চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা কান্নায় ডেঙ্গুর গর্জন

পৃথিবীর মানুষ মাত্র মাস তিনেক হলো নভেল করোনা ভাইরাসের নাম শুনেছে। আর কোভিড-১৯ রোগ বা অসুখের নাম শুনেছে তারও অনেক পরে। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই সারাবিশ্বে তাণ্ডব নৃত্য চালিয়ে যাচ্ছে ভাইরাসটি। কোনো কিছুতেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিষেধক না থাকায় মহামারির চেয়েও শক্তিশালী হয়ে মানবজাতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত। বলতে গেলে সেই লড়াইয়ে  এখন পর্যন্ত জয়ী করোনা ভাইরাসই।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বুকে ছোট-বড় প্রায় দুই’শ দেশ ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। শুরুতে চীনে যখন ভাইরাসটি ব্যাপক আকারে ছড়াতে থাকে, তখন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এর মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারপর তাদের ঘুম যখন ভাঙে, তখন আসল আর কিছুই করার ছিল না। করোনা তার নিয়মেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ কিংবা অঞ্চল ভেদে তার বিস্তৃতি ঘটিয়ে গেছে। এ কারণেই আজ ইটালি, স্পেন, ফ্রান্স এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপার পাওয়ারকেও কাবু করে ফেলেছে করোনা। মৃত্যু আর নতুন আক্রান্তে প্রতিদিনই দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে একে অন্যকে পেছনে ফেলে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব পরিস্থিতি যখন এমন, তখন বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। শুরুর দিকে দায়িত্বশীলরা প্রতিদিন করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রস্ততি নিয়ে একের পর এক মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা শুনিয়ে গেছেন। কিন্তু এই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে সত্যি সত্যি যখন দেশ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রচার করে; তখন সবকিছুই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। আসলে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আমাদের তেমন কোনো প্রস্ততিই ছিল না। এখন পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাওয়ার পর নতুন করে প্রস্ততি নিতে গিয়ে সব লেজেগোবরে করে ফেলছি। এই নাই-সেই নাই, চারদিকে শুধু নাই আর নাই।

বিজ্ঞাপন

এই যখন আমাদের করোনা ভাইরাস মোকাবেলার চিত্র, তখন আড়ালে বাড়ছে আরেক দৈত্য- এডিস বা ডেঙ্গু মশা। গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষ মারা গেছে। আমরা তখনও দেখেছি, সেই ভয়াবহ অবস্থা মোকাবেলার কোনো প্রস্তুতিই আমাদের ছিল না। অথচ স্বাস্থ্যখাতে প্রতিবছর সরকারের বরাদ্দ কম না। যে বরাদ্দ ঠিক কোন কোন খাতে ব্যয় হয়; তার হদিসও অনেক ক্ষেত্রে জানা জায় না।

সারাদেশে মশক নিধনে মূলত করে কাজ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। আগের বছরের ‘শিক্ষায়’ গত ফেব্রুয়ারিতে মশক নিধনে নানান প্রস্ততির কথা ঘোষণা করে। এমনকি এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তাজুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষায় যাবতীয় প্রস্তুতির কথা জানিয়ে দেন। তিনি সাহস দিয়ে বলেন, গত বছরের মতো ওষুধ বা লোকবল সংকট এবার আর হবে না।

শুধু মন্ত্রীই নন, সেই সংবাদ সম্মেলনের কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও নিজেদের মতো করে অগ্রিম প্রস্তুতির পাশাপাশি মশক নিধনে কর্ম পরিকল্পনার কথা জানায়। এমনকি ডেঙ্গুর প্রাক-মৌসুম, মূল মৌসুম আর মৌসুম-পরবর্তী সময়ে কাজ করার বিভিন্ন ধাপের কথাও বলে। ব্যস! এতটুকুই। ঘটা করে মানুষকে জানানোর পর মাঝে মাঝে একটু আধটু ফগার মেশিনের শব্দ ছাড়া রাজধানীবাসী মশক নিধনে তাদের আর কোনো কার্যক্রম দেখেনি। মোট কথা ‘যেই লাউ, সেই কদু’র অবস্থা।

বিজ্ঞাপন

তবে দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চোখে না পড়লেও এরই মধ্যে রাজধানীজুড়ে মশার উপদ্রব ঠিকই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পুরো শহরেই দিনের পর দিন সেই উপদ্রব বেড়েই চলছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার আগে এমনকি দিনের বেলায়ও মশার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মানুষ।

এমনিতেই সারাদেশে এখন করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। এডিস বা ডেঙ্গু মশা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাবনার ফুসরত নেই। তাহলে? আমরা কি গতবছরের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? এখনই মশক নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে, নিশ্চিত করেই বলা যায় –হ্যাঁ, তাই। আমরা সেই পরিস্থিতির দিকেই যাচ্ছি।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে এরই মধ্যে সারাদেশে ১০ দিনের অঘোষিত ‘লকডাউন’ শুরু হতে চলেছে। এই ঘোষণার পর রাজধানীর বেশির ভাগ মানুষ ছুটেছে গ্রামের পথে। কিন্তু তাদের বাসা-বাড়ি সবাই কি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে গেছেন? যেসব পাত্রে পানি জমে বা ডেঙ্গ মশার বংশ বৃদ্ধি খুব সহজেই হয়, সেগুলো কি ঠিকঠাক রেখে যেতে পেরেছেন? আবার খুব শিগগরই যে এই পরিস্থিতির অবসান হবে; তাও নয়।

তার মানে হলো, এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতেও ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তেই হবে আমাদের।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)