চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনা আক্রান্ত সময়: স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বয় জরুরি

কোভিড-১৯ সারা পৃথিবীকেই অস্থির করে তুলেছে। এ থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় কেউ বলতে পারছে না। বিশ্বের জাঁদরেল সব বিজ্ঞানী গবেষক কিংকর্তব্যবিমূঢ়।প্রতাপশালী রাষ্ট্রপ্রধানরাও অসহায় হয়ে পড়েছে এই ভাইরাসের সামনে। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করেছে। আমি যখন এই লেখাটা লিখছি, তখন সারাবিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১২,৮৫,২৬১ জন, মৃত্যু হয়েছে ৭০,৩৪৪ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে পরীক্ষিত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৩ জনে, এর মধ্যে আমাদের ছেড়ে গেছেন ১২ জন। সংখ্যাগুলো আশঙ্কাজনকভাবে তরতর করে বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবায় উন্নত দেশগুলো করোনা মোকাবেলায় যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে সেখানে আমাদের মতো রাষ্ট্রের যে কী পরিস্থিতি হতে পারে, তা ভাবতেই পারছি না। যেহেতু আমাদের দুর্বল স্বাস্থ্যখাত, আমাদের উচিত ছিলো করোনা প্রতিরোধে শক্ত অবস্থান নেয়া। যাইহোক, আমি আগেই বলে নিতে চাই, দেশের স্বাস্থ্যসেবার রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা,পলিসি এবং নীতি নির্ধারণী সম্পর্কে আমি তেমনটা জানি না। আমি সাধারণত সব সময় কৃষি ও কৃষক নিয়েই ভেবেছি। এখন এই দুঃসময়ে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে, একজন সচেতন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে যে সমস্যাগুলো দেখছি, মোকাবিলা করছি, অনুধাবন করছি সেগুলোই লিখছি।

চীনের উহানে করোনা ভাইরাসের প্রভাব দেখা দেয় গত বছরের ডিসেম্বরে। আর আমাদের দেশে প্রথম শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ডিসেম্বর বাদ দিলেও আমাদের হাতে সময় ছিলো দুটি মাস। এর মাঝেই বিশ্বে গণমাধ্যমের সহায়তায় করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা অবহিত হয়েছি। চীন কীভাবে করোনাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে, তাও আমরা দেখেছি। কিন্তু আমরা কি সেই অর্থে তেমন কোন প্রস্তুতি নিয়েছিলাম? আমি যতদূর জানি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ফেব্রুয়ারির তিন তারিখে করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশকে কী করতে হবে, এর একটি গাইডলাইন প্রদান করে। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে আমরা ৯দিন পর ইমিগ্রেশন পয়েন্টগুলোতে থার্মাল স্ক্যানের জন্য চিঠি প্রদান করতে পেরেছি। হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশনের জন্য কয়েকটি বেডের ব্যবস্থা করেছি বটে, ডাক্তার-নার্সদের পিপিই’র ব্যবস্থা করতে পারিনি। এমনকি আমরা ডাক্তার নার্সদের তাদের মাস্ক গ্লাভস নিজেদের ব্যবস্থার জন্য নোটিশ দিতে দেখেছি। যেখানে আমাদের ভাইরাসের আগে আগে ছোটা প্রয়োজন ছিলো, সেখানে আমরা খুব ধীর গতিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা অবাক হয়ে শুনেছি, ভাইরাস পরীক্ষার কীটের সংকট। আসল কথা হচ্ছে, আমরা বোধহয় ভেবেই নিয়েছিলাম, করোনা আমাদের দেশে আসবে না। গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারলাম, গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন পথে দেশে প্রবেশ করেছেন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। এই সাড়ে ছয় লাখ মানুষকে কে কি আমরা সঠিকভাবে স্ক্রিনিং করেছিলাম? ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি এক বন্ধুকে রিসিভ করতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম। ইমিগ্রেশন পয়েন্টে থার্মাল স্ক্যানার ছাড়া আর কোন পরীক্ষা বা ব্যবস্থাপনার কিছুই দেখিনি। শুধু তাই নয়, চীন থেকে আগত বেশ কয়েকজন আমাকে তখন জানিয়েছিলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা এয়ারপোর্টে বসেছিলেন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। কিন্তু স্বাস্থ্য পরীক্ষার করার জন্য কোন ডাক্তার বা কেউ উপস্থিত ছিলেন না, শেষে তারা কোনরূপ পরীক্ষা ছাড়াই বের হয়ে এসেছেন। এসব জেনে আমি আমার নিউজটিম দিয়ে টেলিভিশনে বেশ কিছু রিপোর্ট করিয়েছিলাম। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ইটালি বা অন্য দেশ থেকে যারা ফিরেছিলেন, আমরা কি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করতে পারতাম না? খোলা মাঠে তাবু খাঁটিয়ে হলেও কোয়ারেন্টিনে রাখা উচিত ছিলো। কিন্তু সে সময়ে আমরা খেয়াল করেছি আমাদের সরকারি কর্তাব্যক্তিদের ভেতর সমন্বয়হীনতা। যদিও বিদেশ ফেরত কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হলো আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে। সেখানকার অব্যবস্থাপনার কথাও আমরা শুনেছি। আমরা বোধ হয় এখন এই সমন্বয়হীনতা বা অব্যবস্থাপনার মূল্য দিতে যাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

আমরা কি জানি, স্বাস্থ্যখাতে আমাদের জন্য জনপ্রতি বরাদ্দ কত? ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট নামের এক সংগঠন তা হিসেব করে বের করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৭ কোটি ও উন্নয়ন ব্যয় ৯ হাজার ৯৩৬ কোটি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের ব্যয় বাবদ ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ও উন্নয়ন ব্যয় ২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। সুতরাং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ৯২% এবং জিডিপির ০ দশমিক ৮৯%। এ হিসাবে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জনপ্রতি বরাদ্দের পরিমাণ বছরে মাত্র ১৪২৭.৭৭ টাকা। আমরা কখনোই স্বাস্থ্যখাত নিয়ে চিন্তা করিনি। আমি কৃষকের স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে বহুবার বলার চেষ্টা করেছি। কৃষক বরাবরই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত, কৃষককে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনও কেউ করে তুলেনি। কৃষকের পেশাগত স্বাস্থ্যসমস্যাগুলো (অকুপ্যাশনাল হ্যাজার্ড) নিরসনে, গ্রামীণ মানুষকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবায় আওতায় আনার জন্য প্রতিবার কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেটের সুপারিশমালায় কৃষকের স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধির বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলে আসছি। যাইহোক, এখন অতীতে কী করা প্রয়োজন ছিলো, সেটা বলার চেয়ে কী করা উচিত সেটাতে ফোকাস করা দরকার। একবার ছুটি ঘোষণা করে লাখ লাখ শ্রমজীবি মানুষকে আমরা ঢাকা থেকে গ্রামে পাঠিয়েছি। আবার দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে অপরিসীম দুভোর্গের ভেতর দিয়ে তাদেরকে ঢাকায় আসতে বাধ্য করেছি। এদের মাঝে যদি কেউ করোনা আক্রান্ত থেকে থাকেন, তাহলে তারা গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষদের সংক্রমিত করে এসেছেন। আবার যদি তাদের গ্রামের কেউ আগে থেকেই আক্রান্ত থাকেন এবং তিনি তার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে আসেন, তবে এবার শহরের মানুষকে সংক্রমিত করবেন। অর্থাৎ এই অব্যবস্থাপনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের খবরও আমরা পেয়েছি। প্রতি মুহূর্তে বড় অনিরাপদ হয়ে উঠছে আমাদের সমাজ, মানুষ। সবচেয়ে বড় বিষয় সাধারণ মানুষ ভীত, সন্ত্রস্ত এবং তারা আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষকে আশান্বিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সেদিন নেটে বিবিসির একটা রিপোর্ট পড়ছিলাম, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির একশ বছর উপলক্ষে ২০১৮ সালে রিচার্ড গ্রে নামের একজন দীর্ঘ একটা আর্টিক্যাল লিখেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, আলাস্কায় স্প্যানিশ ফ্লু মারাত্মক আঘাত হানলেও সেখানকার কয়েকটি কমিউনিটি এই ফ্লু থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছিলো। কীভাবে সংক্রমণ এড়িয়েছিলো তা বের করতে গিয়ে জানা যায়, এই কমিউনিটিগুলো বাইরের সাথে সম্পূর্ণরূপে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলো। কেউ তাদের ওখানে প্রবেশ করতে পারেনি। কাউকে সেখান থেকে বাইরেও যেতে দেয়নি। একান্ত প্রয়োজনে বাইরে থেকে কাউকে আসতে হলে তাকে কোরাইনটিনে রাখা হতো। মহামারী ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে এর বিকল্প বোধ হয় কিছু নাই।

ইটালি, আমেরিকা, স্পেন, জার্মানির মত দেশ করোনার আক্রমণে নাজেহাল। সেখানে আমরা যদি এখনও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে না পারি তাহলে আমাদের পরবর্তীতে পস্তাতে হবে। চীন করোনা প্রতিরোধে যা করেছে আমরা তা করতে পারবো না। চীন প্রযুক্তিতে যতোটা এগিয়ে আমরা তার ধারে কাছেও নেই। চীন সরকারের কাছে তার নাগরিকের সুনির্দিষ্ট ডাটা আছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে তাদের গতিবিধি নির্ণয় করতে পেরেছে। আমরা সেটা পারবো না। এর বিকল্প আমাদের ভাবতে হবে। যেভাবেই হোক করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিকে সনাক্ত করে তাকে আইসোলেশনে আনতেই হবে। খুব দ্রুত ডাক্তার, নার্স এবং মেডিক্যাল টেকনেসিয়ানদের যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তৈরি করতে হবে। এই মুহূর্তে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে না। সাধারণ রোগেও চিকিৎসার অভাবে অনেকে মারা যাচ্ছেন। এ রকম পরিস্থিতি থেকে যেন আমরা বের হয়ে আসতে পারি সে বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।

আমি যেটুকু বুঝি, করোনা প্রতিরোধে টেস্টের কোন বিকল্প নেই। দ্রুত সময়ে কীভাবে অধিক সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করে আক্রান্তদের পৃথক করা যায় সে বিষয়টাতে জোর দিতে হবে। শুনেছি এ পরিস্থিতি থেকে পৃথিবীকে বেড় হয়ে আসতে কমপক্ষে দেড় বছর সময় লাগবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের স্বল্প মেয়াদী, মধ্যম মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। কিছু সিদ্ধান্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তাৎক্ষণিক নিতে হতে পারে। এর জন্য বড় অঙ্কের একটা বাজেটের প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মাঝে যেমন সমন্বয় প্রয়োজন, সরকারের সাথে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। যে কোন দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোন বিকল্প নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। হাতে সময় খুবই কম। সম্ভাব্য সংকট ও প্রতিকার আগে থেকেই ভেবে রাখতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সাহস যোগাতে হবে।

সরকার ইতোমধ্যে ৭২,৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই সংকট মুহূর্তে সাধারণ খেটে খাওয়া দিন মজুরের পাশাপাশি অনেক মানুষ অনিশ্চিত সময়ের ভেতর বসবাস করছে তাদের জন্য সরকারের উদ্যোগগুলো স্পষ্ট নয়, সেগুলো স্পষ্ট করা উচিত। তাদের স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। নাগরিকের সুশিক্ষা ও সুস্বাস্থ্য ব্যতীত কোন উন্নয়নই টেকসই হবে না।