চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমাদের ম্যাজিশিয়ান

ছোটবেলায় ম্যাজিকের প্রতি ছিল তীব্র আকর্ষণ। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতাম, হাওয়া থেকে কীভাবে জাদুকর একটি লাল রুমাল, পায়রা অথবা একটি আস্ত ফুলের তোড়া বের করে নিয়ে আসতেন! উত্তর মিলতো না, ঘোরও কাটতো না। একসময় মনে হলো জাদুকর হবো। হলামও, জাদু শেখার বই দেখে দেখে হয়ে গেলাম পুরো দস্তুর জাদুকর। আমার দর্শক- আমি যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম সেখানকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। হাওয়া থেকে লাল রুমাল বের করে এনে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতাম। অবশেষে ঘোর কাটলো। জাদুর পেটরা পড়ে রইলো স্টোররুমে। আমিও বড হয়ে গেলাম। একসময় পেশা ও নেশা হয়ে উঠলো আলোকচিত্রকলা। আলোকচিত্রকলা জগতে এসে ফিরে পেলাম সেই ম্যাজিক, সেই ম্যাজিশিয়ান। এই ম্যাজিশিয়ান শূন্য থেকে লাল রুমাল বের করে এনে দর্শককে উপহার দেন না। তিনি শূন্য থেকে অসামান্য আলোকচিত্রকর্ম বের করে আনেন। আমাদের সেই ম্যাজিশিয়ানের নাম আবীর আবদুল্লাহ।

আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করি, এখানে ছবি হয় না, ছবি হবে না- ঠিক সেখান থেকেই তিনি বের করে আনেন ছবি। যে ছবি নিজেই কথা বলে, ‘আমি ছিলাম’। ছবি আছে, ছবি থাকে। সেই ছবি দেখতে সেই ম্যাজিশিয়ানের চোখ লাগে, কৌশলের প্রয়োজন হয়। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, তাকে মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দিলেও বুঝি তিনি সেখানকার সেরা ছবিটা নিয়ে ফিরে আসবেন। তার সাথে অনেকবার ছবি তুলতে বেরিয়েছি। দেখেছি, আমরা যখন একটি ভালো ছবি পেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, ছোটাছুটি শুরু করি, অস্থির হই- তখন আবীর আবদুল্লাহ স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করছেন, ‘সুদীপ্ত বাচ্চারা কেমন আছে?’ তাকে কখনো অস্থির হতে দেখিনি। ধাক্কা-ধাক্কিতে তিনি নেই। আলোকচিত্রীদের ভিড়েও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ ঠাণ্ডা মাথার এই আলোকচিত্রী জানেন, অস্থির হলে ছবি হয় না, ছবি হয় কৌশলে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আবীর আবদুল্লাহর সাথে আমার পরিচয়, সেই কৈশোরে। ম্যাগাজিনের সুন্দর ছবি কেটে রাখা ছিল আমার শখ। কাটাকুটি করতে করতেই আবীর আবদুল্লাহর ছবি ও নামের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। দেখা-সাক্ষাৎ হয় বহু পরে। আলোকচিত্রকলাচর্চার শুরু থেকেই তাকে অনুসরণ করছি। তাকে গুরু মানছি। কিন্তু তিনি জানেন না, অনেকটা গুরু দ্রোণ ও শিষ্য একলব্যর মতো ব্যাপার। ছেলেবেলায় হাওয়া থেকে রুমাল বের করে আনার বিদ্যেটা আয়ত্ব করতে পেরেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আবীর আবদুল্লাহর মতো শূন্য থেকে সেরা ছবিটা বের করে আনার কৌশলটা আজও শিখতে পারিনি। তিনি শুধু আমার কাছেই নমস্য ব্যক্তি নন, বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি সমাজে তাঁর অধিষ্ঠান সুউচ্চ। তাকে যেমন পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর বিচারক হিসেবে, একই মানুষ ছুটে যাচ্ছেন কোনো একটি উপজেলাভিত্তিক ফটোগ্রাফি-ক্লাবের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ফিতে কাটতে! ছোট-বড়, শিক্ষিত-অল্পশিক্ষিত সবাইকে তিনি কাছে টেনে নিয়ে হয়ে গেছেন সবার প্রিয় ‘আবীর ভাই’। ডাকলে তাকে পাওয়া যায়। তিনি তালগাছ হননি, অনায়াসেই তা হতে পারেন। তিনি ঘাসের মতো ছড়িয়ে পড়লেন সবখানে, সবার মাঝে। উচ্চাসনের হয়েও তার রয়েছে মিশে যাওয়ার বিরল গুণ। যা আমাদের অনেকেরই নেই।

আবীর আবদুল্লাহর ছবি সম্পর্কে মন্তব্য করার যোগ্যতা আমার নেই। তার ছবি প্রতিনিয়ত আমাকে, আমার মতো আরো অনেককে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। তার ছবি দেখলে বুঝি, দিল্লি এখনো বহু দূর। আলোকচিত্রকলার ইতিহাসে আমরা ‘হিউম্যানিস্ট ফটোগ্রাফি’ বা ‘লাইফ ফটোগ্রাফি’ বলে সমাজ-সচেতন যে ধারা দেখতে পাই, আবীর আবদুল্লাহ সে ধারারই একজন একনিষ্ঠ অনুসারী। জ্যাকব রিজ, লুইস হাইন, পরবর্তীকালের হেনরি কারটিয়ার-ব্রেসো, সালগাদো, জেমস নক্টওয়ের মতো আবীর আবদুল্লাহর ছবির বিষয়ও মানুষ। এই মানুষ মডেল নয়, এই মানুষ সাজানো-পরিপাটি নয়, এই মানুষ যেখানে যেমন তেমনভাবেই আবীর আবদুল্লাহর ক্যামেরায় প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তার অভিজ্ঞতা, সবচেয়ে আলাদা কম্পোজিশন ভাবনা, সময় নির্বাচন এবং বিষয়ের প্রতি একাত্মতা সেই ছবিকে কররেছে eternal বা চিরস্থায়ী ও আবেদনময়।

কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যায়। কুড়িগ্রামের বন্যার ছবি। বন্যা দুর্গতরা সড়কের পাশে পলিথিন দিয়ে তাঁবু টানিয়ে বসবাস করছে। একটি তাঁবুতে থাকা ছোট্ট শেফালির ছবি তুলেছেন আবীর আবদুল্লাহ। তিনি শেফালিদের তাঁবুতে ঢুকেননি। তাকে পোজ দিতে বলেননি। পলিথিনের এপার থেকে তোলা ‘জীবন যেখানে যেমন’ ধরণের এই ছবিতে আমরা শেফালির মুখ স্পষ্ট দেখতে পাই না, ঝাপসা দেখায় তাদের জীবন। এই ছবি যেন শেফালি এবং শেফালিদের মতো আরো অনেকের অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট ভবিষ্যতের রূপক।

বিজ্ঞাপন

ঘূর্ণিঝড় দুর্গত এক শিশুর ছবির কথাও মনে পড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে এক শিশু মায়ের বুকে মাথা ঠেকিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে আছে, ঘরে আলো যেদিক দিয়ে ঢুকছে সেদিকে। মা’র মুখ বাদ দিয়েছেন আলোকচিত্রী যাতে শিশুটির মুখের এক্সপ্রেশন গুরুত্ব পায়। শিশুটি ডানহাতে শক্ত করে তার মা’র শাড়ির একাশং ধরে রেখেছে। এখানেও সেই অনিশ্চত জীবনের গল্প। আলো আসছে, কিন্তু কাটছে না অনিশ্চয়তার অন্ধকার।

তার বিখ্যাত কাজের একটি মহান মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সিরিজ ছবি। দেশাত্মবোধ, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এমন কাজ খুব কম হয়েছে আমাদের দেশে। আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি জগতে এমন কাজও যে গুরুত্ব পেতে পারে আবীর আবদুল্লাহ তা প্রথম প্রমাণ করলেন। আমাদের অনেকেই যখন ‘আন্তর্জাতিক মহলে খায়’ ধরণের ইস্যু নিয়ে কাজ করছিলেন তখন তিনি এই ‘আনসাঙ’ ইস্যুটিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরলেন। একাজের জন্য তিনি ‘মাদার জোন্স’ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

তার সাংকেতিক ছবিতেও উঁকি দিয়েছে মানুষ। তার তোলা ২০১০ সালের একটি ছবির কথা মনে পড়ে। গাজীপুরের গরীব এন্ড গরীব সোয়েটার কারখানায় আগুন লাগে। কারখানার মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কালো ছাইয়ে কিছু খালি পায়ের ছাপ। এই সাংকেতিক ছবিটি ওই গোটা মর্মান্তিক ঘটনা বর্ণনা করে দেয়। আরেকটি সাংকেতিক ছবি প্রাসঙ্গিক। কারখানা মালিকের অবহেলার কারণে পোশাক শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে শাহবাগে ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচি চলছে। প্রতিবাদকারীরা নিজেদের শরীর কাফনে মুড়িয়ে রেখেছেন। শাহবাগের মতো ব্যস্ততম এলাকায় তিনি ছবিটি তুললেন, কিন্তু ফ্রেমে আমরা কাফন পরিহিত মানুষগুলো ছাড়া আর কাউকে দেখি না। কোনো ব্যানার নেই, স্লোগান নেই, কেমন এক ভৌতিক আবহ। বিস্ময়করভাবে আলোকচিত্রী নীরবতাকে স্থিরচিত্রে কম্পোজ করেছেন। এই নীরবতা শোকের, ভয়ের।

নেপালের ভূমিকম্প-পরবর্তী ছবি অনেকেই তুলেছেন। হাজার হাজার ছবির ভিড়ে আবীর আবদুল্লাহর ছবিকে ভিন্ন করেছে ‘আশাবাদ’। বেশিরভাগ আলোকচিত্রী ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞের দিকে মনোযোগী ছিলেন। আর আবীর আবদুল্লাহ ধ্বংসস্তূপে খুঁজে বেড়িয়েছেন আশার আলো। নেপালীদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তিনি আমাদেরকে শুনিয়েছেন। ভগ্নাংশের স্তূপে তিনি খুঁজে পেয়েছেন ঈশ্বরের প্রতিকৃতি।

তিনি ফটোগ্রাফির অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষকও। আবীর আবদুল্লাহর জন্য পড়ানোর কাজটি বোধ করি সহজ, কেননা তার এক একটি ছবি যেন এক একটি ফটোগ্রাফির বই। আমরা তার ছবি দেখে, ছবি পড়ে শিখে যাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন