চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এরশাদকে কি ক্ষমা করা যায়?

মৃতের প্রতি আমাদের রয়েছে এক সহজাত সহানুভূতি। আমরা মনে করি একটি লোক মরে গেলে তার সঙ্গে যাবতীয় স্বার্থের লেন-দেন শেষ হয়ে যায়। কাজেই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। আমাদের দেশের মানুষ এমনিতেই একটু বেশিই ক্ষমাশীল। এদেশে চোর-ছেঁচোর-লম্পট-গুণ্ডা-বদমাশ-খুনি-পাপী-তাপী সবাই খুব সহজেই ক্ষমা পেয়ে যায়। জীবদ্দশায় তবু খানিকটা রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা জমা থাকে, কিন্তু মরে গেলে সব কিছু তরল হয়ে যায়। সবাই ক্ষমা পেয়ে যায়। অনেকে তো নরঘাতকের জন্য চোখের জল পর্যন্ত ফেলে!

‘স্বৈরশাসক’ হিসেবে চিহ্নিত এরশাদের মৃত্যুর পরও অনেকের মধ্যে এক ধরনের সহানুভূতি, ক্ষমা করার মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকে এমনটাও বলছেন, লোকটা তো চলেই গেছে, তাকে নিয়ে আর সমালোচনা কেন?

বিজ্ঞাপন

সত্যিই কি এরশাদের মৃত্যু শুধুই ‘চলে যাওয়া?’ জীবদ্দশায় তিনি যা করেছেন, বাঙালি জাতির যে ক্ষতি করেছেন, যত মানুষকে হত্যা করেছেন, যে লুটপাট চালিয়েছেন, তার কি কোনোই হিসাব হবে না?

এরশাদ কী ছিলেন, কত বড় স্বৈরাচারী ছিলেন, আশির দশকে এরশাদের শাসন যারা দেখেননি, তারা কল্পনাও করতে পারবেন না।

অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ যথার্থই বলেছেন, ‘‘আশির দশকের শুরু থেকেই ভালো করে ঘুম হচ্ছিল না বাঙালির, দুঃস্বপ্নের মধ্যেই কাটছিল দিন রাত; বিরাশির চব্বিশে মার্চের ভোরে দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে বাঙালি পড়ে আরেক দুঃস্বপ্নে…সেই শুরু হয় বাংলাদেশের কালরাত্রি;

ওই কালরাত্রির নাম এরশাদ, বাঙলার ইতিহাসের ঘৃণ্যতম নামগুলোর একটি; আর বাঙালি জীবনের প্রায় একটি দশক, আট বছর আট মাস তের দিন কেটে যায় কালরাত্রির গ্রাসে। যা কিছু অশুভ তার সব নিয়ে সে আসে; আশির দশকে বাংলাদেশে চরম অশুভ মানুষের মুখোশ পরে দেখা দিয়েছিল তার নাম এরশাদ।

বাঙলায় বলতে পারি অশুভ বা কালরাত্রি। তার কাছে কোন কিছু পবিত্র ছিল না, তাই সব কিছু সে অপবিত্র করে গেছে; তার নৈতিকতা ছিল না, তাই সে বাঙলার সব কিছুকে অনৈতিকতায় আক্রান্ত করে গেছে; কোন সুস্থতা ছিল না, তাই সে সব কিছুকে অসুস্থ করে গেছে। দিনের পর দিন সে বাঙলাকে অন্ধ থেকে অন্ধতর করে তুলেছে, বছরের পর বছর সে বাঙলাকে করে তুলেছে অপবিত্র।” (হুমায়ুন আজাদ, নরকে অনন্ত ঋতু, পৃষ্ঠা ৯৭)।

এই লোকটি দেশের রাজনীতিকে নষ্ট করেছেন। সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে নষ্ট করেছেন। ধর্মকে নষ্ট করেছেন। দেশের নির্বাচন-ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছেন। প্রশাসনকে নষ্ট করেছেন। ছাত্র-যুবাদের নষ্ট করেছেন। পুরো দেশকেই দূষিত করে গেছেন। যার ফল আমরা এখনও ভোগ করছি।

এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। নিজেকে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করেন তিনি, স্থগিত করেন সংবিধান। ১৯৮৩ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলসহ ৩ দফা দাবিতে ছাত্ররা ঐদিন মিছিল বের করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া ছাত্রদের বিশাল মিছিলটি সচিবালয়ে যাওয়ার পথে হাইকোর্টের সামনে পৌঁছালে এরশাদের পুলিশ বাহিনী বেপরোয়া গুলি চালায়। এতে মৃত্যুবরণ করেন জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ নাম না জানা আরও অনেকে। কালো পিচ ঢালা রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। সেই শুরু, এর পরের ইতিহাস কেবলই এরশাদের খুনে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার ইতিহাস।

পরদিন অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

পরের বছর ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এরশাদের রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনী ছাত্র মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে হত্যা করে ইব্রাহিম হোসেন সেলিম এবং কাজী দেলোয়ার হোসেনকে। এর পর ধারাবাহিকভাবে গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরশাদের পুলিশ এবং সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে দেশের নিরীহ ছাত্র-জনতাকে।

১৯৮৪ সালের ১ মার্চ দেশব্যাপী আহূত শিল্প ধর্মঘট ও হরতালের সমর্থনে আগের দিন মধ্যরাতে আদমজী জুটমিল এলাকায় কমরেড তাজুলের নেতৃত্বে শ্রমিকরা প্রচার মিছিল বের করলে স্বৈরশাসক এরশাদের সশস্ত্র অনুচরেরা মধ্যরাতে মিছিলে হামলা চালিয়ে মাথা থেঁতলে নির্মমভাবে হত্যা করে তাজুলকে।

বিজ্ঞাপন

একই বছরের ২৭ শে সেপ্টেম্বর। এই দিনে দেশব্যাপী হরতাল চলাকালে নিজ নির্বাচনী এলাকা গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জের মাটিতে রাজপথে মিছিলের নেতৃত্বে দেয়ার সময় পুলিশের সহযোগিতায় এরশাদের লেলিয়ে দেয়া পেটোয়া বাহিনী দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ময়েজউদ্দিন আহমেদকে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এদিন সারাদেশে পুলিশের গুলিতে আরও অন্তত ছয়জন নিহত হন। এ বছরের ২৪ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গায় ফজলুর রহমান নামে একজন নিহত হন। ২২ ডিসেম্বর রাজশাহীতে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের বাবুর্চি আশরাফ, ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ ও পত্রিকার হকার আব্দুল আজিজ।

১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া। ৩১ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে বিডিআরের গুলিতে ছাত্র স্বপন ও রমিজ নিহত হন।
১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাঁচজন, ১৪ মে হরতালে আটজন, ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনে ১১ জন, ১০ নভেম্বর হরতাল চলাকালে ঢাকার কাঁটাবন এলাকায় সাহাদত নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়।বসুনিয়া

১৯৮৭ সালের ২২ জুলাই জেলা পরিষদ বিল প্রতিরোধ ও স্কপের হরতালে তিনজন, ২৪ অক্টোবর শ্রমিক নেতা শামসুল আলম, ২৬ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের লক্ষ্মীপুরে কৃষক জয়নাল, ১ নভেম্বর কৃষক নেতা হাফিজুর রহমান মোল্লা নিহত হন।

একই বছর ১০ নভেম্বর ‘সচিবালয় ঘেরাও’ কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন যুবলীগ নেতা নূর হোসেন। যুবলীগের আরেক নেতা নূরুল হুদা বাবুল ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের খেতমজুর নেতা আমিনুল হুদা টিটোও সেদিন শহীদ হন।

১১ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আবুল ফাত্তাহ, ছাত্র বাবলু, শেরপুরের আমিন বাজারে পুলিশের গুলিতে উমেছা খাতুন, গোলাম মোহাম্মদ আসলাম, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খোকন ও ৫ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকোরিয়ায় ছাত্রনেতা দৌলত খান নিহত হন।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে মিছিলে গুলিবর্ষণে খেতমজুর নেতা রমেশ বৈদ্য, হোটেল কর্মচারী জি কে চৌধুরী, ছাত্র মহিউদ্দিন শামীম, বদরুল, শেখ মোহাম্মদ, সাজ্জাদ হোসেন, মোহাম্মদ হোসেন ও আলবার্ট গোমেজ, আবদুল মান্নান, কাশেম, ডি কে দাস, কুদ্দুস, পংকজ বৈদ্য, চান মিঞা, হাসান, সমর দত্ত, পলাশ, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, সাহাদাত হোসেনসহ অন্তত ২২ জন নিহত হন।

৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় হামলায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়। এরপর আসে ১৯৯০ সাল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতির বছর। এ বছর ১০ অক্টোবর সচিবালয়ে অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিতে ছাত্র জেহাদ ও মনোয়ার, হকার জাকির, ভিক্ষুক দুলাল নিহত হন। ১৩ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে নিহত হন পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের ছাত্র মনিরুজ্জামান ও সাধন চন্দ্র শীল। ২৭ অক্টোবর হরতাল চলাকালে ঢাকার বাইরে দুজন, ১৪ নভেম্বর আদমজীতে ১১ জন, ২৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকশাচালক নিমাই, ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্বদ্যিলয়ের টিএসসি চত্বরে ডা. শামসুল আলম মিলন, ২৮ নভেম্বর মালিবাগ রেলপথ অবরোধে দুজন, ৩০ নভেম্বর রামপুরায় বিডিআরের গুলিতে একজন, ১ ডিসেম্বর মিরপুরে ছাত্র জাফর, ইটভাঙা শ্রমিক আব্দুল খালেক, একজন মহিলা গার্মেন্টস কর্মীসহ সাতজন, আট মাসের শিশু ইমন, নীলক্ষেতে একজন, কাজীপাড়ায় দুজন এবং ডেমরা যাত্রাবাড়ীতে দুজন, চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একজন, খুলনার খালিশপুরে একজন, নারায়ণগঞ্জের মণ্ডলপাড়ায় এক কিশোর নিহত হন।

২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ময়মনসিংহে দুজন, রাজশাহীতে দুজন, ধানমণ্ডিতে একজন ও জিগাতলায় একজন নিহত হন। ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন দুজন। এভাবে দীর্ঘ নয় বছর অসংখ্য মানুষের খুনের রক্তে রক্তাক্ত এরশাদ অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

স্বৈরশাসক এরশাদ শুধু ঠাণ্ডা মাথার খুনিই ছিলেন না, তিনি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিরও বারোটা বাজিয়েছেন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে কাছে টানতে তিনি ১৯৮৮ সালের ৭ জুন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন। মধ্য দুপুরে কোনো মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে বলতেন, গতকাল রাতে স্বপ্ন দেখেছেন এই মসজিদে তিনি নামাজ পড়বেন। জেনারেল এরশাদের এই ভণ্ডামি খুব বেশি দিন এদেশের মানুষের কাছে চাপা থাকেনি। কেননা যে মসজিতে এরশাদ নামাজ পড়বেন বলে আগের রাতে ‘স্বপ্নে’ দেখতেন, সেই মসজিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সাতদিন আগে থেকেই তৎপর থাকতেন। এতে ওই এলাকার মানুষ সহজেই বুঝতে পারতো এরশাদ কিছুদিনের মধ্যেই এই মসজিদে নামাজ পড়ার ‘স্বপ্ন’ দেখবেন! ধর্ম নিয়ে এমন মিথ্যাচার ও ভণ্ডামি ইতিহাসে বিরল।

তার মৃত্যুর পর অনেকেই এরশাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য শাসনামলের সঙ্গে তুলনা টেনে এরশাদের দুষ্কর্ম ও অপরাধকে লঘু করে দেখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একজন খুনীকে কি আরেকজনের খুন দিয়ে বিচার করা যায়? আরেকজন খারাপের তুলনা টেনে খারাপকে ভালো বলা যায়?

ইয়াহিয়া-টিক্কা খান যেমন ১৯৭১ সালে ঠাণ্ডা মাথায় ত্রিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছিলেন, এরশাদ ক্ষমতায় থাকার জন্য ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষকে খুন করেছেন। এমন একজন নৃশংস খুনিকে যদি আমরা ক্ষমা করে দিই, তাহলে আইয়ুব-ইয়াহিয়া-টিক্কা খানদেরও ক্ষমা করে দিতে হয়। এরশাদের অন্য সব অপকর্মের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু নিরীহ মানুষ হত্যার কথা কীভাবে ভুলে যাব?

মানুষ হত্যার কি ক্ষমা হয়? তাই হতে পারে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View