চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঋণের জালে আটকে পড়া কৃষকদের বাঁচাতে হবে

অননুমোদিত ও লাইসেন্সবিহীন ক্ষুদ্রঋণের কারবার বা আর্থিকপ্রতিষ্ঠান নিয়ে কড়া পদক্ষেপের কথা বলেছেন হাইকোর্ট। ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পেলে তা তাৎক্ষণিক বন্ধের পাশাপাশি সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। শুধু তাই নয়, ক্ষুদ্রঋণের কারবার করছে এমন অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদন্তে একটি বিশেষ কমিটি গঠন এবং ওই কমিটিকে ৪৫ দিনের মধ্যে স্থানীয় সুদ কারবারীদের তালিকা প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত ২৮ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘চড়া সুদে ঋণের জালে কৃষকেরা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেই সংবাদের ভিত্তিতে জনস্বার্থে একটি রিট আবেদন করেন একজন আইনজীবী। সেই রিটে রুলসহ এমন আদেশ দিয়েছেন বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

মূলত গাইবান্ধা থেকে সরেজমিন সেই প্রতিবেদনটি তৈরি করে দৈনিক প্রথম অলো। সেই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে ঋণের জালে আটকে পড়া কৃষকদের করুণ পরিণতির চিত্র। তাতে আরও দেখা গেছে একজন কৃষককে ১০ হাজার টাকা ঋন নিয়ে মাসিক সুদ দিতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা। আবার ‘কারেন্ট’ সুদ হিসেবে ১ হাজার টাকায় একদিনের সুদ ১০০ টাকা! এমন আরও অনেক কঠিন সব শর্তের কথা ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, অবাস্তবও বটে।

আমরা নিশ্চিত, কৃষকদের এমন করুণ চিত্র শুধু গাইবান্ধাতেই নয়, সারাদেশে একই রকম। বছরের পর বছর বন্যা, অনাবৃষ্টি-অতিবৃষ্টি, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বহু এলাকার কৃষক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এর সাথে গত দেড় বছরে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাসের মতো এক মহামারি। এসবের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত কৃষক। তাই বাধ্য হয়ে এমন সব কঠিন শর্তে ঋণ নিচ্ছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

এটা ঠিক তাদের জন্য সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা আছে। কিন্তু সেই সুযোগ থাকলেও ‘নানা ঝামেলা’য় সেই ঋণ থেকে বঞ্চিত হন বেশির ভাগ কৃষক। অথচ আমরা বছরের পর বছর গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হতে দেখি, ‘কৃষকদের জন্য বরাদ্দ ঋণের বেশির ভাগেই বিতরণ হয়নি’, ‘কৃষকদের জন্য বরাদ্দ অর্থ ফিরে গেছে’ ইত্যাদি।

এসব কেন হয়? সেই প্রশ্নের উত্তর কর্তৃপক্ষও যেমন জানেন, কৃষকও জানেন, জানেন সাধারণ মানুষও। সবার কাছেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার; ঘুষ ছাড়া, হয়রানী ছাড়া কৃষিঋণ মেলে না। কিছু প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা থাকার পরও তারা কৃষিঋণ কৃষককে না দিয়ে অন্যখাতে বরাদ্দ দেয়। আবার কৃষকেরা হয়রানী, ঘুষ থেকে মুক্তি পেতে গ্রামের মহাজন, সরদার বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাধ্য হয়েই ঋণ নেন।

আমরা জানি, করোনাকালে নামমাত্র সুদে সরকার কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছে। পল্লী দারিদ্র্য বিমোনচন ফাউন্ডেশন, পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক-সহ অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষকদের জন্য অল্প সুদে ঋণের সুযোগ রেখেছে। কিন্তু প্রচারের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পাশাপাশি আরও অনেক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনাও মহাজন বা দাদন ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিয়েছে, উৎসাহিত করেছে কৃষকদের ঋণের জালে বছরের পর বছর বেঁধে ফেলতে।

দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যেসব কৃষক পুরো দেশের মানুষের মুখে অন্ন জোগান, তাদের গলায় এমন ঋণের ফাঁস থাকলে সে বাঁচবে কি করে? আমরা মনে করি, হাইকোর্টের আদেশ সেই কৃষকদের বাঁচানোর সুযোগ করে দিয়েছে। তাদেরকে বাঁচানোর পথ দেখিয়েছে।

বিজ্ঞাপন