চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গ্রান্ড মাস্টার জিয়া

আমার জীবনের একটা অংশ জিয়া। দাবা আমার প্রেম। ভালোবাসা। ভালো খেলতে পারি না। কিন্তু দাবা উৎসাহী। ভালো খেলা নিয়মিত উপভোগ করি। গ্রান্ড মাস্টার জিয়ার সঙ্গে সম্পর্কসূত্রে দাবা সম্পর্কে সামান্য ধারণা আছে। দাবার ওপেনিং, মিডলনেস, এন্ড গেম, বড় দাবা খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্য এসবই জেনেছি জিয়ার কাছ থেকে। অনেক ওপেনিং সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি ওর কাছ থেকে। জিয়া অনেক বই আমাকে পড়তে দিয়েছে। দাবা বিষয়ক বই।

১৭ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দেশে বিদেশে বহু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভালো ফলাফল করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় দাবা দলে প্রথম বোর্ডে প্রধান খেলোয়াড় হিসাবে খেলেছেন। আরও তিনজন গ্রান্ড মাস্টার আছেন। নিয়াজ মোরশেদের পর এই চার জন গ্রান্ড মাস্টার জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, এনামুল হোসেন রাজীব, আব্দুল্লাহ আল রাকিব। চার জন চার রকমের মানুষ। ওরা নিজের ভেতরে বাস করে। সহজে কারো সঙ্গে নিজেকে উন্মুক্ত করে না। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে- চার জনের আমাদের নিবিড় বন্ধুত্ব। অতি সুসম্পর্ক। আমি দাবা খেলোয়াড় নই। তবুও এই অতি উচ্চস্তরের দেশের শীর্ষস্থানীয় দাবা খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে-এ বড় ভাগ্যের ব্যাপার। উচ্চতর দাবাড়ুরা দাবার জগতের বাইরে কখনো স্বাছন্দ্য নয়। দেশ বিদেশের খেলোয়াড়রাই এদের বন্ধু।

জিয়ারা এক ধরনের ঘোরের মধ্যে থাকে। যখন জিয়া আন্তর্জাতিক মাস্টার তখন থেকে বড় সাথে বন্ধুত্ব। অনেক টুর্নামেন্ট খেলে, অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর জিয়া গ্রান্ড মাস্টার হওয়ার পথে তৃতীয় নর্ম অর্জন করে। এ প্রসঙ্গে বৃটিশ দাবা পত্রিকা উল্লেখ করে, তৃতীয় নর্ম পাওয়ার জন্য জিয়া চৌদ্দবার সুযোগ হারিয়েছে। এমন দেখা যায় সচারচর। এই শুনে জিয়া বললেন, কষ্ট করেই নর্ম অর্জন শ্রেয়তর। তাহলে খেলাটা শক্তভাবেই খেলা যাবে। সহজভাবে গ্রান্ড মাস্টার টাইটেল পেয়ে গেলে সেটা রক্ষা করা কঠিন।

জিয়া ইংল্যান্ডে নর্ম করে ঢাকায় ফেরেন। জিয়া তখন থাকে শেখেরটেকে। ওর বাবা পয়গাম উদ্দিন আহমদ একজন প্রকৌশলী। জিয়াকে উনিই তৈরি করেছেন। তার জীবনের ব্যর্থতার দলে জিয়া পূরণ করেছে। আমি সেদিন জিয়ার বাসায় গেছি সকাল সকাল। জিয়ার বাসায় তখন সাংবাদিকদের ভিড়। তিনি তখন নেতৃত্ব বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। জিয়া খুব উৎফুল্ল। জীবনে অনেক পরিশ্রম করে, ত্যাগ করে এই সাফল্য অর্জন করতে হয়েছে। একবার মনে আছে, ঢাকার এক টুর্নামেন্টে লাস্ট রাউন্ডে জিয়ার সঙ্গে খেলা পড়লো গ্রিক এক গ্রান্ড মাস্টর মালসিউসকাস। সেই রাউন্ডে জিতলে দিয়া গ্রান্ড মাস্টার হওয়ার প্রয়োজনীয় নর্ম পূরণ করবে। সবার উৎসুক চোখ জিয়ার দিকে।

খুব বাজে ভাবে হেরে গেল জিয়া। হাতের সামনে নর্ম অধরাই থেকে গেল। হলরুম থেকে বের হয়ে আমি আর জিয়া সোজা রিকশায় উঠলাম। ক্যান্টেন সুদা তখন ফেডারেশনের সভাপতি। তিনি জিয়াকে স্বান্তনা দিতে চাইলেন। জিয়া সে সব ভ্রুক্ষেপ করল না। ওর চোখে জল। শুধু কাঁদতে কাঁদতে বললো, গ্রান্ড মাস্টার হওয়ার জন্য কতো যে কষ্ট করে যাচ্ছিল। হতে পারছে না।
কোন এক নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে নিরিবিলি বসে জিয়া তার ব্যক্তিগত অনেক কথা বলল। ওদের মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র স্বপ্ন- জিয়ার গ্রান্ড মাস্টার হওয়া। তারপর একদিন সত্যি সত্যি জিয়া গ্রান্ড মাস্টার হলেন। আনন্দের বন্যা বয়ে গেল ক্রীড়াঙ্গণে। জিয়া অনেকবার বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ হয়েছেন। এসব ওকে আলোড়িত করে না। দাবার উচ্চতর সাফল্যই ওর ধ্যান জ্ঞান। দুপুরে দিয়ার বাসায় খিচুড়ি খেলাম। তারপর সৌখিন ভাবে জিয়ার সাথে দাবা খেলতে বসলাম। গ্রান্ড মাস্টার বলে কথা। আমার পাশে দাঁড়িয়ে পয়গাম উদ্দিন চাল বলে দিয়ে খেলতে লাগলেন এবং এক পর্যায়ে জিয়ার অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। জিয়া তখন মহাক্ষিপ্ত বলে উঠল।

বাবা এমনই জেদী। সেদিন বিকালেই গ্রান্ড মাস্টার হওয়া উপলক্ষে সুলতানা কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সে খেলা আছে। জিয়া একা খেলবে একশো প্রতিযোগির সাথে একই সময়ে। বেশ মজার ব্যাপার। একশো জন গোল হয়ে টেবিলে দাবার বোর্ড সাজিয়ে বসেছে। প্রত্যেকের সামনে একে একটা করে পাল দিয়ে যেতে লাগলো জিয়া। মজাটা হচ্ছে- আমাকে পাশে নিলো। আমি লজ্জা পাচ্ছি। জিয়া বলল, কোন ব্যাপার নয়। এগুলো সিরিয়াস খেলা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যে অধিকাংশ খেলোয়াড় হেরে বিদায় নিলো। দু’চার জন কিছুক্ষণ প্রতিরোধ গড়ে তুললো। কিন্তু সবাই তাকের ঘর। কিছুক্ষনের মধ্যে একশো জন ধরাশায়ী।
ধানমন্ডি থেকে বের হয়ে জিয়া আর আমি কোথায় যেন কাবার রুটি খেলাম। তখন এই মেনু দিলো আমাদের খুব প্রিয়।

১৯৯৮ সাল হবে হয়তো। কোন এক দাবা টুর্নামেন্টে ফাইনাল রাউন্ডে উঠেছে ভারত চ্যাম্পিয়ন পরসেষম্বরণ। খেলা হবে বাংলাদেশ চ্যম্পিয়ান জিয়ার সাথে।

বিজ্ঞাপন

আমি তখন দৈনিক বাংলার ফিচার সম্পাদক খেলা হবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে দৈনিক বাংলা থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। জিয়া দৈনিক বাংলায় এলো। আমরা রুটি ভাজি খেলাম এক সাথে। দুপুর তিনটায় খেলা। জিয়ার নড়াচড়া নাই।

চলো যাই, আজ না গুরুত্বপূর্ণ খেলা। তাই একটু দেরি করে যাচ্ছি। জিয়ার নির্বিকার জবাব। তাতে পরসেষম্বরণ খানিক ভড়কে যাবে। আমি আজ আত্মবিশ্বাস নিয়ে দ্রুত চাল দেব। আধাঘণ্টা দেরি করে দিয়া উপস্থিত হয়ে খেলা শুরু করে। রুদ্ধশ্বাস খেলা। দশর্কদের উপচে পড়া ভিড়। শেষ পর্যন্ত জিয়ার জয়লাভ। টুর্নামেন্টের শিরোপা অর্জন। তখন জিয়াদের কোচ ছিলেন ক্রাসেনকড। জিয়া বলত, উনার কাছ থেকে অনেক শিখেছি।

জিয়ার অসংখ্য খেলা দাবা ফেডারেশনে সরাসরি দেখেছি। কলকাতায় গিয়েছি অনেক বার। জিয়াদের দাবা টুর্নামেন্ট দেখতে। কলকাতার গুড়রিক দাবার কথা মনে পড়ে। এখনো জিয়া দাবা কোচের কারণে প্রায়ই কলকাতায় যায়। বেশ কিছুদিন থাকে। আজ কাল কোথাও টুর্নামেন্টে অন লাইনে জিয়াদের খেলা দেখতে পাই। ওর খেলার স্টাইল খুব নান্দনিক। ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষ শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। জিয়ার অসম্ভব ভালো পজিশন্যাল সেন্স।

দাবা নিয়ে পড়াশোনা করে নিয়মিত। সাম্প্রতিক সময়ের তাত্ত্বিক দাবার ব্যাপারে আপ টু ডেট থাকতে হয়। কম্পিউটারে সারাক্ষণ দাবা প্রাকটিস করা। অনলাইনে খেলা। এসব নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটে জিয়ার। বউয়ের নাম লাবণ্য। মা-বাবার একমাত্র পুত্র তাহসিন। দশবছর বয়স। এখনই সে বাংলাদেশের ৭ নম্বর দাবারু। তাহসীনের রক্তের মধ্যে দাবা তাহসীন এই পিচ্চি বয়সেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এখন জিয়া আর তাহসীন বাপ বেটা একসঙ্গে প্রাকটিস করে। দাবা ফেডারেশনে যায়। মাঝে মাঝে দাবা দলের মুখোমুখি খেলা গড়ে যায়। অবশ্য এ নিয়ে জিয়া চিন্তিত নয়। জিয়া তাহসীনের সঙ্গে ড্র মেনে নেয়। তাহসীন বাংলাদেশের সম্ভাবনায় প্রতিশ্রুতিশীল ভবিষ্যত গ্রান্ড মাস্টার।

জিয়ার সঙ্গে স্মৃতিগল্পের শেষ হবে না। জিয়ার বউ লাবণ্য। আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে। পছন্দ করে। জিয়া-লাবণ্য দুজনেই আমার রান্নার খুব ভক্ত। নিজের বাসা ছাড়াও জিয়া লাবণ্যর বাসায় বহুবার রান্না করেছি। জিয়া সবকিছু খেতে ভালোবাসে। জিয়া আড্ডায় মিটি মিটি হাসে। কথা কম বলে। জিয়া সৌখিন গায়ক। বড় বড় দাবা টুর্নামেন্টের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জিয়াকে গান গাইতে দেখেছি।

জিয়ার সকল স্বপ্ন এখন তাহসিনকে ঘিরে। তাহসিন যেন বড় খেলোয়াড় হতে পারে সেই সাধনা করে যাচ্ছে। জিয়াই ওর কোচ। আধুনিক দাবা অসম্ভব জটিল ও অংকের মত। প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়। থিয়োরি জানতে হয়। সাম্প্রতিক কলা-কৌশল জানতে হয়। দাবা পজিশনাল ও কম্বিনেশনাল খেলা। দুটোর সমন্বয় যদি করা যায় তবে বড় খেলোয়াড় হওয়া যায়। দাবা খেলা সবাই জানে। অর্থাৎ চাল জানে কিন্তু খেলা জানে না। যারা উচ্চতর দাবা খেলেন তারা প্রফেশনাল।

যারা বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলে তারা সেমি প্রফেশনাল আর যারা সাধারণ খেলা খেলেন তারা এ্যামেচার খেলোয়াড়। দাবা খেলা বুঝতে হলেও অনেক সাধনা করতে হয়। জিয়াদের সঙ্গে প্রায় ত্রিশ বছর ধরে চলাফেরা করছি। কিন্তু দাবার কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। দাবার অপার্থিব সৌন্দর্য উপলব্ধি করা হলো না। দাবা শিল্পের সুষমা মণ্ডিত খেলা। সঙ্গীতের মত, চিত্রকলার মত অলৌকিক এক লেখা। আর এসবই বুঝতে পেরেছি গ্রান্ড মাস্টার জিয়ার সুবাদে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জিয়া এক অসাধারণ ব্যক্তি।

বিজ্ঞাপন