চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগানের বিপক্ষে কারা?

‘জয় বাংলা’ কেন জাতীয় স্লোগান ও মূলমন্ত্র নয়- এমনটা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত সোমবার হাইকোর্ট এ রুল দেন। হাইকোর্টের এ রুলের পর নানা মহলে ‘জয় বাংলা’ নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে, এবং স্বভাবত এ নিয়ে দুই পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এই দ্বিধাবিভক্তি আমাদের জন্যে নতুন কিছু নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়েও দুই পক্ষ ছিল; স্বাধীনতাপক্ষ আর স্বাধীনতাবিরোধী পক্ষ। আর মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিনিধিত্বকারী এ স্লোগান নিয়ে বিভক্তিটা স্বাভাবিকই; সুতরাং এনিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই।

হাইকোর্ট একজন আইনজীবীর জনস্বার্থে রিটের প্রেক্ষিতে এমন রুল দিয়েছেন। মনে হচ্ছে এ ধরনের রিট হাইকোর্টে উপস্থাপন না হলে এনিয়ে আলোচনা হতো না। অথচ এই স্লোগান ছিল মুক্তিকামী বাঙালির স্লোগান, একাত্তরকে উপজীব্য করে উদ্ধুব্ধ হওয়ার স্লোগান; সর্বোপরি স্বাধীনতা স্লোগান। বাংলাদেশ জন্মের বিভিন্ন দলিলপত্র ঘাঁটলেও এর সত্যতা মেলে।

বিজ্ঞাপন

হাইকোর্ট বিষয়টি উপস্থাপনের কারণে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ড. বশির আহমেদকে ধন্যবাদ। আমাদের জাতীয় প্রেরণার অনন্য প্রতীক হিসেবে তিনি আরজি জানিয়েছেন আগামি ১৬ ডিসেম্বর জয় বাংলা স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে বিজয় দিবস যেন আমরা পালন করতে পারি।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বিজয়ের ৪৬ বছরেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের জাতীয় স্বীকৃতি নথিবদ্ধ হয়নি। আর এতদিন পর আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্যে আমাদেরকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। আদালত  দিচ্ছেন আমাদের ইতিহাসের স্বীকৃত বিষয়ের স্বীকৃতি। অথচ তা করা উচিত ছিল রাষ্ট্রের-সরকারের।

 

এ প্রসঙ্গে দায়িত্বশীলরা অজুহাত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন যে, বাংলাদেশ-জন্মের পরের অধিকাংশ সময়েই বাংলাদেশ শাসন করেছে পাকিস্তানের প্রতি অনুভূতিশীল সরকারগুলো। ওই সরকারগুলোর আমলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ছিল অনেকটা অপরাধতূল্য। এঅজুহাতকে আংশিক মেনে নেওয়া সম্ভব হলেও পুরোপুরি নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে চার দশকের মধ্যে দুই দশকের কাছাকাছি সময় দেশ শাসন করছে। সেক্ষেত্রে এর দায় তারাও অস্বীকার করতে পারে না। তবে এতকিছুর পর মন্দের ভালো যে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি সামনে আসছে, এবং সেটা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর্যায়েই চলে আসছে বলে ধারণা।

‘জয় বাংলা’ স্লোগান একাত্তরে ছিল জাতীয় স্লোগান। এরপর সেটা ক্রমে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগানে রূপ লাভ করেছিল। এখানে আওয়ামী লীগের দায় আছে কিছুটা, আর সবচেয়ে বেশি দায় ছিল পাকিস্তান দরদি মানসিকতার সরকারগুলোর, যারা একটা সময়ে মুক্তিযুদ্ধ আর ‘জয় বাংলা’ দেশে প্রায় নিষিদ্ধ করার অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের ওই স্লোগান দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সে সময় থেকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ওই স্লোগানকে লালন করেছে, আর লালনের ধারাবাহিকতায় একটা সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনীন স্লোগান দলীয় স্লোগানে রূপান্তর ঘটেছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় দখল থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ফের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মানুষের কাছে পাঠানোর বড় এক বার্তা পাওয়া যায় ২০১৩ সালের গণজাগরণ আন্দোলন সময়ে। যুদ্ধাপরাধী আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ের পরিবর্তে ফাঁসির দাবিকে কেন্দ্র করে তারুণ্যের স্ফুলিঙ্গ এই আন্দোলনের সময়ে ‘জয় বাংলা’ মানুষের কাছে পৌঁছায়। তখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আওয়ামী লীগের দখলমুক্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল। দাবি ওঠেছিল স্বীকৃতির, বিভিন্ন মাধ্যমে লেখালেখিও হয়েছিল; কিন্তু এরপর এনিয়ে আর কথা হয়নি। গণজাগরণ আন্দোলনের শেষ এবং স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর গণমানুষের স্লোগান ফের হাতছাড়া হয় মানুষের, ফিরে যায় আওয়ামী লীগের দখলে।

এই দখলি স্বত্বে ফিরে যাওয়া ছিল আদতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা, এমনটাই হয়েছে দুঃখজনকভাবে। তবে আশার কথা এটা সর্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করতে যাচ্ছে, আদালত কর্তৃক স্বীকৃতির মাধ্যমে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি রাষ্ট্র ও সরকারের দায় ছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর এই ব্যর্থতাকে অন্তত ঢাকতে যাচ্ছে আদালত!

 

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের নাম, জাতীয় সংগীত, পতাকা, স্বাধীনতার ঘোষণাসহ অনেক কিছু বিজয়ের আগে থেকে নির্ধারিত হলেও এই দেশের জাতীয় স্লোগান আগে থেকেই স্বীকৃত হয় নি। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার প্রথম দশ লাইন আমাদের জাতীয় সংগীত, লাল-সবুজের পতাকা এবং সাত মার্চের উত্তাল জনসমুদ্রে স্বাধীনতা ঘোষণার নির্দেশনা থেকে শুরু করে গ্রেপ্তারের পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সবকিছু নির্ধারিত হলেও দেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয় নি। তবে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ে এই স্লোগান ধরে এগিয়ে গিয়েছিল মুক্তিকামী জনতা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চেতনা উদ্দীপক ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি দেশের মুক্তিপ্রত্যাশী যোদ্ধা ও মুক্তিপ্রত্যাশী মানুষদের উদ্ধুব্ধ ও আশাবাদী করেছিল।

এখানে উল্লেখের প্রয়োজন, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান হঠাৎ করে আসে নি। কেবল একাত্তরেই এই স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে এমন না। উইকিপিডিয়ার একটা সূত্র বলছে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রথম উচ্চারণ হয় ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে। ওই সূত্রমতে, ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আফতাব আহমেদ ও চিশতী হেলালুর রহমান ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করেন। কোন জনসভায় উচ্চারণ করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, পল্টনের জনসভায় ১৯ জানুয়ারি ১৯৭০। সত্তরের নির্বাচনেও ছিল ‘জয় বাংলা’; আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে তিনি তাঁর বক্তব্যের শেষটা করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণে।

৭ মার্চের ভাষণের ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ আদতে এই স্লোগানকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হান্নান ও মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের পর তারা সকলেই ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেছিলেন।

১৯৭০ এর নির্বাচনের সময়েও ‘জয় বাংলা’ ছিল। আওয়ামী লীগ এই স্লোগানই ব্যবহার করত। মওলানা ভাসানী ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ না করলেও ‘স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ’, ‘আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ’ প্রভৃতি স্লোগান ব্যবহার করতেন। ১১ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের প্রথম বেতার ভাষণটি শেষ হয়েছিল‍ ‘জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে। ফলে এই স্লোগানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে- এটা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

জাতীয় স্লোগান ধারণাটি নজিরবিহীন নয়। পৃথিবীর কয়েকটি দেশে জাতীয় স্লোগান রয়েছে। যে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সেই পাকিস্তানেরও জাতীয় স্লোগান রয়েছে; এবং সেটা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান মিত্র দেশ ভারতেরও জাতীয় স্লোগান রয়েছে; এবং সেটা ‘জয় হিন্দ’। এমন অনেক দেশেরই স্লোগান রয়েছে। সেক্ষেত্রে জাতীয় স্লোগানের বিষয়টি প্রতিষ্ঠা স্থূল চিন্তা নয়। জাতীয় স্লোগানের বিষয়ে হাই কোর্টে রিটকারী আইনজীবী বশির আহমেদ জানিয়েছেন, পৃথিবীর অন্তত ৭টি দেশে এমন জাতীয় স্লোগান রয়েছে।

দীর্ঘ স্বাধীনতার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। এটাকে আওয়ামী লীগের একার সম্পত্তি হিসেবে আখ্যা দিলে কিংবা ভাবতে গেলে মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে ভাবা হবে। নেতা হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু ওই যুদ্ধটা ছিল গণযুদ্ধ। এই গণযুদ্ধে সকলের অবদান রয়েছে। গণযুদ্ধের গণ-স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’।

‘জয় বাংলা’ আর ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ এদুই স্লোগানের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণে যেতে আমি রাজি নই। মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিনিধিত্বকারী স্লোগান ‘জয় বাংলা’র সঙ্গে অন্য কোন বিশেষ করে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ অনুরূপ ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানের তুলনা হয় না। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটা একাত্তরকে প্রতিনিধিত্ব করে, আর একাত্তরের কারণে এই দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও নেতারা রাজনীতি করতে পারছেন বলে অন্তত এই স্লোগান গ্রহণ করা উচিত।

নিকট অতীতে কিছু  নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটনে দুর্বৃত্তরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর। নাশকতার কূটকৌশলের অংশ হিসেবে এ স্লোগানের ব্যবহারের কারণে ওরা প্রাথমিকভাবে লাভবান হয়েছে, এবং এই স্লোগানকে অপমানও করেছে। জাতীয় স্লোগান হিসেবে ‘জয় বাংলা’ প্রতিষ্ঠা পেলে এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ তা গ্রহণ করলে, সে পথও ক্রমে সংকীর্ণ হয়ে আসবে। এতে লাভবান হবে দেশ, নিশ্চিতভাবেই।

‘জয় বাংলা’ ছিল মুক্তির মূলমন্ত্র; ‘জয় বাংলা’ হোক জাতীয় স্লোগান!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View