চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আমার সোনার বাংলা’

মালদ্বীপ ভ্রমণ: পর্ব-৩

আমরা ইউরোপের দেশগুলো নিয়ে যতটা জানি, তার সামান্যটুকুও সাউথ এশিয়ার কয়েকটা দেশ সম্পর্কে জানি না। মালদ্বীপে আসার পর এই বোধটা আমার হয়েছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে যতটুকু জানা যায় আরকি!

এরমধ্যে অবশ্য ভারত নেই। ভারতে যেহেতু বাংলাদেশিদের যাতায়াত বেশি, সাথে ভারতীয় চলচ্চিত্র, ডেইলি সোপ, ভাষা, বিস্তৃত যোগাযোগ মাধ্যম, সংস্কৃতিসহ সবকিছুর কারণে আমাদের চিন্তা-ভাবনার জায়গাটাও ‘এপার বাংলা, ওপার বাংলার’ মধ্যেই বন্দি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আমি কখনো ভারতে যাইনি। কিন্তু যখনই যাওয়ার কথা উঠেছে বিষয়টা এমনভাবে নিয়েছি, ‘ওহ, ভারত। হ্যাঁ, যাবোনি!’ শুধু আমি না, আমার আশেপাশের অনেককেই দেখেছি একইভাবে বলতে।

অফিস ট্যুরে আমি এর আগে শ্রীলঙ্কা, নেপালে গিয়েছি। সেখানে যাওয়ার আগেও কোনো পড়াশুনা করে যাইনি। আমার মতে, গিয়ে চলতে চলতে বুঝে যাবো। তারপরও কিছুটা আইডিয়া থাকা জরুরি। যারা ভ্রমণ পিপাসু আছেন বা যারা ছুটি পেলেই ট্রাভেল করেন, তারা এ বিষয়গুলো খুব ভালো করে জানার চেষ্টা করেন। সেদিক দিয়ে নতুন কোনো শহরে গিয়ে যেমন শুরুর ধাক্কাটা কাটানো যায়, সাথে কম খরচেও ভালো ট্যুর সম্ভব।

এই যে এতো কথা বললাম, তার আসল ঘটনা হচ্ছে আমি মালদ্বীপে আসার পরপরই একটা ধাক্কা খেয়েছি। সেটা বড় রকমের ধাক্কাই বলা যায়। এয়ারপোর্টে হোটেলের যে মেয়েটা আমাদের নিতে গিয়েছিল, ওর সাথে গাড়িতে আসার সময় জেনেছি এই দেশে পাঁচ লাখ মানুষের মধ্যে অনেক বাংলাদেশি আছে। দু’একদিনের মধ্যে সেই সংখ্যা এক লাখে পৌঁছাল। মালদ্বীপে বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বাংলাদেশির সংখ্যা দেড় লাখের কাছাকাছি!

এটার প্রমাণ আমরা চাইনি। কারণ এখানে এমন কোনো দোকান নেই, কর্মক্ষেত্র নেই, যেখানে বাংলাদেশিরা কাজ করেন না। আমাদের ভাষায় যেটা ‘অতিথিপরায়ণ’ সেরকম কোনো ব্যাপার মালদ্বীপে নেই। আমরা প্রায় সারাদিনই ভাবি এই ঘরের মানুষগুলো না থাকলে আমাদের এখানে কি হতো!

শুধু ইংরেজিতে কথা বলে ২০দিন কাটানো সম্ভব? আমরা ১৮ জন বাংলাদেশ থেকে এসেছি। নিজেদের সাথে কথা বলে আর কতক্ষণ। ছোট্ট জায়গা। এতো ব্যস্ত থাকতে হয়। একা চলাফেরা করতে হয় প্রায়ই। কিন্তু আমাদের ঘরের মানুষরা আমাদের মধ্যে দেশে না থাকার অভাববোধটা হতে দেননি, দেন না।

কিছু ঘটনা বলি। আপনাদেরও ভালো লাগবে। হয়তো পরে খরচের কথা ভেবেও ওনাদের দেখতেই মালদ্বীপে আসবেন আপনারা। এতদিন এতো আতিথেয়তায় কান্না আসেনি। আজকে লিখতে বসে খেয়াল করলাম চোখে পানি!

আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, হয়তো ট্যাক্সিই খুঁজছেন। একজন এসে সালাম দিয়ে বলবেন, আপা ভালো আছেন? কখনো বাইক নিয়ে ধুপধাপ সামনে দাঁড়িয়ে বলবে আপা চলেন নামিয়ে দেই। আমি আসলে এখনো বাইকে উঠতে পারিনি। স্কুটি বা ভেস্পা হলেও আমার কাছে এতো বড় ব্যাগ আর ট্রাইপড থাকে, কখনো হাতে ল্যাপটপ… ওঠা হয়নি। হয়তো কথা রাখা হয়নি। আমার অন্য কলিগরা অবশ্য সুযোগটা পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কখনো এসে বলছেন, আপা টিকেটের দাম তো এতো। বেশি নিচ্ছে। কি করবো? পরে কোন ঝামেলায় পড়বো নাতো? কখনো হঠাৎ কোথায় থেকে সামনে এসে বলছেন, আপা/ভাই চলেন চা খাওয়াই। না করবেন না প্লিজ। আপনাদের জন্য একটু করতে পারলে ভালো লাগবে।

সেদিন তো প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডের গ্রিলের ভেতর দিয়ে আমাদের জন্য জুস আর চকলেট দিয়ে গেলেন একজন। ভাইরে আপনাদের এতো ভালোবাসা আমরা আমাদের দেশেও পাইনি!

সবই ঠিক আছে। সবাই আছেন। কোনো জবাবদিহিতা নেই। চাকুরি করছেন। রাজধানী মালেসহ বিভিন্ন দ্বীপে বাংলাদেশের দুশো চিকিৎসক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। সরকারী চাকুরি করছেন অনেকে। কিন্তু কেউ এখানকার নাগরিকত্ব পাননি। কেউ কেউ আছেন ৩৫/৪০ বছর ধরে। তারাও পাননি। এদেশ প্রবাসীদের নাগরিকত্ব দেয় না। এখানকার কোনো নাগরিককে বিয়ে করলেও দেয়া হয় না। মালদ্বীপে এখনো এই আইন তৈরি হয়নি। পাস তো দূরের কথা।

তবে হবে বলে কথা বেশ এগিয়েছে। এর মানে প্রবাসীরা এদেশে অবৈধ, তাও কিন্তু নয়। তারা কোনো সরকারী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। চিকিৎসকদের বিষয়টি আলাদা। সবাই বৈধভাবেই ব্যবসা করছেন। এখানে বাংলাদেশিদের রেস্টুরেন্ট ব্যবসা খুব জমজমাট। রেস্টুরেন্টগুলো হওয়াতে ভারতীয় ও নেপালের যারা আছেন, তাদের জন্য সুবিধা হয়েছে। ঘরের খাবারের স্বাদটা পান।

ধরেন আমার মতো যারা আছেন। কোন দেশে গেলে সেখানে প্রথম দশদিন চকোলেটের বারের উপরে নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। এরমধ্যে কোনভাবে দেশী খাবার বা সবজি খুঁজে কিংবা ভারতীয় রেস্টুরেন্ট খুঁজে তারপর তৃপ্তি আসে। কিন্তু এখানে তো সোনায় সোহাগা। প্রথমদিন থেকে বাংলাদেশি খাবারই খাচ্ছি।

‘দেশি গরু না ইন্ডিয়ান?’ -প্রথমদিন চমকে উঠেছিলাম। পরে জেনেছি ফ্রোজেন মাংস আনা হয়। দেশি পাবদা, ট্যাংরা পেয়ে আমাদের শান্তি দেখার মতো ছিল। সাথে কলমি শাক। সবজি এখানেই চাষ হয়। তবে তেমন স্বাদ নেই। কারণ এখানকার মাটি চাষযোগ্য নয়। হাইব্রিড ধরনের সব।

বাংলাদেশিদের আতিথেয়তার গল্প বললে শেষ হবে না কখনো। মাত্র দুজন বাংলাদেশি ট্যাক্সি ড্রাইভার আছেন। একজনের নাম ইসমাইল। ট্যাক্সিতে উঠে উনি বাংলা বলা শুরু করাতেই আমি, আনন্দ ভাই আর স্যামন ভাই তিনজন চমকে উঠলাম।

আমি তো কোনকিছু না ভেবেই বলে ফেললাম, ‘ভাই, প্রথম কোন বাঙালির ট্যাক্সি পেলাম!’

তিনি জানালেন ওনার বয়স ৩৫ পার হয়েছে। ২০/২৫ বছর এখানেই আছেন। আগে পুরো পরিবার এখানে থাকতো। সবাই চলে গেছে। উনি এখানে বিয়ে করেছেন বলে যেতে পারছেন না। সামনের সিটে একজন মহিলা আর একটা বাচ্চা ছিল। স্কুল ছুটির সময় ছিল বলে আমরা বুঝতে পারিনি, ওনারা ট্যাক্সি চালকের এখানকার পরিবার!

বিজ্ঞাপন