চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

খেলতে খেলতে গ্রাজুয়েশন

শাহেদুর রহমান। একজন কৃতি খেলোয়াড়! শৈশব থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে ছিল নিবিড় সখ্যতা। পড়ার টেবিল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন কৈশোরে। বয়সভিত্তিক দলের গণ্ডি না পেরোতেই ডাক আসে জাতীয় দলের। সময়ের সঙ্গে ব্যস্ততা আরও বাড়ে। দেশের হয়ে নিজেকে উজাড় করে দিতে দিতে পড়াশুনার বয়সটা কীভাবে পেরিয়ে গেল টেরই পাননি! সময়টাতে অর্থকড়িও কম আসেনি। কিন্তু খেলা ছেড়ে কী করবেন সে ভাবনায় পড়লেন অথৈ-সাগরে! গ্রামে ফিরে বাপ-চাচাদের পুরোনো ব্যবসাটাই দেখবেন কিনা ভাবতে থাকেন সেটি নিয়ে। পড়াশুনা করতে না পারায় আত্মবিশ্বাসটা তখন তলানিতে। খেলা ছাড়ার পর কোন কোন মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ আছে সেটিও জানা নেই একদমই।

ওপরে বলা শাহেদুর রহমানের গল্পটা কাল্পনিক। তবে এমন দোটানার সাগরে পড়া খেলোয়াড়দের উদাহরণ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে কম নেই। কৃতি খেলোয়াড়দের অনেকেই মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

অনেকেই পড়াশুনার প্রয়োজনীয়তা টের পান খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানার পর। ভবিষ্যতে ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের যেন আর উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়তে না হয়, সেজন্য উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও চালু হয়েছে স্পোর্টস স্টাডিজ প্রোগ্রাম। মূলত ক্রীড়াবিদদের মাঠের কাজটার পাশাপাশি উচ্চতর পড়াশুনার এই মাধ্যম চালু করেছে বিএসি ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সেন্টার।

বিএসি (BAC) একটি আন্তর্জাতিক স্টাডি সেন্টার। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ডার্বির অধিভুক্ত হয়ে ওখানকার কোর্সগুলো বাংলাদেশে পড়াচ্ছে। ‘এ’ লেভেল, ‘ও’ লেভেল পর্যায়ের পড়াশুনা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইডেক্সেল (EDEXEL)-এর সঙ্গে মিলে ‘স্পোর্টস স্টাডিজ’ নামে একটা সাবজেক্ট চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে তিনটি পর্যায়ে পড়াশুনার সুযোগ পাচ্ছেন খেলোয়াড়রা। পর্যায় তিনটি- A’ লেভেল, O’ লেভেল ও ডিগ্রী। গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রাম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেখানে খেলোয়াড়ি জীবনের সঙ্গেই আগাতে থাকে পড়াশুনাটাও। যেটি শেষ করে তারা হতে পারেন কোচ, ট্রেনার, ধারাভাষ্যকার, স্পোর্টস মার্কেটার, স্পোর্টস এজেন্ট থেকে শুরু করে স্পোর্টস ম্যানেজার পর্যন্ত।

সেমিনারে অংশ নেন ক্রিকেটার, কোচরা

বিএসি’র ধানমন্ডি শাখায় শুরু হওয়া কার্যক্রমে খেলোয়াড়দের আগ্রহও কম নয়। প্রথম দুই ব্যাচে ভর্তি হয়েছেন ক্রিকেট, ফুটবল, হকির অন্তত ৪০ ক্রীড়াবিদ। ক্রিকেটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম আব্দুর রাজ্জাক, তাসকিন আহমেদ, মেহেদী হাসান মিরাজ, নাজমুল হোসেন শান্ত, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। তাদের পাঠ্য সূচিতে অন্তর্ভুক্ত আছে কোচিং, ট্রেনিং, নিউট্রেশন, স্পোর্টস সাইকোলজি, স্পোর্টস বায়োমেকানিক, স্পোর্টস ফিজিওলজি, স্পোর্টস মেডিসিন ও স্পোর্টস বিজনেসকে সন্নিবেশিত করে তৈরি করা বিষয়গুলো।

বিজ্ঞাপন

দেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য আলাদা পড়াশুনার চিন্তাটি শুরুতে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের মাথায়। পিএইচডি করতে ম্যানচেস্টারে গিয়ে জানতে পারেন এ ধরণের পড়াশুনা সম্পর্কে। বাংলাদেশে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কিনা; তা নিয়ে চালান গবেষণা। তার উদ্যোগকেই বাস্তবায়ন করছে বিএসি ইউনিভার্সিটি।

প্রোগ্রামের কনসালটেন্ট হিসেবে আছেন মামুন নিজেই। খেলোয়াড়দের সাড়ায় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ আশাবাদী করছে তাকে। চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে জানালেন, ‘এটিকে সামনে এগিয়ে নিতে পারব বলে আমি আশাবাদী। বাংলাদেশে এটার প্রয়োজনীয়তা আছে। একটা গবেষণা চালিয়েছিলাম, তাতে ইতিবাচক ফল পেয়েছি। এখন দেখতে পাচ্ছি আসলেই সবার আগ্রহ আছে। সবার সহায়তা পেলে কার্যক্রম এগিয়ে নাতি পারব।’

প্রোগ্রাম নিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন বললেন, ‘স্পোর্টস নিয়ে কাজ হওয়ায় এখানে বেশিটাই প্র্যাকটিক্যাল পার্ট। একেকটা মডিউলে থিওরিক্যাল পার্ট ৭-১০ দিনের। এখানে লিখিত কম্পোনেন্ট কম। মূলত অ্যাসাইনমেন্ট, ইন্টারভিউ, ভাইভা, থিসিস থাকায় শিক্ষার্থীরা সুবিধা মতো অ্যাসাইনমেন্ট ডেলিভারি করতে পারেন। পুরো প্রোগ্রাম শেষ হতে সাড়ে ৬ বছর লাগে। নিয়মিত করতে পারলে তিন বছরেও শেষ করা সম্ভব।’

স্পোর্টস স্টাডিজ প্রোগ্রামে ক্লাস নেন সাবেক ক্রিকেটার, কোচরা

বিসিবির চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরীও ক্লাস নেন এই প্রোগ্রামে। তিনি বললেন, ‘দেশের যারা স্পোর্টস পার্সন, যারা প্রফেশনাল খেলোয়াড়, খেলার কারণে হয়ত লেখাপড়াটা করা হয়ে ওঠে না; খেলতে গিয়ে স্টাডিটা মিস করে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে দেখছে স্টাডি আর হচ্ছে না, চাইলেও পারছে না। অফসিজনে বা বিরতির ফাঁকে তারা পড়তে পারবে, সেরকমই একটি ফ্লেক্সিবল স্টাডি প্রোগ্রাম এটি। বছরে ৩-৪টা মডিউল নিতে পারে। এভাবে যদি ২০-২৫টা মডিউল শেষ করতে পারে, সেটা তাকে গ্রাজুয়েশনের দিকে নিয়ে যাবে। চাইলে খেলার সিজনগুলোর ফাঁকে ফাঁকেই এটা শেষ করা সম্ভব। ক্যারিয়ার শেষের সময় দেখবে গ্রাজুয়েশনও শেষ হয়ে গেছে।’

দেবাশীষ আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে তারকা খেলোয়াড় না হলে যথাসময়েই ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষায় বসতে হয়, নিয়মিত হাজিরার একটি বিষয়ও থাকে। সেটা খেলোয়াড়দের জন্য সহজ না। তাদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ এটা। যখন সময় পাবে তখনই একটা করে মডিউল শেষ করতে পারবে। এটি এডেক্সেলের সার্টিফিকেশন। যা শেষ করে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে গিয়েও উচ্চতর পড়াশুনা করতে পারবে।’

কেবল খেলোয়াড়, কোচ, ট্রেনারই নন, খেলাধুলা বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান এমন যে কেউই এই প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও চাহিদা না থাকলেও কিছুটা পড়াশোনা জানা থাকলেই এই প্রোগ্রামটি থেকে সুবিধা তুলে নেয়া সম্ভব।