চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন স্মরণে ‘শূন্যতায় তুমি’

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। তার প্রয়াণের চল্লিশ দিন পূর্ণ হলো শুক্রবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। এদিন তাকে নিয়ে স্মরণ সভার আয়োজন করে আনন্দ আলো।

শুক্রবার বিকেলে চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে আয়োজিত এই স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু, শিল্পী খুরশীদ আলম, কবি হাসান হাফিজ, কবি আসলাম সানী, অন্য প্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম, লেখক আমীরুল ইসলাম, পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, শিশু সাহিত্যিক আনজির লিটন, আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান, কণ্ঠশিল্পী কোনাল সহ শিল্পসাহিত্য অঙ্গণের গুণীজন।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

স্মরণ অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত লেখিকার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করেন অতিথিরা। রাবেয়া খাতুনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে সেলিনা হোসেন বলেন, রাবেয়া আপা ছিলেন আমার কাছে এক সাহসের নাম। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, তখন তার ‘মধুমতি’ উপন্যাসটি পড়ে আমি আলোড়িত হয়েছিলাম। তিনি এই উপন্যাসটিতে যেভাবে বাংলার জনজীবনকে তুলে ধরেছিলেন, সেটা তখনকার সাহিত্যে বিরল। আমি তখন থেকেই রাবেয়া আপাকে গুরু মনে করতাম।

সেলিনা হোসেন বলেন, ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে যেভাবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু পড়েছি; আমি মনে করি একই স্রোতের ধারায় লালসালুকে যেভাবে আমরা চিহ্নিত করি, শওকত ওসমানের জননীকে যেভাবে চিহ্নিত করি, শামসুদ্দিন আবুল কালামের বই কিংবা আবু ইসহাকের সূর্যদীঘল বাড়িকে যেভাবে চিহ্নিত করা হয়- একইভাবে রাবেয়া আপার মধুমতির নামটিও এসে যায়।

‘সাগরের মা ই ছিলো আমাদের সবার মা। তিনি আমাদের কাছে ছিলেন একটা বটগাছের মতো।’- স্মরণ অনুষ্ঠানে রাবেয়া খাতুনের সাথে ব্যক্তিগত মধুর কিছু স্মৃতির কথা এভাবেই উল্লেখ করেন শাইখ সিরাজ।

পাশাপাশি সাহিত্য ও সমাজে রাবেয়া খাতুনের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আজকে বাংলা সাহিত্য যে অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যদি নারী স্বাধীনতার কথা বলি- তাহলে রাবেয়া খাতুন, জুবাইদা গুলশান আরা, সেলিনা হোসেন সহ আরো যারা সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে লিখে আসছেন, তাদের অবদান সবার উপরে। কারণ আজকে যে নারী স্বাধীনতা দেখছি, তার ভিত কিন্তু লেখনীর মাধ্যমে তারাই ধীরে ধীরে তৈরী করেছেন।

বিজ্ঞাপন

রেখে যাওয়া সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন বলে মন্তব্য করেন রাবেয়া খাতুনের জামাতা মুকিত মজুমদার বাবু। পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি বলেন, প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক ভোলার নয়। কিন্তু আমরা শোককে শক্তিতে পরিণত করে সেই মানুষটির চিন্তা ভাবনা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। সৃষ্টিশীল মানুষের মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিকর্মের মধ্যে। আমরা যেন তাকে সেভাবেই স্মরণ রাখি।

বক্তৃতায় অন্য প্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম জানান, অন্য প্রকাশ থেকে শিগগির রাবেয়া খাতুনের উপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ হবে।

শুধু সাহিত্য নয়, রাবেয়া খাতুন চলচ্চিত্রকেও সমৃদ্ধ করেছেন। অতীতে যেমন তার গল্পে বেশকিছু নাটক সিনেমা নির্মিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও সে ধারা অব্যাহত রাখার কথা বলেন পরিচালক সমিতির সভাপতি গুলজার।

১৯৩৫ সালে বিক্রমপুরে জন্ম গ্রহণ করেন রাবেয়া খাতুন। লেখালেখির পাশাপাশি শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতাও করেছেন তিনি। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথাসহ চলচ্চিত্র ও নাট্য জগতেও বিচরণ রাবেয়া খাতুনের। তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মেঘের পরে মেঘ’ জনপ্রিয় একটি চলচ্চিত্র। ‘মধুমতি’ এবং ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টিও প্রশংসিত হয়েছে সব মহলে। তার স্বামী প্রয়াত এটিএম ফজলুল হক ছিলেন দেশের চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রথম পত্রিকা সিনেমার সম্পাদক ও চিত্রপরিচালক। বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’ এর পরিচালকও তিনি। ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই এটিএম ফজলুল হক ও রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তানের মধ্যে রয়েছে ফরিদুর রেজা সাগর, কেকা ফেরদৌসী, ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী।

বাংলা একাডেমি, চলচ্চিত্র জুরী বোর্ড, লেডিস ক্লাব, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, মহিলা সমিতিসহ অসংখ্য সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন রাবেয়া খাতুন। তার প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা একশ’রও বেশি।

সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক (১৯৯৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৩), নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯৫), হুমায়ূন স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৯), কমর মুশতারী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৯৪), শের-ই-বাংলা স্বর্ণপদক (১৯৯৬), ঋষিজ সাহিত্য পদক (১৯৯৮), লায়লা সামাদ পুরস্কার (১৯৯৯) ও অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯)। ছোটগল্পের জন্য পেয়েছেন নাট্যসভা পুরস্কার (১৯৯৮)। সায়েন্সফিকশন ও কিশোর উপন্যাসের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন শাপলা দোয়েল পুরস্কার (১৯৯৬), অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার (১৯৯৮), ইউরো শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৩)। ছোটগল্প ও উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে প্রেসিডেন্ট (১৯৬৬), কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (২০০৩), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), ধ্রুবতারা, মধুমতি (২০১০)।

টিভি নাটকের জন্য পেয়েছেন টেনাশিনাস পুরস্কার (১৯৯৭), বাচসাস (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কার, বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড (২০০০), টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ডসহ (২০০০) তিনি এ পর্যন্ত অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।