চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: কেরালাসাফল্যে একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, একজন কর্মকর্তা

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হিমসিম খাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো যেখানে এ অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে অসহায়ত্ব বরণ করেছে, সেখানে অনেকাংশেই এখন পর্যন্ত সফল ভারতের একটি রাজ্য। ভারতের এই রাজ্যের নাম কেরালা। দেশটির অন্যান্য রাজ্য এবং বিদেশেও কেরালার এই মডেল প্রশংসিত হচ্ছে।

কেরালার এই সাফল্যের পেছনে সেখানকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং একজন কর্মকর্তার আন্তরিকতা ও কর্মদক্ষতার কথা তুলে ধরেছে বিবিসি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনায় কেরালার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই কর্মকর্তা বলতে গেলে অসাধ্য সাধন করেছেন। এজন্য ভারতের প্রথম করোনাক্রান্ত এলাকা কেরালায় এখনও আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যা খুবই কম।

বিজ্ঞাপন

ভারতে এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ। এ ভাইরাসে দেশটিতে মারা গেছেন ৪১৪ জন। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও কেরালায় আক্রান্ত শনাক্ত ৩৮৭, আর সেখানে মারা গেছেন মাত্র তিনজন। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্তরা দায়িত্বশীল হলে জনগণ কতোটা নিরাপদ থাকতে পারে এটা তারই উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন

কেরালার সফলতার এই সূত্র ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা বলেছেন তার এই অসাধ্য সাধনের কথা। তিনি জানান: ‌‘যখনই এই ভাইরাসের কথা শোনা যায়, তখন থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ২০১৮ সালে আরেক ভাইরাস নিপাহ আমাদের রাজ্যে ছড়িয়েছিল। ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল তখন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাই এবার আমরা অনেক আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, কীভাবে করোনার মোকাবেলা করা হবে। তাই জানুয়ারির শেষদিকে যখন প্রথম বিমানটি উহানে আটকিয়ে পড়া কেরালাবাসীদের নিয়ে এখানে নামল, আমরা প্রস্তুত হয়েই ছিলাম।’

চীন থেকে বাংলাদেশিদের দেশে আনার পর হজক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে রাখার পরও বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তে শিথিলতা ও অসচেতনতার খবর আমরা দেখেছি। কিন্তু সেখানে কেরালার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সেখানকার বিমানবন্দরেই প্রত্যেকের তাপমাত্রা মাপা হয়। যাদের সামান্য উপসর্গও দেখা গেছে, তাদেরই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেরালার বহু মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে থাকে, আবার বহু ছাত্রছাত্রী চীনেও পড়াশোনা করে। এদের সবার পরীক্ষা হয়েছে- যাদেরই অসুস্থতার লক্ষণ দেখা গেছে, তাদেরই কোয়ারেন্টাইনে রেখে চিকিৎসা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশেও অনেকেই করোনার তথ্য গোপন করেছেন। এমনকি তথ্য গোপন করে চিকিৎসা গ্রহণ করায় একজন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কেরালায়ও ঘটেছিল এমন ঘটনা। কেউ কেউ নিজেদের সফরের ইতিহাস লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আর পরীক্ষায় করোনা ধরা পড়েছে, তখনই সরকার প্রচুর লোকবল লাগিয়ে খুঁজে বের করেছে যে, তারা দেশে আসার পরে কোথায় গিয়েছিল, কোন কোন মানুষের সঙ্গে দেখা করেছে- সব কিছু। এই অসাধ্য সাধন করার ফলেই কেরালায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এত কম রাখা গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রাও।

এখানে উল্লেখ করার বিষয় হলো, কেরালার যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফলতার কথা আমরা বলছি, তিনি একজন নারী। নারীদের সফলতার কথা আমরা জানি। এর আগেও আমরা নারী রাষ্ট্র/সরকার প্রধানের সাফল্যের ইতিহাস দেখেছি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকালেও এই সফলতার চিত্র দেখা যায়। করোনা প্রেক্ষাপটে বিশ্ব পরিস্থিতির তুলনায় নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। এর আগে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও তিনি সফলতার সাথে মোকাবেলা করেছেন। কিন্তু আমাদের জন্য দুঃখের বিষয় হলো: প্রধানমন্ত্রী দক্ষতার সঙ্গে সবকিছু মোকাবেলার চেষ্টা করলেও আমাদের এমন দক্ষ ও আন্তরিক মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং কর্মকর্তার খুবই অভাব রয়েছে। এই বিষয়টি উপলব্ধি করেই প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রত্যেক জেলার দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করছেন। করোনা মোকাবেলায় এ কনফারেন্স অনেকটাই ফলপ্রসু হবে বলে মনে করি।

করোনাভাইরাস আমাদের নতুন করে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। মানবিকতার বিপরীতে অমানবিক বিষয়গুলো মর্মাহত করছে। অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরা যাক। অস্ট্রেলিয়া নিজেদের সভ্য দাবি করলেও সেখানে থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীসহ অভিবাসীদের কোনো ধরনের সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে কিংবা এখানকার জনগণ এতটা অমানবিক নয়। তবুও মায়ের করোনাভাইরাস হওয়ায় সন্তানরা তাকে গহীন জঙ্গলে রেখে যাওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। স্বজনদের অবহেলায় হাসপাতাল চত্বরে রোগীর মৃত্যুও হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এসব বিষয় শঙ্কা জাগিয়ে তোলে।

সেই ক্ষেত্রে কেরালায় আরও একটি বিষয় প্রশংসিত হচ্ছে। বিবিসি’র প্রতিবেদনে কেরালার এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের কথাও উঠে এসেছে। ভিন্ন রাজ্য থেকে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের খুব ভালোভাবে দেখাশোনা করছে কেরালা সরকার। দেশটির অন্যান্য জায়গায় যখন অন্য রাজ্য থেকে কাজে যাওয়া শ্রমিকরা কোনোমতে একবেলা খাবার পাচ্ছেন, তখন কেরালায় এই শ্রমিকদের বলা হচ্ছে ‘অতিথি শ্রমিক’। কেরালা সরকার তাদের জন্য চালু করেছে গণ রান্নাঘর। এইসব শ্রমিকদের সেখান থেকেই খাবার দেওয়া হচ্ছে। এতে বুঝা যায়, কেরালা সরকার মানবিকতার সব দিক থেকেই এগিয়ে রয়েছে।

করোনাভাইরাস নিশ্চয়ই একসময় পরাস্ত হবে। পৃথিবী আবার ফিরে পাবে তার চিরাচরিত কোলাহল আর কর্মচাঞ্চল্য। স্বীয় রূপে শিগগিরই আবির্ভূত হবে এই ধরা। তবে ‍দুর্যোগ মোকাবেলায় কেরালা যে সচেতনতা, দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা আর মানবিকতার সাক্ষর রাখলো তারা অন্যদের জন্য তো বটেই, আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, সাময়িক চাকচিক্য কিংবা মানব বিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র নয়, স্বাস্থ্য বিভাগসহ জননিরাপত্তা, সুরক্ষা ও মানবিকতার বিষয়গুলো আগামীর পৃথিবীতে নতুন করে প্রাধান্য পাবে বলেই আশা করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)