চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘আপনাকে আজ বিলিয়ে দে’

অাজ দুটো গল্প বলবো। যে গল্প ঈদকে নিয়ে। যে গল্প ভালোবাসার, আনন্দের। যে গল্প মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার।

প্রথম গল্পটা সেই ২০১৬ সালের প্রথম রোজার। আগের দিন রাতে ৪-৫ বছরের ছোট্ট সাকিবুর খেলার ছলে বাড়ির পেছনের সেপটিক ট্যাঙ্কিতে ফেলে দেয় মোবাইলের চার্জার। বাবা হোসেন কৃষি কাজ করেন। বাকি চাচারাও তাই।

বিজ্ঞাপন

রাত গড়িয়ে পরদিন দুপুর পর্যন্ত খোঁজ পরে নি চার্জারের। দুপুরের পর প্রয়োজন হয় মোবাইল চার্জ দেয়ার। খুঁজতে খুঁজতে সামনে আসে সাকিবুরের কীর্তি। ট্যাঙ্কিতে ডুবে যাওয়া চার্জারের কথা ভুলে যেয়ে নতুন একটি কেনা আমাদের জন্য স্বাভাবিক ভাবনা। তবে, হোসেনের অভাবের সংসারে দুই -তিন ‘শ টাকার চার্জারের মূল্যটা নেহায়েত কম ছিল না!

হোসেন ওই নোংরার মধ্যে নেমে গেলেন চার্জার উঠিয়ে আনতে। কিন্তু বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নিথর হয়ে পড়ে গেলেন সবার সামনেই। এবার ভাইকে বাঁচাতে ট্যাঙ্কিতে নামলেন রমজান। ভাইকে বাঁচাতে তো পারলেনই না, উল্টো নিজের পরিণামও হল একই। এবার পাড়া প্রতিবেশী আর আরেক ভাই মিলে উদ্ধার করল রমজান আর হোসেনকে। তবে মৃত!!

ছোট্ট সাকিবুর পিতৃহারা হলো। সেই সাথে এলোমেলো হলো রমজান আর হোসেনের পরিবারের সব সুখ-দুঃখের হিসেব-নিকেশ। দুই ভাই প্রাণ হারালেন নিজ পরিবারের সামনে। ছোট্ট একটি মোবাইল চার্জারের জন্য। এই আমরা। এই আমাদের দেশ। যেখানে দু’শ টাকার মোবাইল চার্জার ক্ষমতা রাখে দুটো পরিবারের স্বপ্নকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়ার।

বছর ঘুরে আবারও আসে রমজান মাস। তখন যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও আমি। সাকিবুরদের বাবা হারানোর এক বছর পূর্ণ হয়েছিল সেদিন। সেই সাথে অভাব-অনটনও আরও পূর্ণতা পেয়েছে। ঈদ ওদের জন্য আনন্দ আনে না। আনে না নতুন জামা, ভাল খাবার কিছুই। যারা পড়ছেন, কেউ কি সুস্থভাবে বসে থাকতে পারতেন এমন গল্প শুনে? আমিও পারি নি।

নিজের বাসার উৎসবের মত বাজার করেছি রমজান আর হোসেনের পরিবারের জন্য। পিতা-স্বামী হারানো পরিবার দু’টির সব সদস্যদের জন্য কিনেছি ঈদের নতুন পোশাক।

বাবা নেই বলে হারিয়ে যেতে দেই নি সাকিবুরদের ছয়-ভাই বোনের ঈদ। রমজান মাস এলেই রমজানদের হারানোর স্মৃতিতে কাঁদবে ওরা। তবু ঈদের দিন একটু হলেও হাসি ফুটুক ওদের মুখে। চেষ্টা করতে দোষ কি?

বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়ের মধ্যে চিরদিনের ঘুমন্ত রমজান আর হোসেন কি দেখতে পেলেন তাদের সন্তানের মুখের এক চিলতে হাসি?

এবার আসি দ্বিতীয় গল্পে। সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইন নিউজের মাধ্যমে হয়তো জেনেছেন অনেকেই।বাকিদের বলি: গত বছর ঈদের ঠিক আগে আগে। অফিসে বসে কাজ করছিলাম। হঠাৎ এক মানসিক বিকারগ্রস্ত যুবক এসে ঢুকল। পা খালি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘পা খালি কেন?’

সাবলীল উত্তর, ‘এসব বড় অফিসের সিস্টেম আমি জানি। আমারে শিখানো লাগবি না।’
আমি বললাম, ‘এটা উপাসনালয় না, যে জুতো খুলে ঢুকতে হবে। যাও! জুতো পড়ে আসো।’

জুতো পড়ে আসার পর সামনে বসালাম। অঝরে কাঁদল কিছুক্ষণ জিল্লুর। বলল, ‘এমন ভাল ব্যবহার আগে কোথাও আমার সাতি কেউ করি নি।’

বিজ্ঞাপন

জিল্লুর রহমান। বয়স ৩০ হবে। বাবা নেই। আছে শুধু মা। বাড়ি অভয়নগরে না। পাশের কোনো এক উপজেলায়। চলে এসেছে সেখান থেকে। নিজে নিজেই বলে, ‘আমিও আপনার মত বড় অফিসার হতে পাড়তাম। বিসিএস দিসি। ইকোনোমিকসে পড়িসি।’

কথাগুলো অসংলগ্ন মনে হইছিল বৈ কি। তবে পড়াশোনা যে জিল্লুর একদম খারাপ করে নি, তা আলাপে বুঝলাম। এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে অনেকটা।

– আমার কাছে কি চাও?
– শাড়ি।
– শাড়ি! কার জন্য?
– মা’র জন্যি। ৪০০ টাকা চাইয়েসে দাম। ঈদে নতুন শাড়ি দেব না???

সাথে সাথে ৫০০ টাকার একটা নোট পকেট থেকে বের করে বললাম, ‘যা পাগলা। নিজে কিনে নিয়ে আয়। যদি সত্যিই কিনে আনিস, তবে তোর জন্য উপহার আছে।’

টাকাটা নিয়ে এক পলকেই দৌড় দিলো জিল্লুর।

বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমার রুমে বসা প্রত্যেকে বলল, ‘কি করলেন স্যার! ৫০০ টাকা জলে গেল।’ সবার কথায় আমারও মনে খানিকটা অবিশ্বাস বাসা বেঁধেছিল। মৃদু স্বরে উত্তর দিলাম, ‘গেলে যাক তো!’

কিন্তু টাকাটা জলে যায় নি। বরং চোখ ভরেছে জলে। ১৫ মিনিট পর জিল্লুর ফিরেছে ওর নিজের পছন্দের শাড়ি হাতে। মায়ের শাড়ি।

আর এসেই বলল, ‘আমার গিপট কই?’

উপহার দিয়েছি। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে বলেছি…..মাকে শাড়িটা দিয়ে বলবি, তার কোন এক অচেনা ছেলে শাড়িটা দিয়েছে।

অফিসারদের কাঁদতে হয় না। কাঁদতে হয়তো হয় না। তবুও কাঁদি। মানুষের দুঃখে কাঁদি। সবার আনন্দে হাসি। ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হতে পারি, তবে পবিত্র ঈদের একাত্ম হওয়ার শিক্ষাটা কি আমারও নয়? নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সুখের খোঁজই তো অপার প্রশান্তির পবিত্র ঈদ।

ঈদ মোবারক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View