চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

টাঙ্গুয়ার হাওর: আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি

অথৈ জলরাশির যে রূপ তা কথা কেড়ে নেয়। মনের ভেতর কেমন শূন্যতা তৈরি করে! সব এলোমেলো করে দেয়। সেই সৌন্দর্য থাকে হাওরে। আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে…সেই অপার সৌন্দর্যের সামনে নিজেদের সমর্পণের জন্য টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়া। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৮৮তে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়া বন্ধুদের ১১ থেকে ১৩ইজুলাইয়ের এই ভ্রমণে পাওয়া গেল হাওর-পাহাড়-নদী এক সাথে দেখার এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা।

যাত্রা
হাওর এক্সপ্রেসে ১১ই জুলাই রাতে ঢাকা থেকে রওনা। ১১টা ২০ এর ট্রেন ১টা ২০-এর ছাড়লো। স্টেশনে এই বিরক্তিকর দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টাও খুব ভালো কাটলো। পুরোনো বন্ধুরা মিলে দারুণ একটা বেড়ানোর উত্তেজনা। ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ যাওয়ার পথে ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে উঠল ময়মনসিংহ শহর এবং আশপাশ থেকে আসা বন্ধুরা। তখন ভোর। জংশন স্টেশনে ইঞ্জিন ঘোরানোর কারণে অনেকক্ষণ ট্রেন থেমেছিল। এর মাঝে স্টেশনে কিছু নাস্তাও করা হলো।

বিজ্ঞাপন

ট্রেন মোহনগঞ্জ স্টেশনে থামলো। আমরা নেমে অটো রিকশায় মোহনগঞ্জ জেলার সীমানা পেরিয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় পৌঁছে গেলাম। সেখানে বন্ধু ফারুকদের বাসায় আমাদের জন্য সকালের খাবার তৈরি করে রেখেছিলেন তার বড় বোন। খিচুরি, হাঁসের ডিম, মুরগির মাংস,মিষ্টি আর চা। এই পর্ব শেষে মাহিন্দ্রতে চেপে মধ্যনগরের দিকে রওনা হলাম। পথে কংশনদ এবং আরো কিছু নদ-নদী পার হলাম সেতুর ওপর দিয়ে। বাংলাদেশের এই নদ-নদী খাল-বিলের সৌন্দর্য আর কোথাও পাওয়া যাবে না। মনে পড়ে নির্মলেন্দু গুণের কবিতা- ‘কংশের সাথে সমুদ্রের বেশ মিল আছে’।

মধ্যনগর পৌঁছে যাই। পৌঁছুনোর আগে পথের দু’পাশে ডুবে যাওয়া হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি চোখ টেনে নেয়। ডুবে যাওয়া রাস্তা পার হই। মধ্যনগর ঘাঠ থেকে ট্রলারে উঠি। টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে মূল যাত্রা শুরু হয়। ট্রলারটি সুন্দর। সুবিধাজনকও। ছাদে, ডেকে দাঁড়িয়ে, বসে চারদিক দেখা যায়। ভেতরে বিছানায় শুয়ে-বসেও যাওয়া যায়।

আমাদের ১৯ জনের দলের গন্তব্য টেকের মাঠ। টাঙ্গুয়ার হাওর পেরিয়ে আমরা যাবো। পথে টগার হাওর, কানা মিয়া, বাইন চাপড়া। শনির হাওর পার হই। শনির হাওরে শুকনো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ধান হয়। বলা হয়, সারা দেশের মানুষের আড়াই দিনের ভাতের জোগান দিতে পারে এই বিল। এখন এখানে ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর পানি। হাওর এলাকায় এখানকার গভীরতাই সব চেয়ে বেশি। হাওরে গড়ে পানির গভীরতা থাকে ১০ থেকে ১৫ ফুট। ট্রলার চলতে থাকে। আমরা দু’ চোখ ভরে চারপাশ দেখতে থাকি।

এখানে ১শ’২০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ পাওয়া যায়। এজন্য সরকার টাঙ্গুয়ার হাওরকে মিঠাপানির মাছের অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে।

এখানে আলম ডুয়ার নামে একটি জায়গা আছে। আলম ডুয়ারকে চিতল মাছের অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসেও ৩০-৪০ ফুট গভীর পানি থাকে। হিজল এবং করচ গাছ এখানে বেশি দেখা যায়।

মেঘালয়ের পাহাড়ের নীলচে রেখা দেখা যায়। ভারতের মেঘালয়ের দীর্ঘ পাহাড়ের সারি আমাদের সীমান্তে। এটি বাংলাদেশের শেরপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং সুনামগঞ্জ এলাকায় দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। শেরপুর, ময়মনসিংহ অংশ গারো পাহাড়, সিলেট অংশ জয়ন্তিয়া পাহাড় এবং সুনামগঞ্জের অংশটি খাসি পাহাড় নামে পরিচিত। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে অথৈ হাওর। সেই পানির যে কত রূপ! কোথাও সবুজ, কোথাও কালো, কোথাও ছাই, কোথাও ধুসর রঙ। একটার পর একটা রং দেখতে পাওয়া যায়। সব পানি একাকার হয়ে গেলেও এখানে তো বিভিন্ন বিল, নদী, হাওরের পানির স্রোতে যাচ্ছে। রঙগুলো সেজন্যই আলাদা আলাদা।

আমরা পানকৌড়ি দেখি। ‘চুপ চুপ দেয় ডুব, দেয় পানকৌড়ি’। জলাবন দেখি হিজল গাছ, করচ গাছ। বৃষ্টি নামে। বৃষ্টিতে বসে থাকি। রোদ ওঠে। চারদিক চিক চিক করে। জল ঝিলমিল করে।এমনই অকূল, অপার চারপাশ দেখতে দেখতে আমরা এক সময় টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছে যাই।

টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়াচ টাওয়ার
ওয়াচ টাওয়ারে আগে থেকেই কিছু ট্রলার ভিড়ে ছিল। আমরাও ভিড়ে যাই। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে বিস্তীর্ণ হাওর দেখি। ওয়াচ টাওয়ার-ঘেঁষা জলাবন দেখি। হিজল-করচ গাছের বন। টাওয়ার ঘিরে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে শিশু মাঝিরা। তাদের নৌকায় পর্যটকরা ঘুরে বেড়ান। শিশুরা তাদের গল্প শোনায়। গলা ছেড়ে গান শোনায়। পর্যটকরা তাদের খুশি মতো টাকা-পয়সা দেন। আমরা ২/৩ জনের ছোটছোট দলে কয়েকটি নৌকায় উঠে যাই। নৌকায় করে জলাবনের ভেতর ঢুকে যাই। গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা সবুজ গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়ানোর কী যে আনন্দ! আর সে সে কী সৌন্দর্য! নৌকায় ঘোরা শেষ করে ওয়াচ টাওয়ারের গোঁড়ায় নেমে সাঁতার কাটি। শরীর-মন ঝরঝরে হয়ে যায়!

তারপর আবার ট্রলারে চেপে তাহিরপুরের টেকেরঘাটের দিকে রওনা হই। কিছু দূর যাওয়ার পর মেঘালয়ের পাহাড়গুলো অনেক কাছে চলে আসে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মেঘ উড়তে থাকে। এখন পাহাড়ের রংয়ের কত যে শেড দেখা যাচ্ছে! সামনে পেছনে ঢেউয়ের মতো সেইসব রংয়ের খেলা। গাঢ় সবুজ, হালকা সবুজ, নীলচে, ছাই রং। আর মাঝে মাঝে সাদা সাদা তুলোর মতো, ছাই-রঙা ধোঁয়ার মতো মেঘের খেলা।

টেকের ঘাট
আমরা টেকের ঘাটে পৌঁছে যাই। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার উত্তরে শ্রীপুর ইউনিয়নে এই টেকের ঘাট। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে গেছে। সহযাত্রী বন্ধু রায়হানের ঘনিষ্ঠ একজন খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। তার পাঠানো স্পিড বোট আর নৌকায় আমরা সেখানে চলে যাই।

লম্বা একটি ঘরের বারান্দায় সাজানো টেবিলে খাবারের আয়োজন। টেবিলে মাছ-মাংস, ভাত, ডাল, সালাদ আর সামনে কয়লার স্তূপের ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। পাহাড়ের উপর একটি ভবন। স্থানীয়রা বললেন, ওটা হাসপাতাল। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের এ অংশ দিয়ে ওপার থেকে কয়লার ট্রাক আসে। এপার থেকেও মালামাল আনা নেয়া করা হয়। কিন্তু মানুষ যাতায়াতের কোনো ইমিগ্রেশন পয়েন্ট নেই। সে জন্য কাছাকাছির মধ্যে সিলেটের তামাবিল পয়েন্ট ব্যবহার করা হয়।

খাওয়া শেষ করে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার নৌকা ও স্পিড বোটে টেকের ঘাট রওনা হই। ঝুপ করে বৃষ্টি নামে তখন। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমরা ট্রলারে ফিরি।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভ, চুনাপাথর খনি প্রকল্প ও নীলাদ্রি লেক
বিকেলে ট্রলার থেকে নেমে আশপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখা। প্রথমেই টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ। মুক্তিযুদ্ধে শহিদ সিরাজুল ইসলাম বীর বিক্রমের নাম এখানে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভে আমরা মহান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। স্মৃতিস্তম্ভের স্থাপত্যশৈলীও দৃষ্টি নন্দন।

স্মৃতিস্তম্ভ থেকে কিছু দূর এগোলে বাঁ দিকে টেকের ঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প। এটি এক সময় দেশে চুনাপাথর সংগ্রহের বড় ক্ষেত্র ছিল। ১৯৯৬ সাল থেকে এখানে চুনাপাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এখন প্রকল্পের সাইনবোর্ড আর ঘিরে রাখা এলাকা দেখা যায়। চুনাপাথরের প্রাকৃতিক এই ভার থেকে সিমেন্ট শিল্পের জন্য চুনাপাথর সংগ্রহ করা হতো। এর একদিকে সুউচ্চ পাহাড়। অন্যদিকে বিশাল হাওর।

চুনাপাথর খনি ঘেঁষেই নীলাদ্রি লেক। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বীর বিক্রমের নামে নামে এই লেককে শহীদ সিরাজ লেক বলা হয়। এটি সময় টেকেরঘাট চুনাপাথর খনির পাথর কোয়ারি ছিল। খনি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর সেখানে লেকটি সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গভীর লেকের গাঢ় নীল জল যে কাউকে মুগ্ধ করবে। এই এলাকাকে বাংলাদেশের কাশ্মীর বলেন পর্যটকরা।

লেকের গভীরতা ৩শ’৬০ ফুট। এর ওপর সবুজ টিলা আছে। নীলাদ্রি লেকে নৌকা নিয়ে বেড়ানো যায়। লেকের এক পাড়ে মেঘালয়ের পাহার। অন্য পাড়ে গাঢ় সবুজ টিলা আর হাওর।

বিজ্ঞাপন

রারিকের টিলা ও জাদুকাটা নদী
নীলাদ্রি লেক থেকে আমরা ভাড়া করা মোটর বাইকে করে বারিকের টিলায় রওনা হই। বড়ছড়া পাড়া এলাকা, ভাঙাচোড়া পথ, পাহাড়ি ছড়া, একদম খাড়া, আবার ঢালু-এমন পাহাড়ি পথ পাড়ি দেই। মাঝে কয়েকবার নামতেও হয়। নামার সময়গুলোতে দু’চোখ ভরে চারপাশের পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখে নেই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এমন মোটর বাইক ভ্রমণ শেষে আমরা বারিকের টিলায় পৌঁছে যাই।

স্থানীয়রা বলেন, বারিক নামে একজনকে এই টিলায় থাকতে দিয়েছিল সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তার নামে এই টিলার এমন নাম। নামে টিলা হলেও এটি অনেক উঁচু। বারিকের টিলায় উঠে মোটর বাইক থেকে নামার পর সৌন্দর্যের সামনে থমকে যেতে হয়। টিলার ওপর বৃষ্টি ভেজা গাঢ় সবুজ গাছ। ওপারে মেঘালয়ের পাহারের ভাঁজে ভাঁজে মেঘের ভেসে চলা। এমন সুন্দরের মাঝে দাঁড়ালে একদম চুপ হয়ে যেতে হয়।

পাহার আর বারিকের টিলার মাঝ দিয়ে জাদুকাটা নদী বয়ে গেছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এই নদীর বাঁক নেয়ার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। জাদুকাটা নদী বর্ষার এমন মৌসুমে জলে ভরে গেছে। এর এক রকম সৌন্দর্য। শুকনো মৌসুমে এই নদী বালুর সমুদ্র হয়ে ওঠে। বলা হয়, এখান থেকে দেশের সবচেয়ে বেশি বালু সংগ্রহ করা হয়। শুকনো মৌসুমে জাদুকাটা নদী নদী দেখতে মরুভূমির মতো হয়ে যায়।

বর্ষায় এই জাদুকাটা নদী দিয়ে নৌকাতেও বারিকের টিলায় আসা যায়। টিলার ঢালে নেমে হেঁটে উঠতে হয়। আমরা যেমন মোটর বাইকে গেছি। অনেক পর্যটক তেমনি নৌকায় করে গেছেন। আবার বারিকের টিলা থেকে নেমেও নৌকায় জাদুকাটা নদীতে বেড়ানো যায়। মেঘালয়ের অনেক কাছ থেকে ঘুরে আসা যায়। বারিকের টিলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমানা পিলার রয়েছে। এটি একটি জিরো পয়েন্ট।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আমরা বারিকের টিলা আর জাদুকাটা নদীর অপার্থিব সৌন্দর্য পেছনে ফেলে আবার পাহাড়ি পথ বেয়ে, ছড়াপারহয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পাহাড় আর পাহাড়ের কোলে মেঘের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে ট্রলারে ফিরে আসি। ততক্ষণে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত।

হাওরের রাত
ট্রলারের মাঝিদের বাজার করে দেয়া হয়েছিল। রাতেরখাবার রান্না সেখানেই হয়েছে। বেড়ানো শেষে ফিরে ট্রলারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। তারপর আশপাশে একটু হাঁটাহাঁটি। ট্রলারের ছাদে উঠে অন্ধকার হাওরের দিকে তাকিয়ে থাকা।

রাতের খাওয়ার আয়োজন হয়ে গেছে। খাবারের মেনু দেশি মুরগির ঝোল, আলুভর্তা আর ডাল। স্বাদের কথা বলে বোঝানো যাবে না। এরপর আবার ট্রলারের ছাদে উঠে আড্ডা। গান। আশপাশের ট্রলারগুলোতেও তখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেড়াতে আসা মানুষের গলা ছেড়ে গান, আড্ডা। তাদের বেশিরভাগই তরুণ।

এক সময় মাঝিরা ট্রলারগুলোকে হাওরের মাঝখানে নিয়ে যান। নিরাপত্তার জন্য এই ব্যবস্থা। রাতটা সেখানেই কাটানো। অথৈ জলাশয়ের বুকে এক রাত। আমাদের দলের কেউ কেউ অবশ্য অন্যদের থাকার সুবিধার জন্য বড়ছড়া বাজারে গেস্টহাউজে চলে গিয়েছিল। আগে থেকেই সেই ব্যবস্থা করা ছিল।

লাকমা ছড়া
ভোর থেকে ঝুম বৃষ্টি। পরিকল্পনা ছিল দর্শনীয় জায়গা লাকমা ছড়ায় যাওয়ার। বৃষ্টিতে বের হওয়ার উপায় নেই। মন খারাপ হয়ে গেলো। এর মধ্যে বৃষ্টি কিছুটা কমে আসে। সামনে কয়েকটি মোটর বাইকও দেখা যায়। এতো দূর এসে লাকমা ছড়া না দেখে ফিরে যাবো? বৃষ্টির মধ্যে মোটরবাইক ভাড়া করে রওনা হয়ে যাই। বেশিক্ষণ লাগে না। এই জায়গাটা আমাদের ট্রলার ঘাট থেকে কাছে। বাইকে ১৫/২০ মিনিটের দূরত্ব।

লাকমা ছড়া। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর আমরা ১২ জন বন্ধু সিলেট, ছাতক, ভোলাগঞ্জ এসব জায়গায় গিয়েছিলাম। তখনও এমন বৃষ্টি ছিল। কিন্তু বৃষ্টি আমাদের সব কিছু দেখার আনন্দ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। তখন যে উত্তেজনা নিয়ে ছুটে বেরিয়েছি, লাকমা ছড়ায় যেন সেই বয়স ফিরে এলো। হাতে সময় খুব বেশি নেই। বৃষ্টি। তার মধ্যে গোগ্রাসে সব দেখার চেষ্টা। ছুটে ছুটে দেখা। সিলেটের জাফলংয়ে সীমান্তের ওপারে ভারতের ডাউকিতে দু’টো পাহাড়ের মাঝে যেমন ঝুলন্ত সেতু আছে, এখানেও তেমন আছে। আছে ঢলের পানিতে উপচে পড়া পাহাড়ি ছড়া। তাতে ছোটো-বড় পাথর। আর কয়লা সংগ্রহ করা মানুষেরা।

লাকমা ছাড়ায় পাহাড়ের গায়ে কয়েকটি ঝরনা দেখা যায়। ওগুলোর বেশ কাছেও যাওয়া যায়। এরপর লাকমা ছড়া থেকে আবার মোটর বাইকে করেই ট্রলারে ফিরে আসা।

শিমুল বাগান
যাদুকাটা নদীর পাশে মানিগাঁও গ্রামেরলাউয়ের গড়ে ১শ’ বিঘার বেশি জায়গাজুড়ে আছে শিমুল গাছের বাগান। ফাল্গুন মাসে টকটকে লাল শিমুল ফুলে পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। তখন নানা রকম পাখিও দেখা যায় এখানে। অন্য মাসগুলোতে সারি সারি গাছ আর সবুজ ঘাস চোখ জুড়িয়ে দেয়।

বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন ২০০২ সালে নিজের প্রায় ২ হাজার ৪শ’ শতক জমিতে সৌখিনভাবে এই শিমুল বাগান গড়ে তোলেন। এখানে তিন হাজারের মতো শিমুল গাছ রয়েছে। এর সাথে লেবুর বাগানও গড়ে উঠেছে।

যদি শুকনো মৌসুমে…
হেমন্ত থেকে গ্রীস্ম পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যরকম সৌন্দর্য। তখন এখানকার বিলগুলোতে মাছ ধরার ধুম চলে। দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সবুজ ধান ক্ষেত মানুষকে মুগ্ধ করে। দেশের বোরো ফসলের বড় ক্ষেত্র টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকা। শুকনো মৌসুমে অতিথি পাখির কলকাকলিতেও মুখর থাকে টাঙ্গুয়ার হাওর। অতিথি পাখি, ফসলের মাঠ আর মাছের টানে তখনও এখানে অনেক পর্যটক আসেন।

ঢাকার পথে
ট্রলার ছাড়লো। টেকের ঘাটে বাকলাই নদীর ঘাট থেকে ট্রলার এগিয়ে চললো মধ্যনগরের দিকে। পেছনে সরে যাচ্ছে মেঘালয়ের পাহাড়। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জমাট মেঘ। সবাই অপলক তাকিয়ে থাকি। পথে মাটিয়ানা হাওরের বাঁকে বন্ধু ফারুকের ফুপুর বাড়িতে নাস্তার আয়োজন।

ট্রলার থামে। হাওরের বুকে ভেসে থাকা অপূর্ব এক বাড়ি। সেখান থেকেও অথৈ হাওরের ওপারে নীলচে পাহাড় দেখা যায়। নাস্তার মেন্যু খিচুরি, মুরগি ভুনা, হাঁসের ডিম, কলা আম আর চা। যথারীতি হাওর এলাকার অন্যসব বেলার খাবারের মতোইসাধারণ কিন্তু অসাধারণ এক স্বাদ।

আবার ট্রলার ছাড়ে। আমরা আগের পথে মধ্য নগর ফিরে আসি। সেখান থেকে মাহিন্দ্রতে ধর্মপাশা। ধর্মপাশা থেকে অটোতে মোহনগঞ্জ শহরে। এখানে বন্ধু নিহারের ঘনিষ্ঠ একজনের বাসায় দুপুরের খাবার। মাছ, মুরগি, সবজি, ডাল, মিষ্টি।

সেখান থেকে মোহনগঞ্জ স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। কমিউটার ট্রেন। বিকেল সাড়ে চারটায় ট্রেন ছাড়লো। আমরা রাত ১০টায় ঢাকায়। সবাই বলল, জীবনের একটি সেরা ভ্রমণ। এতো সুন্দর আমাদের দেশ!

Bellow Post-Green View