চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: কৃষি যন্ত্রায়ণ নিয়ে সমসাময়িক ভাবনা

দেশে মোট বোরো ধানের আবাদ হয়েছে এবার ৪১ লক্ষ ২৮ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে। হাওর অঞ্চলের ৭ জেলাতে (সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া) মোট আবাদকৃত জমির পরিমাণ ৯ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫৬৬ হেক্টর জমি যা মোট আবাদকৃত জমির ২৩ ভাগ। হাওরে ধান কাটা শুরু হয়ে এখন প্রায় ৮০ ভাগের উপরে ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এই করোনা মহামারীর আক্রমণের সময়ে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কাটার কাজটি সম্পন্ন হতে সহায়তা করেছে। কৃষিমন্ত্রী, জননেতা ও কৃষিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়ে এই প্রায় আসন্ন সংকটকে রুখে দিয়েছেন। বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক দল কৃষকদের সহায়তা করেছেন তাদের মতো করে, সকলকে আমার তরফ থেকে ধন্যবাদ ও কাজটি সফল করবার জন্য অভিনন্দন।

আমরা যদি একটু বিষয়ের গভীরে যাই তবে দেখি গবেষণাতে পাওয়া গেছে ১ হেক্টর জমির ধান কর্তন করতে গড়ে ২০-২৫ জন শ্রমিক প্রয়োজন হয়, সেখানে এই প্রায় সাড়ে ৯ লক্ষ হেক্টর জমির ধান কাটতে প্রায় ১৯-২০ লক্ষ শ্রমিকের শ্রম যুক্ত। ধান কাটবার মৌসুম ১৫-২০ দিন ব্যাপী এবং সবখানে একসাথে না হওয়াতে এই বিপুল শ্রমিকের শ্রম দৃশ্যমান হয় না বা নাগরিক দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। কিন্তু প্রচণ্ড শ্রমঘন ও গুরুত্বপূর্ণ ফসল কর্তনের বিষয়টি জাতির খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ধান কাটবার পর থেকে সেটাকে চাল করে ভাত হয়ে আমাদের টেবিলে আসতে মাঝে আরো অনেকগুলো শ্রমঘন পর্ব পার হতে হয়। কর্তনের পর ধান মাড়াই, মাঠ থেকে কৃষকের উঠানে আসা, ঝাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ সেই ধাপগুলোর প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হেক্টর প্রতি এই কাজ গুলো করতে আরো প্রায় ২০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয় আমাদের শ্রমিক দিয়ে করতে। ধন্যবাদ দিয়েছি প্রথমে, কারণ এই বিপুল শ্রমিকের বিষয়টি মাথায় রেখে এই দুর্যোগকালে আমাদের সরকার শ্রমিকের পরিবর্তে যন্ত্রে আস্থা রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

ধান কাটবার জন্য সাধারণত আমাদের দেশে যে যন্ত্র জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তার নাম রিপার। এই যন্ত্র দিয়ে ঘণ্টায় ১ বিঘার উপর জমির ধান কাটা যায়। জমিতে ধান কাটবার পর তা সারি করে জমিতে পরে ও পরে তা তুলে আঁটি বেঁধে মাড়াই এর জন্য বহণ করা হয়। আরেকটি যন্ত্র মাত্রই ব্যবহার শুরু করেছি আমরা, সেটাও সরকারের প্রণোদনার ফলেই সম্ভব হয়েছে যার নাম কম্বাইন হারভেস্টার। একটি কম্বাইন হারভেস্টার দিনে ৬ হেক্টর জমির ধান কেটে, মাড়াই, ঝাড়াই করে বস্তা বন্দী করতে পারে যা পরবর্তীতে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষন করা যায় বা চাল করতে ব্যবহার করা যায়। রিপার ও কম্বাইন চালাতে একজন দক্ষ অপারেটর ও একজন বা দু’জন সহকারী প্রয়োজন হয়। রিপার যন্ত্রকে চালানোর জন্য পিছনে অপারেটরকে হাঁটতে হয়ে, কম্বাইন হারভেস্টরে অপারেটর যন্ত্রের উপর বসে যন্ত্রকে চালাতে পারে।

মহামারী করোনা শুধু হাওরের ফসল কাটাতে শ্রমিক পরিবহণ ও শ্রমিক ব্যবস্থাপনাতে সমস্যা করেনি, বাকী ৭৫% জমিতে যে বোরো ফসল বর্তমানে আছে তার কর্তন ও কর্তন পরবর্তী কাজের জন্যও তা সমস্যা। হাওরে আমরা একটা শিক্ষা অর্জন করেছি এবং একই সাথে আমাদের কৃষক ভাইদের প্রতি আমাদের চিরকালের মতো আস্থা আছে যে উনারা বাকী ৭৫ ভাগ জমির ধানও কর্তন করতে পারবেন। কিন্তু এই কাজের জন্য যন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ করতে হবে। হাওরে বরাদ্দকৃত নতুন ১৮০ কম্বাইন হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার যন্ত্রকে কাজে লাগাতে হবে, সেইসাথে পূর্বের ২২০টি কম্বাইন হারভেস্টার সহ এক হাজারের উপর রিপারকে ব্যবহার করতে হবে। সহজ ভাবে, শ্রমিক পরিবহণ না করে যন্ত্রকে পরিবহণ করতে হবে যেখানে পাকা ধান আছে সেখানেই। আগামী সপ্তাহখানেকের মাঝে দেশ জুরে ধান কর্তন পুরোদমে শুরু হবে, সময় তাই কম।

কৃষিতে যন্ত্রায়ণ বা যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে ভাববার সময় আমাদের এখানে সবচেয়ে বড় ভুল করা হয় যা তা হলো– যন্ত্র হলেই তো হয় এমন ভাবনা। এর ফলে নানান বিষয় ও ভাবনার লোক যন্ত্র নিয়ে বলে, তাদের কারো কারো হাতে আবার উচ্চস্বরের যন্ত্রও থাকে ফলে তাদের দৌড়াত্বে আসল কথাগুলো হারায়। কৃষককে একগাদা যন্ত্র দিলেই সেটা কৃষি যন্ত্রায়ণ না, এই বোধটা জরুরী। সারা বিশ্বে স্বীকৃত একটি উচ্চ ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা এটা, যদিও আমাদের এখানে অবহেলিত। সুতরাং যন্ত্রায়ণ নিয়ে ভাবনার সুযোগ প্রচুর এবং প্রয়োজন বিষেশায়িত প্রতিষ্ঠান ও মানবসম্পদ। আমাদের বিষেশায়িত প্রতিষ্ঠান আছে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগসহ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বিভাগ আছে। এছাড়াও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম আছে কৃষি যন্ত্রায়ণে। করোনা মহামারীকে সামনে রেখে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই সামগ্রিক ভাবনার প্রয়োজন। গবেষণার সুযোগ তৈরী করা প্রয়োজন হাওর অঞ্চলের জন্য যন্ত্রায়ণে করণিয় কী তা জানতে নতুবা পদ্ধতিগতভাবে আমরা মজবুত অবস্থানে পৌছাতে ব্যর্থ হবো আর ফি বছর একই ঘটনার জন্ম হবে। করোনা সামনে রেখে এই পরকিল্পনা আমাদের নিতে হবে দীর্ঘ মেয়াদী কাজের অংশ হিসাবে।

বিজ্ঞাপন

হাওর অঞ্চল যেহেতু ভূতাত্বিক ভাবে ভিন্ন, তাই দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পেতে সকল প্রকৌশল কাজ ও গবেষণা স্বতন্ত্র হাওর প্রকৌশল বিভাগ (কৃষি মন্ত্রণালয় ভুক্ত হবে) গঠন করা যেতে পারে। বাঁধ, কৃষি আধুনিকায়ন ও যন্ত্রায়ণ, কৃষি বাণিজ্য সহ তথ্য প্রযুক্তি এবং সমবায় যার কাজের আওতায় থাকবে। এ ক্ষেত্রে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা (বিএমডিএ) বা পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ) বগুড়া মডেল হতে পারে বা পর্যাপ্ত স্টাডির মাধ্যমে উক্ত অঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ ও কাজের সুযোগ নির্ধারণ করে মডেল প্রকল্প স্থাপন করা যেতে পারে। সেচ ও কৃষি উপকরণ বিষয়ে বিএডিসির অবদান অনস্বীকার্য, তাই তাদের কার্যক্রম আরও বিস্মৃত করতে হবে তাদের স্ব-ক্ষেত্রে এই হাওর অঞ্চলে।

আগামী আমন মৌসুমের জন্য আমাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। আমন মৌসুমে শ্রমঘন কাজ হলো বীজ রোপণ। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্র ব্যবহার করে এই কাজটি সহজভাবে ও দ্রুত করা যায়, যাতে খরচ সাশ্রয় হয় ৫০ ভাগ প্রায় প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে। যেহেতু এই প্রযুক্তি দেশে খুব বেশী প্রচলিত না ও একদমই নতুন তাই প্রয়োজন ধাপে ধাপে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করা। বীজতলা প্রচলিত বীজতলার চেয়ে আলাদা বিধায় প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। আগামী আমন মৌসুম থেকে দক্ষতা সম্পন্ন দল করে (প্রতি জেলাতে কমপক্ষে ১টি) তাদের মাধ্যমে সরেজমিনে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করা সম্ভব। পাশাপাশি দক্ষতা সম্পন্ন কৃষকদের ধানের বীজতলার নার্সারী তৈরীর জন্য প্রনোদনা প্রদান করা প্রয়োজন। সরকার ইতিমধ্যে ৪% হারে কৃষি লোন প্রদানের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেখান থেকে কৃষক সংগঠনগুলোকে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে এবং যন্ত্র সরবরাহে আমদানী কারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে কৃষি সহায়তায় প্রদানকৃত যন্ত্র কিনবার মূলধন সরবরাহ করা যেতে পারে। ৪% হারে বরাদ্দকৃত টাকার একটা অংশ কৃষি যন্ত্র প্রস্তুতকারক, আমদানীকারক ও লোনে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান যন্ত্র বিক্রি করে তাদের বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। সেই সাথে এসব প্রতিষ্ঠান যেনো সিঙ্গেল ডিজিট সুদে উদ্যোক্তাদের কাছে যন্ত্র বিক্রি করে তা সুনির্দিষ্ট করা যেতে পারে। প্রণোদনা কৃষক সংগঠনগুলোর জন্য বিশেষভাবে বিতরণের ব্যবস্থা করা হলে সমবায়ের প্রতি কৃষকরা আকৃষ্ট হতো এবং সেই সাথে উৎপাদন বৃদ্ধি, বিপণণ ব্যবস্থায় শৃংখলা, নুন্যতম লজিস্টিক ব্যবহারসহ সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে কয়েকগুণ, বিতরণকৃত লোনের টাকাও সময়মতো আদায় করা সহজহতো বিতরণকারী ব্যাংকগুলোর জন্য যা যন্ত্রায়ণের একটি সুষম পরিবেশ তৈরী করতে সহায়ক হবে।

স্বল্প মেয়াদে কৃষকদের কোরোনা প্রতিরোধক স্বাস্থ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ যন্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত অডিও ভিজ্যুয়াল সামগ্রী সরবরাহ করে সচেতন করা যেতে পারে। সেই সাথে বাড়ির উঠানে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় ছোট যন্ত্র সহ বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ করা প্রয়োজন।

করোনার ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষি বিপণন ব্যবস্থা। পোল্ট্রি সেক্টর বড় রকম ক্ষতির সম্মুখীন নানান গুজব এর কারণে যার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা জরুরী। দুধের দাম একদমই নাই, খামারীদের পনির, মাখন, ঘি তৈরীর উপর প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্র সরবরাহ করা প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য কল সেন্টার স্থাপণ সহ ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাপণা স্থাপন প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে মোবাইল মানি ট্রান্সফার ব্যবস্থার কমিশন রেইট কমানো অতীব জরুরি। বাজার ব্যবস্থার অটোমেশন কৃষি যন্ত্রায়ণের বড় একটি কাজ, ভ্যালু চেইন গবেষণা করে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করা প্রয়োজন।

করোনা এক সময় চলে যাবে, আমাদের কৃষক ফলে ফসলে হাসবে এই প্রত্যাশা সবসময়। সবার সমন্বিত চেষ্টা ও কাজ দ্বারাই এই সংকটে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, আসন্ন ক্ষুধার লড়াইয়ে আমরা জয়ী হবো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)