চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: পুলিশের ৭৪১ সদস্য আক্রান্ত, ডিএমপিতে ৩৫৬

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সম্মুখযোদ্ধা বাংলাদেশ পুলিশে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। দেশজুড়ে কমপক্ষে সাড়ে ৭শ’ পুলিশ কর্মকর্তাসহ সদস্যদের দেহে কোভিড-১৯ এর নমুনা শনাক্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা সংকটের প্রথম থেকেই বিদেশফেরতদের অবস্থান শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাসপাতালে পাঠানো, ঘরে থাকা নিশ্চিত করা, ত্রাণ বিতরণ, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত থেকে শুরু করে করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফনসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজ্ঞাপন

ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নানা কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জনসাধারণ এবং আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে নিজেদের মধ্যেও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

শনিবার বিকেল পর্যন্ত পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সারাদেশে পুলিশের ৭৪১ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। শুধুমাত্র গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ২৩২ জনের দেহে কোভিড-১৯ এর নমুনা শনাক্ত হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন সদস্য। গত ২৪ ঘণ্টায় ডিএমপির ২৮ জন সদস্যের করোনা টেস্টে ফলাফল পজিটিভ এসেছে।

এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন পুলিশের ৫৭ জন সদস্য। এছাড়া, বর্তমানে ১৭৪ জন সদস্য আইসোলেশনে রয়েছেন এবং কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১ হাজার ২৫০ জন।

এখন পর্যন্ত করোনা প্রতিরোধে সম্মূখযোদ্ধা বাংলাদেশ পুলিশের আক্রান্ত পাঁচ কর্মকর্তা ও সদস্য মারা গেছেন।

তারা হলেন: পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) পশ্চিম বিভাগে উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুলতানুল আরেফিন (৪৪), বিশেষ শাখার (এসবি) এসআই নাজির উদ্দীন (৫৫), সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. আব্দুল খালেক (৩৬), কনস্টেবল জসিম উদ্দিন (৪০), ট্রাফিক বিভাগের কনস্টেবল মো. আশেক মাহমুদ (৪৩)।

এদের মধ্যে সর্বশেষ শনিবার সকালে উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুলতানুল আরেফিন রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

বিজ্ঞাপন

করোনায় পুলিশের কনস্টেবল পদমর্যাদার সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন: করোনা সংকটের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করছেন কনস্টেবলরা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের সৎকার কিংবা আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার কাজে সরাসরি কনস্টেবলরাই যুক্ত হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসায় তাদের নিজেদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ অবস্থায় কনস্টেবলদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা দরকার।

পুলিশ সদর দপ্তর বলছে: করোনাভাইরাসের বিষয়ে শুরু থেকেই পুলিশ সদস্যদেরকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান সুরক্ষা সামগ্রী তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রতিনিয়তই পাঠানো হচ্ছে। একইসঙ্গে আক্রান্তদের সর্বোচ্চ সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান: জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের দুই লক্ষাধিক সদস্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে থেকে মানুষকে নিরন্তর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য প্রথমত তাদের মধ্যে ব্যপকভাবে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত সেসব সচেতনতার বার্তার বিষয়ে সদস্যদের আপডেট করা হচ্ছে। এছাড়া, সিনিয়র কর্মকর্তারা নিয়মিত পুলিশ লাইনসে গিয়ে সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন।

পাশপাশি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মাস্ক এবং হ্যান্ডগ্লাভস বিভিন্ন নিরাপত্তা সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন পুলিশলাইনস এবং ব্যারাকগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমান জীবানুনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। অফিস এবং পুলিশ লাইনসের প্রবেশমুখগুলোকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যারাকে নিরাপদ দূরত্ব বজায়ে বেডগুলো রাখতে বলা হয়েছে।

একইসঙ্গে পুলিশ সদস্যদের পরিবারকেও সুরক্ষিত রাখতে নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যতোটা সম্ভব সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি সুচিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। এজন্য পুলিশ হাসাপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী এবং সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেল রানা বলেন: করোনা সংক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে পুলিশ যে দায়িত্ব পালন করে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, দেশ ও জনগণের প্রতি কমিটমেন্টের জায়গা থেকে পুলিশ সদস্যরা নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। ইতোমধ্যে আমাদের বেশকিছু সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এবং পাঁচজন গর্বিত সদস্য দেশের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। আমরা তাদের জন্য গর্বিত। বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যগণ তাদের এই ত্যাগকে, এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছেন এবং মনোবলের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন।

তিনি বলেন: পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান সুরক্ষা সামগ্রী তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রতিনিয়তই পাঠানো হচ্ছে। একইসঙ্গে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তারা যেন সর্বোচ্চ সুচিকিৎসা পান, সেটি নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। তাদের চিকিৎসার পাশাপাশি মানষিক শক্তি যেন অটুট থাকে সেজন্য ঊর্ধ্বতনরা খোঁজখবর রাখছেন।

পাশাপাশি ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। আমরা যে কোন মূল্যে বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা-সুচিকিৎসা এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিকর।

শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন: করোনাভাইরাস শনাক্তে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় হাজার ১৯৩ টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৮২৭ টি। সর্বমোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৭৬ হাজার ৬৬টি। নতুন যে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে তার মধ্যে আরও ৫৭২ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ফলে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ৭৯০। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মারা গেছেন আরও ৫ জন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৭৫ জনে। এছাড়া সুস্থ হয়েছেন আরও ৩। এর ফলে মোট সুস্থ হয়েছেন ১৭৭ জন।