চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আমি চাই না আমার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়ুক’

কোনো পরিস্থিতিতেই আমার কারণে প্রযোজকের আর্থিক ক্ষতি হওয়া উচিত নয়: ফেরদৌস

লোকসভা নির্বাচনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারণায় গিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছেন বাংলাদেশের তারকা চিত্রনায়ক ফেরদৌস। বিতর্কের মুখে গেল মঙ্গলবার রাতেই কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছেছেন তিনি। তবে ভারত ছাড়ার আগে বিধি বহির্ভুত কাজে অংশ নেয়ায় ফেরদৌসের ভিসা বাতিল করে ভারত সরকার। এজন্য দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এই বিষয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র সঙ্গে কথা বলেছেন ফেরদৌস। চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি হুবহু ভাষান্তর করা হলো:

রায়গঞ্জের তৃণমূল কংগ্রেসের ক্যাম্পেইনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?
এই ক্যাম্পেইনের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত ছিলাম না। রায়গঞ্জে আমার এক প্রযোজক বন্ধু থাকেন। যখনই তিনি ঢাকা আসেন, আমরা দেখা করি এবং ওপার বাংলায় গেলেও দেখা করার চেষ্টা করি। তিন বছর আগে তার সঙ্গে ‘ছেড়ে যাস না’ নামে একটি সিনেমায় কাজ করেছিলাম। সেই ছবির ডিজিটাল সত্ত্বের বিষয়ে একটা মিটিং হওয়ার কথা ছিল আমাদের। আর একটা নতুন ছবির পরিকল্পনাও চলছিল। ১৪ এপ্রিলে আমার সহকর্মিরা পহেলা বৈশাখের একটা র‍্যালির কথা বললো। অঙ্কুশ, পায়েল সরকার এবং আরও কিছু সহকর্মীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন সেখানে। আমাকে বলা হয়েছিল, ‘চলো মজা হবে।’ বাংলাদেশে বড় করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। তাই আমি বিষয়টির পরিণতি না বুঝেই সেখানে যাই। বিষয়টি পূর্বপরিকল্পিত কিংবা কোনো বিশেষ দলের পক্ষ নেয়া বা কাউকে অসম্মান করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি সকল রাজনৈতিক দল, নেতাদের এবং ভারতের সংবিধানের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাশীল।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি কীভাবে জানলেন?
র‍্যালি শেষ হওয়ার পথে ফিরছিলাম। প্রযোজকের বাড়িতে রাতের খাবার খেয়েছিলাম। সন্ধ্যার পরে বিষয়টি নিয়ে মেসেজ আসতে শুরু করে।

ছবি: আরিফ আহমেদ

যার র‍্যালিতে অংশ নিয়েছেন, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী কানাইয়া লাল আগারওয়ালকে কি ব্যক্তিগত ভাবে চিনেন?
না, আমি তাকে চিনতাম না। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ আমার র‍্যালির ছবি ভাইরাল করে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে ছবিগুলো। পরের দিন আমি কলকাতায় ফিরে ঢাকায় ফেরত আসার কথা ছিল। কলকাতায় ফেরার পরে বুঝতে পারি যে ইস্যুটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। আমি পূর্বপরিকল্পিত সময়েই ঢাকা ফিরে আসি।

একজন শিল্পী হিসেবে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ হওয়া এবং বাংলাদেশ ফিরে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়া কতটা কঠিন ছিল?
কলকাতায় কাজ করি গত ২০ বছর ধরে। ১৯৯৮-এ ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ করে দুই বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অংশ হয়ে যাই। কলকাতায় আমার অনেক বন্ধু আছে, অনেক ফেস্টিভ্যালে অংশ নেই। কখনো কলকাতাকে বিদেশ মনে হয়নি। ভারতকে আমার দ্বিতীয় ঘর মনে হয় সব সময়ে। ভারতীয়রা সবসময়ে আপন করে নিয়েছে আমাকে। বলা হয়েছে, যে ভিসা আমাকে দেয়া হয়েছে তার কিছু নিয়মকানুন আছে এবং সেগুলো আমাকে মানতে হবে। আমার বোকামির জন্য এই অপ্রীতিকর বিতর্কে জড়িয়েছি। বাংলাদেশি হিসেবে ভিসার শর্তগুলো জেনে রাখা উচিত ছিল।

ভারতে সহকর্মীদের সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় ফেরদৌস…

দেশে ফিরে আসাটা কেমন ছিল?
আমি বলেছি যে কলকাতার মানুষের জন্য আমার ভালোবাসা সীমাহীন এবং আমি আবেগতাড়িত ছিলাম। আমি বুঝতে পারছি যে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়াটা আমার ভুল ছিল, যদিও কাউকে কষ্ট দেয়ার জন্য তা করিনি। আমি বাংলাদেশের নাগরিক এবং অন্য দেশের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়াটা আমার ভুল ছিল। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আমি চাই না যে আমার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়ুক। কালো তালিকাভুক্ত হওয়াটা আমার কৃতকর্মের শাস্তি। আমি মনে করি সময় সবকিছু ঠিক করে দেয় এবং আমি আশাবাদী যে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কলকাতার অসমাপ্ত কাজগুলোর কী হবে?
সন্তানদেরকে সময় দেয়ার জন্য ওপার বাংলায় কাজ করা কমিয়ে দিয়েছি গত কয়েকবছর ধরে। ‘সাধের জোনাকি’ এবং ‘তুই যদি আমার হতিস’ নামের দুটি সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় আছে। আর ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের সঙ্গে ‘দত্তা’ ছবির শুটিং শুরু করেছি। মিডিয়া হাউজগুলোতে আমি ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিয়েছি এবং আমি আশা করি যে আমার কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানো এতগুলো বছরের মূল্য তারা দেবে। কোনো পরিস্থিতিতেই আমার কারণে প্রযোজকের আর্থিক ক্ষতি হওয়া উচিত নয়।

টলিউড থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন?
গত কয়েকদিন খুব কঠিন কেটেছে এবং কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাইনি। আমি জানি আমার বন্ধু ঋতুপর্ণা এবং রচনা ব্যানার্জি বিষয়টি নিয়ে খুবই মন খারাপ করেছে। ঘটনার একদিন আগেও আমি ঋতুপর্ণার সঙ্গে শুটিং করেছি। আমার সহকর্মী, যারা সেই র‍্যালিতে ছিল, তারাও কষ্ট পেয়েছে এই ঘটনায়। তারা সবসময়েই আমার পাশে ছিল।

চিত্রনায়ক ফেরদৌস

বাংলাদেশ থেকেও নিশ্চয়ই অনেক ফোন পেয়েছেন?
হুম, আমার পরিবার, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফোন দিয়েছে। এতগুলো বছর খুব সাধারণ থাকতে চেয়েছি এবং কখনোই কোনো বিতর্কে জড়াইনি। কলকাতায় যাই, শুটিং করি, সিনেমা দেখি, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসি। যারা আমাকে চিনেন তারা জানেন যে, আমি কাউকে জেনেশুনে কষ্ট দেয়ার মানুষ নই। আমার মা, স্ত্রী, ভাই-বোন এবং সন্তানরা যন্ত্রণাদায়ক সময়ে কাটিয়েছে এবং আমি আশা এবং প্রার্থনা করি যে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে। ভারতে জাতীয় নির্বাচন হবে কিছুদিন পরেই। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের নির্বাচন সফলভাবে হওয়ার আশা ও প্রার্থনা করি। আমার কাজের জন্য আমি দুঃখিত এবং আশা করি আমাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে।