চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আয়েশা আক্তার মিন্নি ও বাঙালি মানস!

যেমনটি আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাই ঘটতে চলেছে। বরগুনায় যারা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে রিফাত শরীফ নামের যুবককে খুন করল, তাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবির চেয়ে নিহতের স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির চরিত্র নিয়ে বেশি মাতোয়ারা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আমাদের দেশে অবশ্য এটা একটা নতুন প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাত বছর আগে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তখন খুনের জন্য রুনির বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ আনা হয়। নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমনকি ‘হত্যা রহস্যের কেন্দ্রে রুনি’ ও ‘হত্যার কারণ কি রুনি’? এমনতর নানা খবর প্রচার হয় গণমাধ্যমেও।

গত বুধবার বরগুনায় স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করা হয় স্বামী রিফাত শরীফকে। কুপিয়ে মারার সে দৃশ্যের ভিডিও তোলপাড় সৃষ্টি করে সারা দেশে। কিন্তু সাগর-রুনির মতো এবারও খুনের দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে কলেজ পড়ুয়া মিন্নির ওপর। খুনের জন্য প্রধান তিন খুনির একজনের সঙ্গে মিন্নির প্রেমকে কারণ দেখিয়ে নানা অপপ্রচার চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রচার করা হচ্ছে ওই খুনির সঙ্গে বিয়ের কাগজপত্র, এমনকি অন্তরঙ্গ ছবিও।

বিজ্ঞাপন

শুধু সাগর-রুনি বা রিফাত হত্যাকাণ্ড-ই নয়; এ ধরনের বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য ঘুরেফিরে সেই নারীকেই হেয় করা হয়েছে। কখনো নিজে খুনের শিকার হয়ে, কখনো স্বামীর খুন হওয়ার পেছনে ওই নারী বা স্ত্রীর পরকীয়ার অপবাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আসামিপক্ষের লোকজন ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে এমনতর নানা তথ্য ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এমনকি এসব রটনার সূত্র ধরে কথা বলেছেন মন্ত্রী-এমপিরাও।

হ্যাঁ, এমনটা ইচ্ছে করেই করা হচ্ছে। এর পেছনে আছে খুনিকে বাঁচানোর এবং নারীকে কলঙ্কিত করার হীন মানসিকতা। এর মাধ্যমে আসল ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। এরমধ্য দিয়ে নারীর প্রতি আমাদের সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও ফুটে ওঠে। আমাদের সমাজে নারীকে এখনও মানুষ হিসেবে দেখা হয় না। নারীকে দেখা হয় আলাদা দৃষ্টি দিয়ে। সেখানে নারী হবে নিষ্কলঙ্ক, চারদেয়ালে বন্দী, বাবা-মা অভিভাবকদের ইচ্ছের পুতুল। তাদের জীবনে কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া থাকবে না। তারা পুরুষের ইচ্ছেমতো চলবে। প্রয়োজন হলে ঘর থেকে বের হবে না হলে হবে না। তাদের কেউ যদি নির্যাতনের শিকার হয়, কাউকে যদি পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়, তবে সেটা তাদের নিজেরই সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হবে। নারী হবে সর্বংসহা। কোনো ঘটনা তাদের স্পর্শ করবে না। কেউ যদি মারাও যায়, তবে সেটাও তার নিজেরই দায়! কেন সে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি! নারীর বিরুদ্ধে আমাদের সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার কারণে দেখা যায়, যেকোনো ঘটনার দায় নারীর ওপরই চাপানো হয়। সত্য হোক মিথ্যে হোক, নারীকে নিয়ে নানা রসালো কাহিনী প্রচারিত হয়, অনেকে তা বিশ্বাসও করে। নারীর বিরুদ্ধে যেকোনো অপপ্রচার বা নৃশংসতা চালিয়ে পার পাওয়া যায়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এসব বিশ্বাস করার, বিভিন্ন কল্পকাহিনী ছড়ানোর লোকের অভাব নেই। তাই আক্রান্ত-চরম দুর্দশাগ্রস্ত নারীদের নিয়ে অপপ্রচার বন্ধ হয় না।

আমাদের দেশে নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় না, বরং হেয় করে দেখা হয়। নারীর বিরুদ্ধে যে কেউ যেকোনো কথা বলতে পারে এবং বলে পার পেয়ে যায়। গত কয়েক বছরে যেসব নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার সবগুলোতেই নারীকে হেয় করা হয়েছে। নারীদের চরিত্র হনন করা হয়েছে। অপরাধীরা এসব করে পার পেয়ে গেছে বলেই এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত। কারণ এখনো এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। আর এই বিচারহীনতাও এসব অপবাদ প্রচারণায় সাহস জোগাচ্ছে।
এর সর্বশেষ উদাহরণ নুসরাত হত্যাকাণ্ড। ওই ঘটনার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি এ ঘটনায় হস্তক্ষেপ না করলে নুসরাতের চরিত্র হরণ হতো। তার মানে আমরা নারীর ক্ষমতায়নের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাচ্ছি, কিন্তু দেশে আমাদের নারীরা মর্যাদা পাচ্ছে না। তাদের চরিত্র হননের জন্য এক শ্রেণীর মানুষ অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এসবের মধ্য দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে সরকারকেই কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। যারা কোনো নারীকে ইচ্ছেকৃতভাবে হেয় প্রতিপন্ন করবে, চরিত্রহনন করতে কাল্পনিক কাহিনী প্রচার করবে, তাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। নারীদের ব্যাপারে কেউ কোনো অশালীন মন্তব্য করার ব্যাপারে যেন সতর্ক হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যম, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে যারা মিন্নির চরিত্র হরণ করছে তাদের দ্রুত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কারণ যখন একজন নারীর সহানুভূতি পাওয়া উচিত, তার পাশে দাঁড়ানোর কথা, সেখানে যারা তার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে, চরিত্র হরণ করছে, মিথ্যে তথ্য প্রচার করে সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করছে, মানসিক কষ্ট দিচ্ছে, এটা রীতিমতো অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি হওয়া উচিত।

তবে এজন্য আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাও কম দায়ী নয়। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে একজন নারী খুন হলে বা তার স্বামী খুন হলে সেই নারীকেই আমরা খলনায়িকা বানিয়ে দিচ্ছি। এমনটা পৃথিবীর কোথাও ঘটে বলে মনে হয় না। কুমিল্লার তনুর বিরুদ্ধেও মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এমন মনোভাবের কারণে নারীরা বিচার পাচ্ছে না।

আমাদের সামাজিক মানস মোটেও নারী-বান্ধব নয়। বরং প্রচণ্ডভাবে নারী বিরোধী। নারীর দোষ বের করার জন্য, খুঁত ধরার জন্য পুরো সমাজ মুখিয়ে থাকে। দোষ যদি কোনো কিছু না পাওয়া যায়, তবে মিথ্যে কলঙ্ক আরোপ করা হয়। নারীকে প্রতিনিয়ত ‘সতিত্বের’ পরীক্ষাও দিতে হয়। পুরুষের ‘সতীত্ব’, ‘সৎ-ত্ব’, বা ‘সততা’ নিয়ে আমাদের সমাজে কারো কোনো প্রশ্ন নেই, সব দায় শুধু নারীর। কোনো মেয়েকে যদি কখনও একাধিক পুরুষের সঙ্গে ‘জুড়ে’ দেওয়া যায়, তাহলেই আমাদের সমাজ তাকে ‘বেশ্যা’ মনে করতে থাকে। আর যেকোনো মেয়েকে ‘বেশ্যা’ বলতে পারার মধ্যে আমাদের পুরুষরা পৈশাচিক আনন্দ পায়। প্রেমে ব্যর্থ হলে একজন পুরুষ তার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিতাকে অকপটে ‘বেশ্যা’ বলে অভিহিত করে। বেশকিছু দিনের সম্পর্ক একটি মেয়ে ভেঙে দিলে, ছেলেটির এত দিনকার ‘সোনামণি’ সম্বোধন মুহূর্তে বদলে গিয়ে হয় ‘রেন্ডি’।
আমাদের সমাজে মেয়েরা যৌনতা ভালোবেসে যৌনতা করবে না। তারা পুরুষকে যৌনতা করতে দেবে। পুরুষ কর্ষণ করবে, সে প্যাসিভ কর্ষিতা হবে। পুরুষ বলে দেবে ঠিক কিভাবে, কী কী সম্পদ জমিয়ে রেখে তাকে পুরুষের কাছে নিজেকে নিবেদন করতে হবে, সে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। ‘বৈধ’ সম্পর্কের বাইরে নারী যেতে পারবে না।

পুরুষশাসিত সমাজের এই বিধিবিধানের কারাগারে থাকতে থাকতে নারীরাও এক পর্যায়ে পুরুষতান্ত্রিকতার নিয়মগুলোই বিশ্বাস করতে শুরু করে। ‘একজন নারীর সম্মান তার যোনিতে নেই, আছে তার হৃদয়ে, মস্তিষ্কে, শিক্ষায়, ব্যবহারে, অশিক্ষিতদের চিৎকার উপেক্ষা করার আভিজাত্যের মধ্যে আছে’-তা বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে যায়। আসলে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজটা ভণ্ডামি দিয়ে গড়া। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ভাষায় বলা যায়, “…বাঙালি চরিত্রের একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য ভণ্ডামো। বাঙালি প্রকাশ্যে একটি মুখোশ পরতে ভালোবাসে, মুখোশটি নানা রঙে রঙিন ক’রে রাখে; কিন্তু তার ভেতরের মুখটি কালো, কুৎসিত। বাইরে বাঙালি সব আদর্শের সমষ্টি, ভেতরে আদর্শহীন। বাঙালি সততার কথা নিরন্তর বলে, কিন্তু জীবনযাপন করে অসততায়। বাঙলায় এমন কোনো পিতা পাওয়া যাবে না, যিনি পুত্রকে সৎ হতে বলেন না; আর এমন পিতাও খুব কম পাওয়া যাবে, যিনি পুত্রের অসৎ উপার্জনে গৌরব বোধ করেন না। ‘চরিত্র’ সম্পর্কে বাঙালির ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘চরিত্রহীন’ বলতে বাঙালি বোঝে পরনারীতে আসক্ত পুরুষ; তার চোখে আর কেউ চরিত্রহীন নয়, শুধু পরনারী আসক্তিই চরিত্রহীন বা দুশ্চরিত্র। ঘুষ খাওয়া চরিত্রহীনতা নয়, গৌরব; কপটতা চরিত্রহীনতা নয়, মিথ্যাচার চরিত্রহীনতা নয়, এমনকি খুন করাও চরিত্রহীনের লক্ষণ নয়, শুধু নারী আসক্তিই চরিত্রহীনতা । তবে বাঙালিমাত্রই পরনারী আসক্ত; প্রকাশ্যে নয়, গোপনে। বাঙালি ধর্মের কথা সোরগোল করে বলে ধর্মবিরোধী কাজ করে অবলীলায়, প্রগতির কথা বলে প্রগতিবিরোধী কাজ করে প্রতিদিন; বাঙালি প্রকাশ্যে মহত্ত্ব দেখিয়ে বাস্তব কাজের সময় পরিচয় দেয় ক্ষুদ্রতার । ‘’

প্রশ্ন হলো, বহুযুগ লালিত আমাদের এই বাঙালি মানস পাল্টানোর উপায় কী? আর তা যদি না পাল্টাই তাহলে সমাজে নারীবিরোধী সংস্কৃতির অবসানই বা কীভাবে হবে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View