চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জঙ্গি হামলার মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি

জাফর ইকবাল স্যারের উপর হামলার পর অনলাইন কিংবা অফলাইনে একটা অংশকে বেশ উল্লসিত দেখা গেলো। কেউ কেউ উনার মৃত্যু কামনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্যও করেছেন! আবার অজস্র মানুষ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। উদ্বেগ জানিয়ে তারা বলছেন, এই হামলা মূলত প্রগতিশীল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীলদের চলমান নাশকতার অংশ।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, কারো কারো কাছে কৈশোরের নায়ক, একজন শুদ্ধ মানুষের প্রতিচ্ছবি, একজন স্বপ্নবাজ আশাবাদী মানুষ। যিনি প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, বিজ্ঞানের কথা বলেন, প্রগতিশীলতার কথা বলেন একই সাথে প্রাসঙ্গিকভাবেই বিরুদ্ধাচরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির, কুসংস্কার আর ধর্মান্ধতার। ফলে জাফর ইকবাল ব্যক্তিজীবনে তার নিজস্ব অবস্থানকে, নিজের বিশ্বাস কিংবা স্বপ্নকে স্পষ্ট করতে পেরেছিলেন। সুতরাং তাকে নিয়ে এই যে বিভক্তি এটাকে অনেকেই দুঃখজনক বললেও আমি এর মধ্যে দেখছি বরং তার সফলতা। দীর্ঘদিন তিনি যে সংগ্রাম করছেন, তিনি যে প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রগতির স্বপ্ন দেখেন তারই জয় হয়েছে বলা যায়।

আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখ যে, স্বাধীনতা বিরোধীরা এই দেশটা শাসন করেছে। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন স্লো পয়জনের মতো এই গোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। পঁচাত্তরের পর এদেশে গোলাম আযমরা তাদের আসন পোক্ত করেছে, মন্ত্রী হয়েছে, বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। সেইসব প্রতিষ্ঠানে এদেশের মেধাবী ও উচ্চবিলাসীদের সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ছোট ছোট ছাড় দিয়েছে, ছাত্রশিবির তার কাজটি সফলভাবে করেছে। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রটিকে নানানভাবে প্রমোট করে নিজেদের করে নিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক সহ তাদের অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চাকরি দিয়েছে, আর বানানো হয়েছে কিলার উইং। কিলিং মিশনে কাজ করতে দেশের দুর্গম অঞ্চলে ট্রেনিং দেয়া হয়েছে এইসব কেনা দাসদের, পার্থিব-অপার্থিব নানান সুবিধার বেড়াজালে আবদ্ধ করে বানিয়েছে জঙ্গি প্রজন্ম।

বিজ্ঞাপন

ফলে দারিদ্র্য আর শিক্ষাহীন বাংলাদেশে ধর্মান্ধরা ঠাই না পেলেও, সময়ের পরিক্রমায় আজকের এই অধিক শিক্ষত আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার দিকে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে বানের জলের মতো বাড়ছে ছুরি আর চাপাতিওয়ালা প্রজন্ম। যারা বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে এদেশের সকল সূর্য সন্তানদের সমানভাবে গালি দেয়, ফলে জাফর ইকবাল স্যার তাদের হাত থেকে নিস্তার পাবেন সেটা ভাবা অমূলকই বটে।

জাফর ইকবাল স্যার অবশ্য সবাইকে ভালোবাসেন সমানভাবে। ভালোবাসেন বলেই যেমন একজন বাবা তার বখে যাওয়া সন্তানকে শাসন করেন, মারধরও করেন অনেক ক্ষেত্রে, সঠিক পথে আসার উপদেশ দেন; তেমনি জাফর ইকবাল স্যারও কুসংস্কার, ধর্মান্ধতার পথ পরিহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখান প্রজন্মকে। এর মানে এই না যে, তিনি বখে যাওয়াকে বাতিল করে দিয়েছেন বরং তিনি আমাদের পথের দিশারী। একজন জাফর ইকবাল, আলো হাতে একজন স্বপ্নবাজ শুদ্ধ মানুষ, যিনি নিজের জীবনের সকল ভোগবিলাস ত্যাগ করে এদেশকে ভালোবেসে, এদেশের মানুষকে ভালোবেসে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।

এই সময়টায় তাই আমাদেরকে সম্মিলতভাবে একটা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, গড়ে ওঠা এই বিভক্তিকে আমরা কিভাবে জয় করবো, আমরা কিভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে শিখবো, পথ ও মতের প্রার্থকের কারণে আমরা যে নিমিষেই ছুরি চাপাতি হাতে তুলে নিচ্ছি কিংবা সেই আঘাতকে জায়েজ করতে নানাবিধ ট্যাগ লাগিয়ে ব্যক্তিকে অসহায় করে তুলছি তার সমাধানের জন্য আমাদের কর্মপরিকল্পনাগুলোকে স্পষ্ট করতে হবে।

হুমায়ুন আজাদ স্যারসহ বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাশীলদের উপর আক্রমণকারীদের যদি সঠিক আইনের আওতায় না আনা যায়, তবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিমুক্ত যে সমাজ গড়ার কথা আমরা বলি, আমরা যে উন্নত প্রগতিশীল সমাজ গড়ার কথা বলি তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। বস্তুগত উন্নতির পাশাপাশি এইসব মননশীল উন্নয়ন করা না গেলে বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে যে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে সেই স্বাধীনতা বুমেরাং হয়ে থাকবে, নষ্টদের কাছে বন্দী হয়ে যাওয়া দেশ ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবী।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন