চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খেলাপি ঋণে নতুন রেকর্ড

অবলোপন ছাড়া খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোট কোটি টাকা, অবলোপনসহ প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আর এক পয়সাও বাড়তে দেয়া যাবে না– নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমন ঘোষণা দিলেও তা কাজে আসেনি। বরং উল্টো পথে হাঁটছে খেলাপি ঋণ। এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ- এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত এর পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ ১৮ শতাংশ বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে এই প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল। অর্থাৎ খেলাপি ঋণে রেকর্ড গড়লো বাংলাদেশ।

তবে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রাইটঅফ বা অবলোপন করা হয়েছে। এই টাকা খেলাপি হিসাবে যুক্ত করলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যেহেতু খেলাপি ঋণ রেকর্ড করেছে, এখন খেলাপিদের শাস্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত অবস্থানে থাকার পাশাপাশি বাজেটে তাদের ভর্তুকি ও সহায়তা না দিলে খেলাপি ঋণ কমতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, দুটো কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

প্রথমত: ঋণ খেলাপিদের পুন:তফসিলের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে ছাড় দেয়ার ঘোষণা। এটার কারণে ব্যাংকিং খাতে ভুল বার্তা গেছে। যাদের খেলাপি ঋণ পরিশোধ করার ইচ্ছা ছিল, তারাও পরিশোধ করা থেকে বিরত থেকেছেন।

দ্বিতীয়ত: যারা ব্যাংকিংয়ে আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারি করে ধরা পড়েছে তাদের বিচার না করার কারণে পুরো ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বেড়েছে, সুশাসনের অভাব দেখা দিয়েছে, নীতি নির্ধারণে দূর্বলতা দেখা দিয়েছে। ফলে এ খাতে পুরো অসন্তুষ্টি দেখা দিচ্ছে।

এর থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি পথ দেখিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।

১. যারা খেলাপি হয়েছে আইন অনুযায়ী তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে হবে।

২. খেলাপিদের ছাড় দেয়ার বিষয়ে হুটহাট করে প্রজ্ঞাপন জারি করা বন্ধ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

৩. বাজেটে বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি, সহায়তা দেয়া হবে। কিন্তু যারা খেলাপি তাদের যেন এসব সুবিধা না দেয়া হয়। তাহলে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ডিসেম্বরে মাসে সাধারণত ব্যাংকাররা খেলাপি ঋণ কিছুটা গোপন করে। আর সেটা পরবর্তী বছরের প্রথম কোয়ার্টারে বের হয়ে আসে। এতে প্রমাণিত হয় যে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলছে।

‘তবে আগামী কোয়ার্টারে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হবে। অর্থাৎ আইন করে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পাল্টে দিয়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হবে। কিন্তু প্রকৃতভাবে খেলাপি ঋণ কম নয়। এটা আর্থিক খাতে একটি অশুভ লক্ষণ।’

খেলাপি ঋণে রেকর্ড হয়েছে উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে এই বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ডিসেম্বরে অনেকেই ঋণ পুন:তফসিল করে। ব্যাংকগুলোও তাদের পোর্টফোলিও ভাল দেখানোর জন্য পুন:তফসিলের সুযোগ দিয়ে কিছু অর্থ আদায় করে। ফলে বছরের শেষ কোয়ার্টারে খেলাপি ঋণ একটু কম থাকে। আবার প্রথম কোয়ার্টারে বেশি দেখা যায়। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে আবার কমে যাবে। এটা এই নিয়মেই হয়ে আসছে।

‘তবে বাস্তবতা হলো ঋণ খেলাপি হলে সেগুলো আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে।’ এর কোনো বিকল্প নাই বলে মনে করেন তিনি

তিনি বলেন: গত ডিসেম্বরে যে ঋণগুলো পুন:তফসিল করা হয়েছে সেগুলো উদ্ধারের জন্য সচেষ্ট থাতে হবে এবং কিস্তি আদায়ে জোর তাগিদ দিতে হবে। এর ফলে ধীরে ধীরে খেলাপির পরিমাণ কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

এছাড়া দীর্ঘদিন খেলাপি থাকায় অবলোপন করা রয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এটিসহ মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। গত বছরের মার্চের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।

খাতওয়ারি হিসাবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। তাদের বিতরণ করা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা ঋণের ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৭ লাখ ৫ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। এই খাতের ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ৩৬ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। অন্যদিকে সরকারি দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২৪ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে।

Bellow Post-Green View