চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ’: নির্দোষ ট্রেন্ড, নাকি অন্য কিছু?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে একেক সময় একেক ধরনের কর্মকাণ্ডের ঝড় উঠে যায়। টানা কিছুটা সময় ধরে লোকজন সেই ট্রেন্ড অনুসরণ করে পোস্ট দিতে থাকে।

এমনই একটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড ‘টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ’ (#10YearChallenge), যেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা তাদের বর্তমান এবং ১০ বছর আগেকার প্রোফাইল পিকচার একসঙ্গে জুড়ে পোস্ট করছেন। এর উদ্দেশ্য মূলত ১০ বছর ব্যবধানে তাদের মাঝে কী পরিবর্তন এসেছে তা ফুটিয়ে তোলা।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই যোগ দিয়েছেন এই ভাইরাল ট্রেন্ড অনুসরণে। ফেসবুকে এই প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়লেও টুইটার এবং ইনস্টাগ্রামেও দেখা যাচ্ছে এর ব্যাপক প্রচার।

কিন্তু এই টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ কি শুধুই একটা নির্দোষ ট্রেন্ড? নাকি এর পেছনে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য?

অনেকের মতে, এই ভাইরাল চ্যালেঞ্জটি চূড়ান্ত বিপজ্জনক না হলেও ব্যবহারকারীদের একটু সচেতন হওয়া উচিত। কেননা হয়তো এটি সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে, বিশেষত ফেসবুকের সাম্প্রতিক ফেসিয়াল রেকগনিশন ফিচারের উন্নতি সাধনের জন্য ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমগুলো এখন উন্নতমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত ফেস রেকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যেগুলো একেকজন ব্যবহারকারীকে অন্য কারও পোস্ট করা ছবি বা ভিডিও থেকে বেশ সহজেই শনাক্ত করতে সক্ষম। আর এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের বয়সের সাথে চেহারার পরিবর্তন বুঝতে আরও বেশি সুবিধা হবে যদি ব্যবহারকারীরা এ ধরনের তুলনামূলক ছবি স্বেচ্ছায় তাদের হাতে তুলে দেন।ফেসবুক-টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ-ট্রেন্ড-ফেস রেকগনিশন

কিন্তু কী দরকার এসবের? ফেসিয়াল রেকগনিশন তত্ত্বের সমালোচকরা বলছেন, এসব ছবি তো ইতোমধ্যে সাইটে আপলোড করাই আছে। সাইট চাইলে যখন তখনই ছবিগুলো পেয়ে যেতে পারে।

এরও জবাব আছে। বিশ্লেষকরা এর পেছনে বেশ কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন।

প্রথমত, আপনি যদি একটি ফেসিয়াল রেকগনিশন অ্যালগরিদমকে অনেকগুলো মানুষের আগের ও পরের চেহারার পরিবর্তন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে চান, তাহলে খুব সুবিধা হবে যদি আপনি নিশ্চিত হতে পারেন সবগুলো ছবির জোড়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে তোলা হয়েছে। এখানে ব্যবধানটা ধরা যাক ১০ বছর।

অবশ্যই আপনি ফেসবুকে ব্যবহারকারীদের অসংখ্য ছবি ঘেঁটেঘুঁটে পোস্ট করার তারিখ এবং ছবির এক্সিফ ডেটা দেখে ছবি বেছে নিতে পারেন। কিন্তু তাতে সময় লাগবে তুলনামূলক অনেক বেশি। তাছাড়া এভাবে খুঁজতে গিয়ে ডেটার মধ্যে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় নয়েজ যুক্ত হবে, যেটা থেকে মুক্তি পেতে আরেক দফা কাজ বেড়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, আমরা অনেক সময়ই পুরনো ছবি প্রোফাইল পিকচার হিসেবে আপলোড করি। কখনো আবার একই ছবি একাধিকবার পোস্ট করি আমরা। ফলে পোস্টের তারিখ থেকে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় সেটি সে বছরই তোলা কিনা।

এক্সিফ (আলোকচিত্রের টেকনিক্যাল তথ্য) ডেটাও সবসময় ছবি তোলার তারিখ নিশ্চিত করতে পারে না। প্রিন্ট করা ছবি স্ক্যান করে আপলোড করা হলে এক্সিফ ডেটায় স্ক্যান করার তারিখই দেখাবে।

এক্সিফে একই ধরনের তারিখ বিভ্রান্তি হবে যদি স্ক্রিনশট তুলে আপলোড করা হয় বা এমন কোনো অনলাইন সূত্র থেকে ছবি নিয়ে প্রোফাইল পিকচার করা হয় যেখানে নিরাপত্তার স্বার্থে এক্সিফ ডেটা মুছে দেয়া হয়ে থাকে।ফেসবুক-টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ-ট্রেন্ড-ফেস রেকগনিশন

তৃতীয়ত, আপনার প্রোফাইল পিকচারের জায়গায় যে আপনার নিজের ছবিই থাকবে এর নিশ্চয়তা কোথায়? আমরা প্রায়ই গ্রুপ ফটো, আমাদের পরিবারের সদস্যদের ছবি, পোষা প্রাণীর ছবি, কার্টুন, এমনকি লতা-পাতা-ফুল বা পছন্দের কোনো উক্তিও প্রোফাইল পিকচার হিসেবে দিয়ে রাখি। এসব থেকে বেছে আপনার আসল ছবিটা বের করা ফেসবুক অ্যালগরিদমের জন্য বেশ ঝক্কিই বটে।

তাই সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি নিজেই নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে তোলা আপনার একসেট ছবি ফেসবুকের হাতে তুলে দেন। আপনাকে আপনার চেয়ে বেশি আর কে চিনবে? ছবি তোলার সময়টাও সবচেয়ে বেশি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন আপনিই।

অনেক ব্যবহারকারী আবার এসব কোলাজ করা ছবির সাথে উপরি কিছু তথ্যও দিয়ে দিচ্ছেন। যেমন: ২০০৯ সালের অত তারিখে অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তমুক অনুষ্ঠানে তোলা।

বিজ্ঞানী এবং সামাজিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ নামক ভাইরাল এই ট্রেন্ডের উসিলায় এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অসংখ্য ব্যক্তির নিজ হাতে সযত্নে বাছাই করা প্রায় ১০ বছর ব্যবধানের একজোড়া করে তুলনামূলক ছবি সহজেই পেয়ে যাচ্ছে।