চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ওরা ১১ জন’ অভিনেত্রী নূতন বললেন, এ ছবি তাঁর আত্মার অংশ

জনপ্রিয় অভিনেত্রী নূতন বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত ‘ওরা ১১ জন’ ছবিটি বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত একখন্ড বাংলাদেশ। ঘৃণ্য পাক হানাদারদের আক্রমণের বিরুদ্ধে বাংলার তরুণরা কিভাবে লড়াই করেছিল তা এই এক ছবি দিয়ে অনুভব করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘ওরা ১১ জন’-এর মতো ছবি নির্মিত হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উৎসাহ ও সহযোগিতার কারণেই। এই চলচিত্রটির মাধ্যেমে সাধারণ জনগণ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দেখতে পায়। যুগ যুগান্তর ধরে এদেশের ত্রিশলক্ষ শহীদের ত্যাগ ও রক্তাক্ত গৌরবের কথা বলবে এই ছবিটি। ‘ওরা ১১ জন’ ছবির অন্যতম অভিনেত্রী তিনি। বিজয়ের মাসে চ্যানেল আই অনলাইন-এর কাছে বলেছেন ৪৯ বছর আগে মুক্তি পাওয়া সেই ঐতিহাসিক ছবি নিয়ে নিজের অনুভূতি কথা।

স্বাধীনাত্তোর বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘ওরা ১১ জন’। এই ছবির নাম শুনলেই আমাদের সবার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত বেদনা ও বিজয়ের বিষাদময় গল্প। এই একটি ছবি দেখেই ৫০ বছর আগে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের জীবন্তচিত্র এখনও খুঁজে পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিটি তাই যুগ যুগ ধরে চিরায়ত হয়ে আছে। এই ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনবদ্য প্রামাণ্য দলিল। ‘ওরা ১১ জন’-এই ছবি দেখলে এখনও দর্শকদের চোখ ভিজে ওঠে।

‘ওরা ১১ জন’ ছবিটি নির্মাণ করেন বিখ্যাত পরিচালক প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলাম। প্রযোজনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেই সময়কার ছাত্রলীগ নেতা মো. মাসুদ পারভেজ, যিনি নায়ক সোহলে রানা হিসেবে সর্বজনে পরিচিত। ছবিটি মুক্তি লাভ করে ৭২ সালের ১৩ আগস্ট। ‘ওরা ১১ জন’ ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন খ্যাতিমান বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুল আলম খান খসরু। মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি ঢাকা অঞ্চলের গেরিলা কমান্ডার ছিলেন। তাঁর সাথে আর যে অন্য ১০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা অভিনয় করেন তাঁরা হলেন- মঞ্জু, অলীন, হেলাল, আবু, আতা, নান্টু, বেবী, মুরাদ, আলতাফ এবং ফিরোজ। এর পাশাপাশি ‘ওরা ১১ জন’ ছবিটিতে তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন নায়ক রাজ রাজ্জাক, শাবানা এবং নূতন। এ ছাড়াও এই ছবিতে অভিনেত্রী রওশন জামিল, মিরানা জামান, সুমিতা দেবী, গুণী অভিনেতা মেহফুজ, সৈয়দ হাসান ইমাম, খলিল, রাজসহ অন্যান্যরা অভিনয় করেন। ছবিতে রাজাকারের চরিত্রে অভিনয় করেন এ.টি.এম শামসুজ্জামান। ছবিটির সঙ্গীত পরিচালনা করেন প্রখ্যাত সুরকার খোন্দকার নূরুল আলম। ছবিটিতে মোট ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘আমায় একটি ক্ষুদিরাম দাও বলে কাঁদিস না মা’, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’-এই তিনটি গান ব্যবহার করা হয়। ৭২ সালে এই ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার লাভ করে।

এই ছবিতে নায়ক খসরুসহ অন্য যাঁরা অভিনয় করেন তাঁদের সবাই ছিলেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা। ‘ওরা ১১ জন’ ছবির শুটিং হওয়ার কিছুদিন আগে যারা যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে আসেন। কয়েকজন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধন্যও। এই ছবির পরিচালক, কলাকূশলীদের অনেকেই বেঁচে নেই। পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, নায়ক রাজ্জাক, অভিনেত্রী রওশন জামিল, সুমিতা দেবী, অভিনেতা মেহফুজ, খলিলসহ অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন। প্রয়াত হয়েছেন ‘ওরা ১১ জন’ ছবির সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ।
এই ছবির অন্যতম একটি চরিত্রে অভিনয় করেন আমাদের সিনেমার সোনালী যুগের জনপ্রিয় নায়িকা নূতন। ছবিতে তিনি নায়ক রাজ্জাকের ছোট বোন (শীলা), যিনি পাক হানাদার কর্তৃক ধর্ষিতা হন। নায়ক খসরু যাকে ভালোবাসতেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি হানাদারদের নির্যাতন থেকে মুক্তি পেলেও ক্ষোভ আর অপমানে প্রিয় মানুষ খসরুর হাতের উপরে মারা যান।

একাত্তরের আগেই অভিনেত্রী নূতনের চলচিত্রে অভিষেক ঘটে। ‘নতুন প্রভাত’ নামে একটি ছবিতে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখেন। বড় বড় তারকার ভীড়ে ভীষণ আকর্ষণীয়া আর মায়াময় চেহারার নূতন তখন অনেকটাই অচেনা। কিন্তু ‘ওরা ১১ জন’ মুক্তি পাওয়ার পর অভিনেত্রী নূতন যেনো আরও নূতন রুপে আবির্ভূত হন। দ্রুতই দর্শকদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। শুধু পরিচিতি নয়, অপূর্ব অভিনয় শৈলী দিয়ে দর্শকদের মনও জয় করেন। তাঁর অভিনয় দেখে সিনেমা হলে বসে সে সময় অনেকেই কেঁদেছেন। শেষ দৃশ্যে নূতনের অভিনয়কে আর অভিনয় মনে হয়নি, সবার কাছেই মেন হয়েছে এটি যেনো তাদেরই পরিবারের কোনো এক নির্যাতিত বোন।

বিজ্ঞাপন

সেই ৪৯ বছর আগে অভিনয় করা মুক্তিযুদ্ধের এই অনন্য ছবিটি হৃদয়ের মধ্যে ধরে আছেন অভিনেত্রী নূতন। এই ছবির কথা তিনি কখনই ভুলতে পারেন না। এই ছবির কথা স্মরণে আনলেই আবেগাপ্লুত হন। এই ছবি নিয়ে প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বলেন, ‘এই ছবিটিইতো আমাদেও প্রিয় বাংলাদেশ। এই ছবির ঘটনাবলীর মধ্যেই এদেশ আমরা কীভাবে পেয়েছি তা বিস্তৃত হয়েছে। এই ছবিটি এক অনন্য ইতিহাস। আমি গর্বিত যে আমি এই ইতিহাসের অংশ। এই ছবি আমার আত্মার অংশ। জীবনের যত অর্জনই থাক এই ছবিতে আমার আবদানটুকু আমার জীবনের সেরা অলংকার। এই ছবিটিকে আমি হ্নদয়ে ধারণ করি।’ অভিনেত্রী নূতনের কাছ থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি ঢাকাতেই ছিলেন অভিনেত্রী সুমিতা দেবী’র বাসায়। কিন্তু সুমিতা দেবী একসময় সিদ্ধান্ত নেন তিনি ভারতে চলে যাবেন। বিষয়টি নূতনকে বলেন। তখন নূতন সিদ্ধান্ত নেন তিনি ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়াতে নিজ বাসাতে চলে যাবেন। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি মায়ের কাছে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধে শেষে তিনি ফিরে আসেন ঢাকাতে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের হূমায়ূন রোডে সুমিতা দেবীর কাছে চলে আসেন। স্মৃতি আওড়িয়ে বলেন, ‘এই ছবিটিতে আমাকে কাস্ট করার আগে প্রযোজক মাসুদ পারভেজ ভাই এবং চাষী ভাই সুমিতাদি’র বাসায় আসেন। আমাকে উনারা দেখেন, কথা বলেন। উনারা বুঝতে পারেন শীলা চরিত্রের সাথে আমি মানানসই। আর আমিও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একজন। চোখের সামনে সব ঘটেছে। আমার মধ্যেও প্রচন্ড আবেগ। উনারা আমাকে চূড়ান্তভাবে কাষ্ট করেন। স্ক্রিপ্ট পড়ার পর চাষী ভাইয়ের ডিরেকশনে আমি আমার চরিত্র নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে থাকি। আসলে তখন অন্যদের মতো আমারও চোখে-মুখে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। ভয়, আতংক মন থেকে মুছে যায়নি। এরপর শুরু হলো শুটিং পর্ব।’ নূতন জানান তিনি সাভার এবং এফডিসির ২ নম্বর ফ্লোরের পেছনেসহ বিভিন্ন জায়গাতে শুটিং এ অংশ নেন। এই ছবিকে জীবন্ত করতে সবাইকে অনেক কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়েছে। ছবিতে গোলাবারুদের ব্যবহারে কোনা কৃত্রিমতা ছিল না। সবই ছিল বাস্তব। ফলে অনেক ঝুঁকি নিয়ে সবাইকে শুটিং-এ অংশ নিতে হয়। যুদ্ধের বিভিন্ন অংশে আসল অস্ত্রই ব্যবহার করা হয়েছে। নূতন বলেন, ‘যুদ্ধের পরপরই চাষী ভাই কতো না পরিশ্রম করে এই ছবিটি বানালেন। এই ছবিতে অন্যতম বিষয় ছিল ঐতিহাসিক ৭ মার্চে দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ সংযোজন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চেও ভাষণ সংযোজনের ফলে ছবিটি আরও পরিপূর্ণতা লাভ করে। ছবির মধ্যে ভীষণ রকম একটি গতি তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় কথা পুরো ছবিটির মধ্যেই দর্শক তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী দেখতে পেয়েছে। ফলে দর্শকদের অনুভূতিতে একাকার হয়ে গেছে ছবিটি।’

ছবির ওরা ১১ জন সম্পর্কে নূতন বলেন, ‘আসলে আমার মনে হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরু ভাইসহ অন্য বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ এই ছবিতে অভিনয় করতে আসেননি, উনারা যুদ্ধের বাস্তব চিত্রই তুলে ধরতে এসেছেন। সেটাই করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধদিনের বিষাদময় ঘটনা, ত্যাগ, বিজয় এবং অন্যান্য বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে রণাঙ্গনের চেয়েও এখানে তাঁদের বেশি কষ্ট করতে হয়েছে। তাঁরা সেই কষ্ট-শ্রমের মূল্যও পেয়েছেন মানুষের কাছ থেকে।’ ‘ওরা ১১ জন’ ছবি সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে অভিনেত্রী নূতন বলেন, ‘‘এই ছবি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাসটা সেলুলয়েডের ফিতায় ধরে রাখা। সেখানে শতভাগ সফল হন প্রখ্যাত পরিচালক শ্রদ্ধেয় চাষী নজরুল ইসলাম। এ কারণেই এই ছবিটি কালজয়ী। ছবিটি মুক্তি পাবার পর চাষী ভাই আমার অভিনয়ের প্রচন্ড প্রশংসা করেন। বারবার আমাকে বলতেন, তুই যে অভিনয় করেছিস তা বলার মতো নয়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘এই ছবি করার আগে বারবার আমার হৃদয়ে অন্তরে প্রতিধ্বনিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ, তাঁর অনড় উদাত্ত আবার হ্নদয়স্পর্শী সেইÑআহ্বান ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব..। তাঁর জন্যই আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। সেই মানুষটিকে সবসময় স্মরণ করি। তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর আহব্না আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে।’

নূতনের মতে, ‘ওরা ১১ জন’ ছবি তাঁর আত্মার অংশ। যখনই এই ছবির কোনো ক্লিপ দেখেন, গান শুনেন, তিনি ফিরে যান একাত্তরে। এই ছবির সাথে তাঁর যে আত্মিক বন্ধন তা তাঁকে সব সময় রোমাঞ্চিত করে। তিনি মনে করেন প্রয়াত সুমিতা দেবী, পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, মাসুদ পারভেজ-এর সহযোগিতা না পেলে এই অবিস্মরণীয় ইতিহাসের অংশ তিনি হতে পারতাম না।

সবশেষে নূতন বলেন, ‘‘কালজয়ী ‘ওরা ১১ জন’ ছবির কলাকূশলী, অনেকেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। শ্রদ্ধেয় পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, সঙ্গীত পরিচালক খোন্দকার নুরুল আলম, চিত্রগ্রাহক আব্দুস সামাদ, শ্রদ্ধেয়া সুমিতা দেবী, রওশন জামিলসহ অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী আর নেই। ওরা ১১ জনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেও চলে গেছেন। বেঁচে থাকতে নান্টু ভাই, মুরাদ ভাই এর সাথে দেখা হতো, কথা হতো। নান্টু ভাই, মুরাদ ভাইও মারা গেছেন। খসরু ভাইসহ কারো সাথেই এখন আর দেখা হয় না। এই ছবির প্রতিটি কলাকূশলী এক একটা ইতিহাস। আমিও একদিন চলে যাব। আমরা সবাই চলে যাব। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় পাতায় যুগযুগান্তর ধরে থাকবে ‘ওরা ১১ জন’ ছবির মর্মস্পর্শী ঘটনা।’’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন