নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর খসড়া প্রস্তাবনা। সোমবার দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ১৯৮৩ সালের অর্ডিন্যান্স থেকে নতুন খসড়ায় অনেক পরিবর্তন বা উন্নয়ন রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, অনুমোদিত নতুন খসড়া আইনের ধারা ৬-এ বলা হয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য ন্যূনতম বয়স ধরা হয়েছে ১৮ বছর। পেশাদার হলে বয়স হতে হবে ২১ বছর। অন্যদিকে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এটি আগের আইনে ছিল না।
১১ ধারায় চালককে পয়েন্ট বরাদ্দ বা কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে। চালকের ভুলের কারণে পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থা রেখে অনুমোদিত হয়েছে প্রস্তাবনাটি। প্রত্যেক চালকের লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকবে। কোনো চালক অপরাধ করলে তার পয়েন্ট কাটা যাবে।
তিনি বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালের লালবাতি অমান্য করে মোটরযান চালনা করা, পথচারি পারাপারের জন্য নির্দিষ্ট স্থানের কাছে বা ওভারটেকিং নিষিদ্ধ, এমন জায়গায় ওভারটেক করা, এমন বিভিন্ন অপরাধের একেকটির জন্য একটি করে পয়েন্ট কাটা যাবে।
পুরো ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে তিনি আর কোনোদিন ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। এবার নতুন করে এই পদ্ধতি বাংলাদেশের আইনে যুক্ত করা হচ্ছে।
কোন কোন পরিস্থিতিতে ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী ব্যক্তিকে অযোগ্য ঘোষণা বা লাইসেন্স বাতিল, প্রত্যাহার ও স্থগিতকরণ হতে পারে তা নিয়ে ১২ ধারায় উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, লাইসেন্সধারী যদি অসুস্থ, অপ্রকৃতস্থ, শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম, মদ্যপ, অভ্যাসগত অপরাধী বা এ ধরনের অন্য কোনো কারণ দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল, প্রত্যাহার বা স্থগিত করতে পারে।
ধারা ৩০-এ বলা হয়েছে রুট পারমিট থেকে অব্যাহতি পাওয়া যান কোনগুলো। যেসব যানবাহন ভাড়ায় খাটে না, যেমন সরকারি কাজে নিয়োজিত যান, সেগুলোর রুট পারমিট প্রয়োজন নেই। এছাড়া মৃতদেহ বহন ও সৎকারে নিয়োজিত যান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, অ্যাম্বুলেন্স, বিকল মোটরযান টেনে নেয়ার জন্য ব্যবহৃত যান বা রেকার, এ জাতীয় পরিবহনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
৩৩ ধারায় নতুন প্রস্তাবনা যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সরকার বা সরকারের অনুমোদনক্রমে কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে সমগ্র বাংলাদেশ বা যে কোনো এলাকার জন্য যে কোনো ধরনের মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সিঙ্গাপুরের পরিবহন সংখ্যা নির্ধারণ ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন।
৩৬ ধারায় যানবাহনের ইকোনমিক লাইফ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। সরকার বা সরকারের অনুমোদনক্রমে কর্তৃপক্ষ যে কোনো ধরনের মোটরযানের ইকোনমিক লাইফ সরকারি গেজেটের প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারণ করতে পারবে।
ধারা ৩৯-এ বলা হয়েছে, সরকারি গেজেটের প্রজ্ঞাপন দ্বারা বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিবহন যানের চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপার কাম ক্লিনারের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে দেয়া যাবে। এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এই কর্মঘণ্টা বা বিরতিকাল মেনে চলতে বাধ্য থাকবে।
এই কর্মঘণ্টা বা বিরতিকাল সরকার গেজেটের প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্ধারণ করে দেবে। একেক ধরনের বাহনের জন্য একেক ধরনের নিয়ম হবে।
৪৩ ধারায় এক্সেল ওজন ও ওজনসীমা নিয়ন্ত্রণ, ৪৪ ধারায় মোটরযানের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, ৪৫ ধারায় শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে নতুন করে বিস্তারিত বিধান যুক্ত হয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-তে।
৪৭ ধারায় মোটরযানের পার্কিংয়ের স্থান নির্ধারণের কথা বলা আছে। এছাড়া ৪৯ ধারায় ‘মোটরযান চলাচলের সাধারণ নির্দেশাবলী’ নাম দিয়ে প্রথম অংশে ‘ক’ থেকে ‘ঢ’ এবং দ্বিতীয় অংশে ‘ক’ থেকে ‘জ’ পর্যন্ত অনেকগুলো অনুশাসন উল্লেখ করা হয়েছে। এই অনুশাসনগুলো না মানলে কী কী শাস্তির বিধান রয়েছে সেগুলোও এখানে উল্লেখ আছে।
৫২ ধারায় ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ আছে। ৫৩ ধারায় নতুন সংযোজিত হয়েছে ‘আর্থিক সহায়তা তহবিল’ নামে নতুন একটি তহবিল গঠনের বিধান।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর খসড়া প্রস্তাবনা সোমবার সকালে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলা হলে তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। আইনটি সংসদে উত্থাপনের পরে পাস হলে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হবে।








