চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গুটিয়ে আনা নয়, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিকল্প প্রস্তাব

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনার প্রেক্ষিতে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নারীদের নিয়োগ না দিতে বিভাগীয় কমিশনারদের অনুরোধ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। জেলা বা বিভাগীয় শহরের কাছাকাছি যোগাযোগব্যবস্থা ভালো আছে এমন জায়গায় তাদের নিয়োগে অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত কি এসব হামলা ঠেকাতে কার্যকর? নাকি তাতে নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে?

এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, এটা দুঃখজনক ও পিছিয়ে আসা। গত ৫০ বছরে প্রশাসন থেকে রাজনীতি সবখানে নারীর যে ক্ষমতায়ন হচ্ছিলো সেখান থেকে এটা পশ্চাৎপদতা। নারী রাঙামাটি যাবে, খাগড়াছড়ি যাবে, সে নারী হিসেবে কোনো সুবিধা চাইছে না। সে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে ইউএনও হয়েছে। তাকে সরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। যেখানেই তিনি থাকুক তার নিরাপত্তার দায় সরকারকে নিতে হবে। সরকার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে, সেটা হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

ইউএনও ওয়াহিদার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জানা গেছে তিনি অনেক কাজ করছিলেন, দুষ্ট লোকদের পেছনে লেগেছিলেন। এই হামলা তো কুমিল্লা বা ঢাকা শহরেও হতে পারে। এসব সরকারকেই সামাল দিতে হবে। গুটিয়ে এনে নারীদের শহরে দিবে, গ্রামে দিবেনা এটা পশ্চাৎপসরণ ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রকাশ।

বিজ্ঞাপন

রোবায়েত ফেরদৌস

নারী হিসেবে না মানুষ হিসেবে সবার নিরাপত্তা দিতে হবে উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, কাউকে ‍গুটিয়ে এনে এই সমস্যার সমাধান আনা যাবে না। সরিয়ে আনলে তো হামলাকারীরাই ফল পাবে। তারা তো চাচ্ছিলোই ইউএনও ওয়াহিদা যেন সেখানে না থাকে। তাদের অনেক কাজ আটকে ছিলো যেগুলো ওয়াহিদার জন্য হচ্ছিলো না। তাহলে তো তাদের স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে।

এমন সিদ্ধান্তে নিরাপত্তা জোরদার হবে বলে মোটেও মনে করছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান। তিনি বলেন, ইউএনওদের মাঠ পর্যায়ের কাজ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। সবক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ে নারীদের যে অবদান তা ছোট করে দেখার কিছু নেই। অন্যান্য জায়গায় কাজ না করে নারীদের নিরাপত্তা দিবেন, তা হবে না। ইউএনও মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংযোগে যান। সব জায়গায় নানান বালুমহল, জলমহল রয়েছে। সেসব কাজ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় নারীদের যে অবদান, পদচারণা ও শক্তি তাতে তা ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

বিজ্ঞাপন

সবার নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অনেক বন কর্মকর্তা নারী আছে। বিসিএসে নারী আছে, স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও আছেন। সেসবও তো ঝুঁকিপূর্ণ। সংবিধানেও বলা হয়েছে সব পাবলিক কাজকর্মে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার হবে। সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে এসব চলতেই থাকবে। নিরাপত্তা নিয়ে সবখানেই কাজ করতে হবে।তা না করে নারীদের গুটিয়ে আনা খুবই হাস্যকর ও ন্যাক্কারজনক সিদ্ধান্ত হবে। নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণ ও প্রদীপের ঘটনায় তো সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। সেই নিরাপত্তা প্রদানের কাজ পুরো বাংলাদেশজুড়ে করতে হবে। তাদের সরিয়ে আনবেন আর অন্য কোনো কাজ করবেন না তা হতে পারে না।

সমস্যা সমাধানে বিকল্প কিছু ভাবার প্রস্তাবনা এই শিক্ষকের। বলেন,  তাদের পরিবার বা তাদের বাড়ির সুরক্ষা করতে পারি। তাদের জন্য আনসার দিতে পারি কিন্তু গুটিয়ে আনাটা হতে পারে না, তাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। আগে গ্রাম পর্যায়ে অনেক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করতো, এখনও অনেক সংগঠন আছে কিন্তু তারা সমাজের নিরপত্তায় কাজ করে না। তারা রাত জেগে সিনেমা দেখে কিন্তু গ্রাম টহল দেয়না। সরকারের এসব অঙ্গসংগঠনকে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমরা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর অনেক নির্ভর করি। পুলিশ নিরাপত্তা দেবে সেটা ভাবি। কিন্তু ২০০০ জনের জন্য একজন পুলিশ। আমরা কিভাবে আশা করি যে তারা রাত জেগে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, কোনো অপরাধ হবে না। তাই সেখানে প্রো অ্যাকটিভ পুলিশিং করতে হবে। অপরাধ ঘটার আগে ওই এলাকার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে হবে। যেমন যেখানে আলো নেই সেখানে ছিনতাই বেশি হবে, যেখানে ব্যাংক বেশি সেখানে ডাকাতি হবে। যেকোনো জায়গায় নিরাপত্তা দেওয়ার আগে পুলিশের পড়াশোনা করতে হবে। সেটা আমাদের নেই বলে সমস্যা সমাধান কঠিন।

খন্দকার ফারজানা রহমান

তৃতীয়ত, আমাদের দেশে ওভারঅল প্রেট্রোনাইজেশন এত নগ্ন জায়গায় গেছে অনেক রাজনৈতিক নেতাও দুর্বৃত্তদের পালে পোষে। তারা জানে কে চুরি করে, কে ডাকাতি করে, কে ইয়াবা ব্যবসা করে। তারা যদি ভাবে আমাদের এলাকায় অপরাধ হতে দিবো না তাহলে সেসব জায়গায় অপরাধের হার কমে যাবে। এভাবেই কিন্তু দেশের অনেক জায়গায় অপরাধ প্রবণতা বেশি, অনেক জায়গায় কম। সেসব জায়গায় নিরাপত্তা দেয়ার জন্য সরকারকে গবেষণা করতে হবে। কোথায় কোন ধরনের অপরাধ বেশি ঘটে তা বুঝতে হবে। তাহলে এসব নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

সরকারি তথ্য বলছে, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে মাঠপর্যায়ে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৪৫ জন ইউএনও ছাড়াও বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে সাতজন জেলা প্রশাসক (ডিসি), ৩৮ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) এবং ১৭৩ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে নারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সরকারের ৭৬ জন সচিবের মধ্যে ১০ জন সচিব নারী।

প্রশাসন ক্যাডার ছাড়াও অন্যান্য ক্যাডারেও মাঠপর্যায়ে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে চারজন পুলিশ সুপার, একজন সিভিল সার্জন, ৬০ জন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, ৫২ জন অধ্যক্ষ এবং ২৩ জন প্রকৌশলী মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।