চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গ্রামে-গঞ্জে স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাত

একটি দেশের সার্বিক স্থিতাবস্থা উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে। সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শহর এবং গ্রাম উভয় দিকে সমানভাবে নজরদারি ও বরাদ্দ প্রদান করা প্রয়োজন। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেগা প্রকল্পগুলোর দিকে অধিক দৃষ্টি প্রদান হেতু ছোট-খাট অনেক জায়গায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। কিন্তু গ্রাম শহর উভয় জায়গায়ই উন্নয়নের জন্য সমান নজরদারি দেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া কিন্তু সামষ্টিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব না। এখনো গ্রামে-গঞ্জে শহরের তুলনায় বেশি মানুষ বসবাস করে, তাই গ্রামের সার্বিক বিষয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও নজরদারি গ্রামীণ সমাজে কাঙ্খিত পরিবর্তন আনয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।

বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজের যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি উপস্থাপন করলে গ্রামীণ সমাজে উন্নয়নের ছোঁয়া পরিলক্ষিত হতো। এ কথা অস্বীকার করার অবকাশ থাকে না যে, কিছু কিছু জায়গায় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো উন্নয়নের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এমনো দেখা গেছে, একটি মাত্র ব্রীজের কারণে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার এমনো দেখা যায়, দু-তিন কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণের আওতায় নিয়ে আসলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রা বহুলাংশে উন্নত ও আধুনিক হবে। আবার বলা যায়, গ্রাম পর্যায়ে সরকারের বরাদ্দের বিষয়ে নজরদারি ও জবাবদিহীতার সমন্বয়ে কাজ করে যেতে পারলে পরিস্থিতি আরো উন্নত ও আধুনিক হবে। কাজেই আলোচিত সব বিষয়ের উপর আলোকপাত করা অত্যন্ত জীবনমুখী ও সমাজের কাঙ্খিত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্য অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত।  রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র কোনভাবেই এ সংক্রান্তে দায় এড়াতে পারে না। নাগরিকের স্বাস্থ্য সেবা সংক্রান্ত সচেতনতা সৃষ্টিতেও উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। আবার কোন কোন জায়গায় দেখা যায়, অসচেতনতা; স্বাস্থ্য পরিসেবা থেকে দূরত্ব, যথাযথ সেবা না পাওয়া, সেবার অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ হতে সেবা গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক থাকে। আবার এমনো দেখা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংষ্কারের অভাবে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কাজেই এমনো বলা যায়, উপযুক্ত পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারদের অপ্রতুলতার অভাবে গ্রামে গঞ্জে স্বাস্থ্য খাতের পরিবেশ প্রতিনিয়ত প্রতিকূলে চলে যাচ্ছে। এহেন অবস্থার পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজন। করোনা বাংলাদেশে আঘাত হানার ফলে স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর চিত্র এবং দুর্নীতির ব্যাপকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ হয়েছে বিশদভাবে। আলোচিত নিবন্ধে আমি একটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করবো, যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ইউনিয়নগুলোর স্বাস্থ্য খাত সম্বন্ধে মোটামুটি একটি ধারণা পাওয়া সহজতর হবে।

চিত্র: কমপ্লেক্সে জরুরী সরঞ্জামাদি রাখার রুমের সচিত্র

ময়মনসিংহ জেলাধীন ত্রিশাল উপজেলার মোক্ষপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কমপ্লেক্সটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্য সেবা সুরক্ষা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার প্রয়াসেই নির্মিত। কিন্তু কালক্রমে উক্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি থেকে জনমানুষের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি একসময় স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে অত্যন্ত স্বতষ্ফূর্ত ছিল। সেবা প্রার্থীদের পদচারণায় জমজমাট ছিল কমপ্লেক্সটি। কেন এমন হচ্ছে? এর উত্তরে দুটি কারণকে দাঁড় করানো যেতে পারে। প্রথমত: কমপ্লেক্সটির অবকাঠামো প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দিনকে দিন নাজুক অবস্থায় পতিত হচ্ছে। খুবই নাজুক যেখানে কর্মরতদের তেমন টয়লেট সুবিধাও নেই, পাশাপাশি যে কক্ষে বসে কর্মরতরা ডিউটি করেন সেখানে বসার তেমন ভাল পরিবেশ নেই বললেই চলে। অথচ এ ভবনটি যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে সংস্কার করলে দীর্ঘদিন ভবনটি থেকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যেতো। যেভাবে পড়ে আছে সেভাবে কিছুদিন চলমান থাকলেও ভবনটি হয়তো সহসাই অকেজো হয়ে পড়বে। কাজেই দায়িত্ব নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ভবনটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কর্মরত স্টাফদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংস্কারের বিষয়ে চিঠি আদান প্রদান হলেও কার্যত কোন কাজই হয়নি। তারা অনতিবিলম্বে ভবনটি সংস্কারের জোর দাবি জানায়।

চিত্র: ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্টাফদের বসার রুমের চিত্র

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় যে কারণটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে সেটি হলো: কর্মরত স্টাফদের ব্যবহার সাধারণ মানুষদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয় এবং স্টাফদের উপস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। যিনি এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তার উনাদেরকে কালে ভদ্রে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা যায় এমন অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কিছু কর্মরত স্টাফ সাধারণ মানুষের সাথে এমন ব্যবহার করে যে, কমপ্লেক্স থেকে প্রদত্ত ওষুধ সরকারি সেবা নয়; এটা তারা নিজেরা মানুষদেরকে দিচ্ছে। এমন রূঢ় আচরণের কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। লোক মুখে শোনা যায়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যারা চাকুরি করেন তাদের আত্নীয় স্বজনদেরও নাকি ওষুধ পত্র কিনতে হয় না। অথচ এই ওষুধগুলো সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের অনুদান। কাজেই বিষয়গুলোকে সুষ্ঠু তদন্তের আওতায় এনে

চিত্র: মোক্ষপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

স্বাস্থ্য সেবা খাতকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরী। এই একটি ইউনিয়নের চিত্রই হয়তো সারা বাংলাদেশের সব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সচিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হবে না। কিন্তু কিয়দংশ হলেও তুলে আনতে সক্ষম হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এই ইউনিয়নের মানুষদের দীর্ঘদিনের দাবি উক্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গর্ভবতী মা বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য দশ শয্যা বিশিষ্ট এ্কটি ইউনিট প্রতিস্থাপন করার। কেননা কমপ্লেক্সটিকে সুসজ্জিত ও সংস্কার করা হলে খুব সহসাই দশ শয্যা বিশিষ্ট ইউনিট প্রতিস্থাপন করা যাবে। এ বিষয়টি সংযোজিত হলে প্রত্যন্ত গ্রামের মহিলা ও শিশুরা এখান থেকে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য সেবা পাবার প্রত্যাশা করতে পারেন। কেননা, অসচেতনতা ও আর্থিক দূরবস্থার কারণে অনেকেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিশেষ করে শহরের কমপ্লেক্সে দালালদের দৌরত্ন্য ও ঘুষ প্রদানের বিষয়টি সম্বন্ধে সকলেই অবগত।

চিত্র: জরাজীর্ণ কমপ্লেক্সের চিত্র
মোক্ষপুর ইউনিয়নের যোগাযোগ খাত নিয়ে যদি আমরা নজর দেই তাহলে দেখা যাবে; এ ইউনিয়নে যোগাযোগের মূল রাস্তাটি হচ্ছে বগারবাজার হতে ফুলবাড়িয়া রোডের রাস্তাটি। প্রায়শই রাস্তাটিতে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে এবং কিছুদিন পূর্বে একজন শ্রমিক দুর্ঘটনায় মারা যায়। রাস্তাটি সংস্কার এবং পুনর্নিমাণের দাবি দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আকিজ সিরামিকস পর্যন্ত রাস্তাটি পুনর্নিমাণ হয়েছে কিন্তু ঐখান থেকে ইউনিয়নের পরের রাস্তাটুকু একদমই নাজেহাল। তাছাড়া সামান্য বৃষ্টি আসলে রাস্তাটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। দেখার যেন কেউ নেই; আকিজ সিরামিকস হয়তোবা নিজেদের অর্থায়নে কিংবা নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তিতে ঐটুকু রাস্তা করিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি জরুরী ভিত্তিতে কার্যকরভাবে রাস্তাটি পুনর্নিমাণ করা। কার্যকরভাবে এ কারণেই বললাম, কিছু দিন পর পর সামান্য সংস্কার হয় কিন্তু সেটি ঠিকাদারদের কাজে আসে, সাধারণ মানুষের উপকারে তেমন আসে না। প্রসঙ্গক্রমে আকিজের কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে, আকিজের হঠকারিতায় প্রায় শত একরের ধান পানির নিচে চলে গেছে মর্মে পত্রিকার পাতায় নিউজও হয়েছে। কাজেই বলা যাচ্ছে, উপযুক্ত নেতৃত্ব ও কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টির অভাবে মোক্ষপুর ইউনিয়নবাসী দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত, বিশেষ করে দেশের অন্যান্য জায়গায় যেভাবে উন্নয়নের কাঙ্খিত প্রত্যাশা পূরণ হতে যাচ্ছে সে তুলনায় মোক্ষপুরের উন্নতির গতি অনেকাংশে ম্রিয়মান।

বিশেষ করে জয়নাতলী থেকে খলাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তাটি এখনো কাঁচা রাস্তা, খানা-খন্দে ভরপুর, সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে উঠে। এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি রাস্তাটি পাকাকরণের, কিন্তু এখনো সেটি আলোর মুখ দেখছে না। এদিকে লালপুর বাসীর ত্রিমোহনী বাজার হতে দরগা বাজার (নতুন বাজার) পর্যন্ত রাস্তাটি একদমই অকোজে। তাছাড়া মাছের ব্যবসায়ীদের খাবার ও মাছ পরিবহনের হেতু কিছুটা ব্যবহার উপযোগী থাকলে সেটি এখন হাঁটার জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত।

চিত্র: নতুন বাজার (দরগা) থেকে আন্তরবাজারের রাস্তার চিত্র ।
নিজবাখাইল হতে পোড়াবাড়ি যাওয়ার রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ভোগাচ্ছে, মাঝখানে নামমাত্র সংস্কার করা হলেও সেটি এখন পূর্বের অবস্থায় ফিরে এসেছে। বানার নদের উপর পুলটিও প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার উপক্রম। কোনবাখাইল চৌরাস্তা হতে জয়নাতলীর বাজারের রাস্তার অবস্থা ভাল নয়, সানকিভাঙ্গা বাজার হতে ফুটির রাস্তাটিও দীর্ঘদিনের দাবি হলেও জনআকাঙ্খা মেটাতে কেউই যেমন এগিয়ে আসছে না ঠিক তেমনিভাবে কর্তৃপক্ষের নজরেও গোচরীভূত হচ্ছে না। কাজেই বিষয়গুলোকে ভাবনার মধ্যে নিয়ে এসে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনসাধারণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদানের প্রচেষ্টা থাকতে হবে। এ ইউনিয়নের ন্যায় বাংলাদেশের অনেক ইউনিয়নের চিত্রও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু সে বিষয়গুলো হয়তো পত্রিকার পাতায় উঠে আসছে না। পত্রিকায় পাতায় উঠে আসছে উন্নয়ন কর্মকান্ডের খবর, পিছিয়ে পড়া জনসাধারণকে চলমান গতিতে নিয়ে আসতে হলে গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে হবে বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)