চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কর্নেল তাহেরের মেয়ে পরিচয়ের চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে: জয়া তাহের

শহীদ কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের মেয়ে জয়া তাহের বলেছেন, যে তাহের মানুষের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেছেন তার কন্যা পরিচয়ের চেয়ে গৌরবের আর কিছুই হতে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধে আহত সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সামরিক আদালতে বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ডের নামে হত্যা করা হয়।

তাকে স্মরণ করে চ্যানেল আই অনলাইন কথা বলেছে কর্নেল তাহেরের মেয়ে জয়া তাহেরের সঙ্গে।

চ্যানেল আই অনলাইন: কর্নেল তাহেরকন্যার কাছে বাবার আগে মা লুৎফা তাহেরের কথা জানতে চাই। শোকের সঙ্গে এক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি গেছেন। দিনশেষে সন্তানদের জন্য নিশ্চয়ই তিনি সুখি এক মা?

জয়া তাহের: হ্যাঁ, আজ বলতে পারেন উনি একজন সুখি মা। ১৯৭৬ সনের পর থেকে ছোট ছোট তিনটি সন্তান নিয়ে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের আদর্শ ধরে রেখে এক দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন উনি পার করেছেন। এবং আমাদের সঠিক পথটি দেখিয়েছেন বার বার। আমি, যীশু, মিশু আজ বলতে পারেন স্ব স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। উনি দেশের অসংখ্য মানুষের সম্মান ও ভালবাসা পেয়েছেন। সেই অর্থে আমি মনে করি উনি একজন সংগ্রামী সফল মানুষও বটে।

চ্যানেল আই অনলাইন: কর্নেল তাহেরের পরিবার ছিল আপাদমস্তক এক রাজনৈতিক পরিবার। এক পরিবারে এত মুক্তিযোদ্ধা বিরল। সেই বৃহত্তর পরিবার আর কর্নেল তাহেরের রেখে যাওয়া পরিবারের মধ্যে মিল-অমিল কী পান?

জয়া তাহের: কর্নেল তাহের এক সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এবং তারই ফলশ্রুতিতে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লব। এরপরের সময়গুলোতে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখতে পাই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়া। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা একাধারে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে হত্যা করেছেন, নির্যাতন করেছেন ও রাজাকারদের পুনর্বাসন করেছেন। 

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে গণমাধ্যমে রাজাকার শব্দটির উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিলো বহুবছর। Lawrence Lifschultz এর লেখা Abu Taher’s Last Testament: Unfinished Revolution বইটার উপরও বহুবছর নিষেধাজ্ঞা ছিল।

এই যখন ছিল রাজনৈতিক পটভূমি তার মাঝে তাহের পরিবারকে টিকে থাকতে হয়েছে। তবে এত কিছুর মাঝেও তাহের পরিবারকেই আমি রাজপথের প্রতিটি সংগামে অগ্রণী ভূমিকায় দেখতে পাই। তাদের আমি দেখতে পাই জাহানারা ইমামের সাথে আন্দোলনে, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে, সেনাবাহিনীর একচেটিয়া আগ্রাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে, শাহবাগসহ অসংখ্য আন্দোলনে মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের দাবিতে আজও এই পরিবারকে আমি রাজপথেই দেখতে পাই।

চ্যানেল আই অনলাইন: আসলে জানতে চাচ্ছি, কর্নেল তাহেরের সন্তান হিসেবে আপনি বা আপনার ভাইদের সক্রিয় রাজনীতিতে দেখি না কেন? নিকট ভবিষ্যতে কোন সম্ভাবনা কি আছে?

জয়া তাহের: পরিবারতান্ত্রিক যে রাজনৈতিক বলয় সৃষ্টি হয়েছে তার সাথে আমি একমত পোষণ করি না। আমি মনে করি তৃণমূল থেকে জনগণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠা উচিত। কর্নেল তাহেরও এমনি একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। একটি রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে হিসেবে রাজনীতি থেকে কখনই আমরা দূরে ছিলাম না। তবে এটা সত্য যে সক্রিয় রাজনীতিতে আমরা নেই। তৃণমূলে জনসাধারণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই আমরা ভবিষ্যতে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হবো।

চ্যানেল আই অনলাইন: কর্নেল তাহের যে আদর্শ রেখে গেছেন সেই আদর্শ এখন কোথায়?

জয়া তাহের: আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে কর্নেল তাহেরের আদর্শ আজ বিরল। ‘বটতলা’ নামে এক নাট্যদল শাহাদুজ্জামানের উপন্যাস অবলম্বনে নাটক ‘ক্রাচের কর্নেল’ বইটির মঞ্চনাটকে রূপ দিয়েছে। তারা ঢাকাসহ অনেক জেলাতে এই নাটকটির শো করেছেন। আজ এই নতুন প্রজন্ম তাহেরকে জানতে চায়। এবং এই মানুষগুলোকেই আমি দেখি ছোট ছোট অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। অসুস্থ রাজনীতিকে মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে। সর্বস্তরের নির্যাতিত অসহায় মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মাঝেই কর্নেল তাহেরের আদর্শ দেখতে পাই।

চ্যানেল আই অনলাইন: কর্নেল তাহের যে দল রেখে গেছেন সেই দল কি তার সেই আদর্শে আছে? যদি থাকে কীভাবে? যদি না থাকে তাহলে তার প্রত্যাবর্তনের পথ কী?

জয়া তাহের: ১৯৭২ সনের ৩১ জুলাই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের আত্মপ্রকাশ। জাসদের বৈপ্লবিক ইতিহাস, স্বতন্ত্র অবস্থান এবং এদেশের গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামে দলের নেতা-কর্মীদের নির্মোহ আত্মত্যাগ এই দলকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও তার ভবিষ্যতের সাথে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।

হ্যাঁ, বর্তমানে জাসদ এক কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আমার মা জাসদকে একত্রিত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমি মনে করি জাসদ তার পুরাতন ঐতিহ্য বজায় রেখে এক হয়ে বৃহৎ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

চ্যানেল আই অনলাইন: দিন শেষে আপনাদের কি কোন আফসোস আছে যে মানুষকে ভালোবেসে কর্নেল তাহের তার স্ত্রী-সন্তানদের স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে রেখে গেছেন?

জয়া তাহের: আমি একজন জাতীয় বীরের মেয়ে। কর্নেল তাহের তার শেষ চিঠিতেও বলে গিয়েছিলেন: ‘নীতু, যীশু ও মিশুর কথা, সবার কথা মনে পড়ে। তাদের জন্য অর্থ-সম্পদ কিছুই আমি রেখে যাইনি। কিন্তু আমার গোটা জাতি রয়েছে তাদের জন্য। আমরা দেখেছি শত-সহস্র উলঙ্গ মায়া-মমতা-ভালোবাসা-বঞ্চিত শিশু। তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় আমরা গড়তে চেয়েছি।’

এরচেয়ে বড় পাওয়া আমার জন্য আর কি হতে পারে? আমার অনেক পরিচয়ের মাঝে আমি কর্নেল তাহেরের মেয়ে, এ পরিচয়ে পরিচিত হতে আমি গৌরববোধ করি। যতদিন শোষন বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই থাকবে ততদিন তাহেরের আদর্শ থাকবে।