চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

উদ্বৃত্ত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেয়ার সিদ্ধান্তে কী ভাবছেন অর্থনীতিবিদরা?

রাষ্ট্রায়ত্ত ৬৮ সংস্থার ২ লাখ ১২ হাজার ১শ কোটি টাকা ‘অলস’ পড়ে আছে বিভিন্ন ব্যাংকে। এই ‘অলস অর্থ’ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

এজন্য ২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি খসড়া বিলে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে রাখা এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে নেয়া কতোটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এসব অর্থ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা পাচ্ছে।

কিন্তু তুলে নিলে ব্যাংকের নগদ অর্থে টানাপোড়ন হবে। একই সাথে কিছু অর্থ তছরুপ হতে পারে।

আতাউর রহমান প্রধান

এ বিষয়ে রুপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এসব আমানত তুলে নিলে ব্যাংকে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

‘ধরুন আমার ব্যাংকে এখন ১শ টাকা আছে। কিন্তু সেখান থেকে ২০ টাকা তুলে নেয়া হলো। তাহলে ১শ টাকায় যে লাভ পাওয়া যেত ৮০ টাকায় নিশ্চয় তার চেয়ে কম লাভ হবে।’

তিনি বলেন: তবে এটা সরকারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এ বিষয়ে এখনো কোনো চিঠি পাইনি। তাই এর প্রভাব বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন এবিবির সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকে তারল্য সংকট হবে কি না তা নির্ভর করবে সরকারের টাকা উত্তোলনের পদ্ধতির উপর। কারণ সরকার কী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই টাকা নিবে সেই বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নই।

‘একেবারে সব টাকা তুলে নিলে নিশ্চয়ই চাপ পড়বে। তবে ধাপে ধাপে নিলে হয়তো চাপ কম পড়বে।’

তিনি বলেন, টাকাটা সরকার তুলে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারী সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) রাখবে। সেখান থেকে হয়তো বিভিন্নভাবে আবার বিভিন্ন ব্যাংকে আসবে। কিন্তু এইভাবে তা ফিরে আসতে অনেক সময় ব্যয় হবে।

উদ্বৃত্ত এই অর্থ নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, বলা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ‘অলস’ পড়ে আছে। আসলে অলস পড়ে থাকেনি। কারণ তা বিভিন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে রাখা আছে। আর ব্যাংকগুলোও সেই অর্থ ফেলে রাখেনি। বিনিয়োগ করেছে। সেখান থেকে কিছু হলেও সুদ পাচ্ছে। অতএব এই অর্থকে অলস বলা যাবে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন

জাহিদ হোসেন বলেন, এখন এই টাকাগুলো চলে যাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের টিএসএ’তে। অর্থাৎ সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত ওই টাকা খরচ না করবে ততক্ষণ তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা থাকবে। এর মানে দাঁড়ালো যে, বিভিন্ন ব্যাংকে জমা থাকা টাকাগুলো অলস ছিল না। কিন্তু সেগুলোকে অলস বানানো হলো। এছাড়া এই সময় তো কোনো মুনাফা পাওয়া যাবে না।

‘বিভিন্ন ব্যাংকে জমা থাকা টাকাগুলো তুলে নেয়া হলে ব্যাংকগুলোতে অর্থের একটা সংকট দেখা দিবে। তখন আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এ কারণে আমানতের সুদ হার বাড়বে। তখন কোনো ভাবেই এক অংক সুদে ঋণ বিতরণ সম্ভব হবে না।’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বলা হচ্ছে এই অর্থ জনকল্যাণ কাজে ব্যয় করা হবে। ধরি, এখান থেকে ১ লাখ কোটি টাকা নিয়ে ৫ লাখ কোটি টাকার জনকল্যাণমূলক কাজ হাতে নেয়া হলো। কিন্তু বাকি ৪ লাখ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে।

‘আমি মনে করি যদি জনকল্যাণ কাজে ব্যয় করার জন্য কোনো প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয় এবং সেই প্রজেক্টে কত টাকা ব্যয় করা হবে তার সুচিন্তিত একটা কর্মসূচি প্রস্তুত করা হয়। তাহলে এসব অর্থ নেয়া যেতে পারে। কারণ তখন বলা যাবে যে, রাষ্ট্রীয় এই কাজে ৫ লাখ কোটি টাকার দরকার। অতএব এসব অর্থ ওই প্রজেক্টে ব্যয় করা হবে।’

জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের যে এডিপি তা তো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যদি বাস্তবায়নই না করা যায় তাহলে এডিপির আকার বাড়ানোর দরকার কী।

তিনি বলেন, এছাড়া যেহেতু এসব অর্থ স্বায়ত্তশাষিত প্রতিষ্ঠানের। তাদের যদি কোনো উন্নয়নমূলক কাজ বা বিনিয়োগের দরকার হয় তাহলে তারা তো আবার সরকারের কাছেই অর্থ চাইবে। তখন সরকার আবার অর্থ দিবে। এই অর্থ স্থানান্তরে অনেক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পোহাতে হবে। অর্থ তছরুপ হবে। এর মানে লেনদেন বাড়লো। কিন্ত লাভ কিছুই হলো না।

তবে এই টাকা সরকারের কোষাগারে নেয়া খুব বেশি অযৌক্তি হবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ।

চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, আর্থিকভাবে কিছুটা চাপের মুখে রয়েছে সরকার। তাই সরকারের এই মুহূর্তে অর্থের দরকার আছে।

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, একদিকে রাজস্ব আয় কমছে অন্যদিকে বাজেটে বিশাল ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি তো সরকারকে পূরণ করতে হবে। এসব বিবেচনায় সরকার এই অর্থ নিলে এটা খুব অগ্রহণযোগ্য মনে হবে না। কারণ সরকার যেসব কাজ করছে তা রাষ্ট্রের অনুকূলেই করছে।

‘এই অর্থ যদি সরকার রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যয় করে তাহলে ভালো। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো, আমলাদের সুযোগ-সুবিধা বা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করে তাহলে তা ঠিক হবে না।’

তবে আর একটা করা যেতে পারে মানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নমূলক কাজেও এই অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ব্যাংক থেকে এসব টাকা তুলে নিলে ব্যাংক খাতে চাপ সৃষ্টি হবে কিনা জানতে চাইলে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এই টাকায় প্রতিষ্ঠান এবং উভয়ই লাভবান হচ্ছে। কারণ ব্যাংককেও এই টাকার উপর সুদ দিতে হচ্ছে। তবে এসব টাকার উপর নির্ভর হলে চলবে না ব্যাংকের। মানুষকে উপযুক্ত সেবা দিয়ে ও সুদ হার বাড়িয়ে আমানত আনতে হবে ব্যাংককে।

খসড়া আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ বাৎসরিক ব্যয় রেখে বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবে। সরকার তা উন্নয়ন কাজে ব্যয় করবে।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্তৃক ব্যাংকে রক্ষিত অলস টাকার পরিমাণ ২১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ১৮ হাজার ২০৪ কোটি টাকা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ১৩ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জমা আছে ৪ হাজার ৩০ কোটি টাকা।

Bellow Post-Green View