বাড়বে। চিনির দাম পাঁচ টাকা বাড়লে কিছু হবে না। কারণ এখন ৪৫ টাকা দরে চিনি বিক্রি হয় এবং বাজারে খুচরা মূল্য ৫০ টাকা। এই ৫০ টাকা চিনি বিক্রি থেকে তা যদি ৫৫ টাকা হয় তাহলে কিছু আসবে যাবে না। কারণ হলো সবজি বিক্রি হয় ৭০-৮০ টাকা করে।

প্রশ্ন : সংক্ষেপে আরও কিছু বলবেন?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া : আমরা যে ভ্যাট আইনটি বাস্তবায়ন করছি এবং অন্যান্য যে কাস্টমস ডিউটি এবং ইনকাম ট্যাক্স যা করা হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষকে কোন কিছু অ্যাফেক্ট করবে না। সুষম এবং জনকল্যাণমুখী বাজেট এবারে হয়েছে। দু্ই একটা জিনিসের মূল্য যদিও বাড়ে আমি বলছি- শুধু চিনি এবং দুই টাকা সয়াবিন তেলের দাম বাড়তে পারে। আর কোন কিছুর দাম বাড়বে না। কারণ ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স সয়াবিন তেলের বিক্রির পর্যায়ে ছিল না। এখন মাত্র ২-৩ পারসেন্ট ভ্যালু অ্যাডেট ট্যাক্স এতে আরোপ করা হয়েছে।

প্রশ্ন : পৃথিবীতে ক্যাসিনো বৈধ অনেক দেশেই। বাংলাদেশে এই ক্যাসিনোকে বৈধতা দেওয়ার ব্যাপারে কি ভাবছেন?

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া : পলিসি মেকার হিসাবে এটি এখনই বলা যায় না। পরিস্থিতি বলে দেবে ভবিষ্যতে কি হবে? যতোটুকু বৈধ করলে দেশের ইকোনমিতে তারা অবদান রাখতে পারবে ততটুকুই বৈধ করা উচিৎ। আমজনতা জুয়া খেলবে এমন সমাজ যেনো না হয়। যেখানে সেখানে ক্যাসিনো তা চলবে না। বড় শহরে একটা দুইটা ক্যাসিনো থাকতে পারে লাসভেগাস বা আটলান্টিক সিটির মতো।কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের মত টুরিস্ট প্রবণ এলাকায় দুই একটার বৈধতা দেওয়া যেতে পারে। তবে সবকিছু পরিস্থিতি বুঝে করতে হবে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।

Bellow Post-Green View