চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আন্দোলন ‘ষড়যন্ত্র’ নয়!

সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি আন্দোলনের ষড়যন্ত্র করছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রীর দাবি, বিএনপি ও তাদের দোসরেরা আরও আন্দোলন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটির আয়োজনে গত ১৮ আগস্ট রাজধানীর এক আলোচনায় এমন মন্তব্য করলেন ওবায়দুল কাদের।

তার আরও দাবি, ‘বিএনপি ও তার সাম্প্রদায়িক দোসরেরা ভর করেছিল কোটা আন্দোলনের ওপর। লন্ডন থেকে নির্দেশনা এসেছে। ভয়ংকর আরও কিছু হতে পারত, কিন্তু সরকার নাইসলি পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করেছে এবং সেটা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’ একই সময়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা এখনো প্রস্তুত। আমরা জানি, আরও এ রকম আন্দোলন করার চক্রান্ত আছে। গোপন গোপন বৈঠক হচ্ছে, দেশে হচ্ছে, বিদেশে হচ্ছে।’

ওবায়দুল কাদেরের এমন মন্তব্য থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলন সহ সাম্প্রতিক সময়ের অরাজনৈতিক বিভিন্ন আন্দোলন নিয়ে সরকারের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। সরকার আন্দোলনগুলোকে অরাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখছে না, সে ইঙ্গিতই দিলেন তিনি। অথচ এই আন্দোলনগুলোকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আন্দোলনের পর্যায়ে ফেলা যায় না, যদিও সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে রাজনৈতিক চাল প্রয়োগ করতে হয়েছে, এবং সেখানে তারা সফলও হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে ক’মাস আগে ঢাকাসহ দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। সেই আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠকের পরেও আন্দোলনকারীদের বিদ্রোহী অংশ ফের আন্দোলনে নামে। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা সংস্কারের দাবির বিপরীতে কোটা বাতিলেরই ঘোষণা দেন। এরপর এনিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে কমিটিও গঠিত হয়। মাসের পর মাস চলে গেলেও এনিয়ে আর অগ্রগতি হয়নি। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর অবস্থান থেকে সরে যান। কোটা বাতিলের ঘোষণা সংসদে দিলেও তিনি পরে জানান, কোটা বাতিল সম্ভব নয়; কারণ এনিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে।কোটা-আন্দোলন

একটা সময়ে আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরে যায়। পরে গত রমযানের ঈদের পর ফের আন্দোলনের সম্ভাবনা জাগলেও প্রশাসনিক বিভিন্ন পদক্ষেপে আন্দোলনকারী নেতাদের অনেকেই হয়রানির শিকার হয়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল বিশেষত বিএনপি-জামায়াতের যোগাযোগ রয়েছে, তারা এই আন্দোলন নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে এমন অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগটা এতখানি জোরপ্রচার পায় যে আন্দোলনের গতি স্তিমিত হয়, এবং একটা সময়ে এই আন্দোলনটাই ইতিহাস হয়ে যায়। কোটা ব্যবস্থা যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে যায়।

কোটা সংস্কার আন্দোলন রাজপথ থেকে সরে যাওয়ার পর অন্য এক আন্দোলনে কেঁপে ওঠে পুরো রাজধানী, এর প্রভাব পড়ে সারাদেশেও। এ আন্দোলন নিরাপদ সড়কের দাবিতে। এই দাবিতে রাজপথে নেমে আসে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা, সারাদেশে পায় ব্যাপক জনসমর্থন। শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে ওই আন্দোলনের সময়ে কিছু প্রতীকী কর্মসূচি পালন করে। রাস্তায় তারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের মত কাজ করে, গাড়ির কাগজপত্র ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার মত কিছু কাজও করে। তাদের এই কাজের সময়ে কিছু ভয়ঙ্কর বাস্তবতা চোখের সামনে চলে আসে। অধিকাংশ গাড়ির কাগজপত্রে ত্রুটি ধরা পড়ে, ড্রাইভিং লাইসেন্সহীন অধিকাংশ চালকের ছবি উপস্থাপিত হয়। যে পুলিশ সদস্যরা অন্যদের আইনের কথা বলে, আইন মানতে বাধ্য বলে তারা নিজেরাই আইনকে তোয়াক্কা করছে না বলে প্রতিভাত হয়।

এই সময়ে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী তোফায়েল আহমদের গাড়ি আইন ভঙ্গ করে উলটো পথে চালনায় শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে পড়ে, তিনি ঠিক পথে গাড়ি নিয়ে যেতে বাধ্য হন। মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর গাড়ির চালকের লাইসেন্স না থাকায় মন্ত্রী অন্য গাড়ি ধরতে বাধ্য হন। ডিআইজির গাড়ির কাগজপত্র নাই বলে ধরা পড়ে, সাংসদের গাড়িরও একই অবস্থা। এছাড়াও অনেক পুলিশ সদস্যেরও একই অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া পুলিশ সদস্যদের গাড়ির কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স সাথে নিয়ে বের হওয়ার কথা বলেন। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন যে প্রশাসন সহ সর্বমহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে এ থেকে প্রমাণ হয়।শিক্ষার্থী বিক্ষোভ-আন্দোলন

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ওই সময়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করে। দেশের পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেপথ্যে সরকারের মন্ত্রিপরিষদের দুই সদস্য শাজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা এই সময়ে আলোচনায় আসেন। মশিউর রহমান সে সময়ে কোন কথা না বললেও আন্দোলনের আগে-পরে বরাবরের মতই সরব ছিলেন শাজাহান খান। একটা সময়ে ধর্মঘটের সমাপ্তির আশ্বাসও দেন পরিবহন শ্রমিক নেতা ও মন্ত্রী শাজাহান খান, এবং ধর্মঘট ঘোষণা দিয়ে শুরু না হলেও ঘোষণা দ্বারা শেষ হয়।

Advertisement

শিক্ষার্থীদের এই নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের শুরু রাজধানীর একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুই শিক্ষার্থীর ওপর দিয়ে বাস উঠিয়ে দিয়ে তাদের হত্যার কারণে। একই দিন ঘটনার কিছু সময় পর এই বাসচাপার ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকেরা যখন পরিবহন শ্রমিক নেতা ও নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের মন্তব্য জানতে চান মন্ত্রী তখন অট্টহাসি হেসে ভারতে দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু নিয়ে কোন কথা হয় না বলে মন্তব্য করেন। মন্ত্রীর এই বিদ্রূপাত্মক উক্তি আগুনের ঘৃতাহুতি দেয়, সহপাঠী হারানো বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখি মাঠে নামে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সে সময় নয় দফা দাবি উত্থাপন করে। একটা সময়ে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেয় সরকার। ইত্যবসরে এই আন্দোলন পুরো ঢাকা সহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগও দৃশ্যপটে হাজির হয়। তারা শক্তি প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের হটিয়ে দেওয়ার মিশনে নামে, এতে করে আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে নিজেদের সম্পৃক্ত করে।শিক্ষার্থী বিক্ষোভ-আন্দোলন

আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তৃতিতে সরকারের রাজনৈতিক বিরোধী একটা অংশও এতে যোগ দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এক টেলিকথন সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সরকারি প্রচারমাধ্যম বিটিভিতে আমীর খসরুর টেলিকথন প্রচারিত হয় ব্যাপকভাবে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় অভিনেত্রী নওশাবাকে। গ্রেপ্তার করা হয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে। ওই সময়ে শহিদুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় দেশবিরোধী ‘অপপ্রচার’ চালানোর। অথচ শহিদুল আলম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরাকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেটা একজন সাধারণ নাগরিক দিতেই পারেন, জানাতে পারেন তার মতামত-বিশ্লেষণ। তবু শহিদুলকে গ্রেপ্তার করেছে সরকার স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে। তিনি যেসব কথা বলেছেন সে কথাগুলো দেশের নিরপেক্ষ চিন্তার নাগরিকেরা সচরাচর বলে থাকেন।

শহিদুলের এই গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নোবেল বিজয়ী ১১জন বিশিষ্ট ব্যক্তি তার মুক্তির দাবি জানিয়ে হয়রানির দাবিও জানিয়েছেন। তবু এনিয়ে সরকার ভ্রুক্ষেপ করে নি। শহিদুলের গ্রেপ্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও তাঁর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে গেছে। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে রাস্তায় নামা এই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সরকার রাজনৈতিক মনে করে বসে আছেন। তাদের প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোসহ মন্ত্রী ও দায়িত্বশীলদের বক্তব্যগুলো সে ইঙ্গিতই দেয়। অথচ এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার কোন দরকার ছিল বলে মনে হয় না।শহীদুল আলম-আন্দোলন

সরকার পতনের কোন উদ্দেশ্য ছিল না আন্দোলনে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের যে নয় দফা দাবি ছিল সেখানেও ছিল না সরকার পতনের উদ্দেশ্য, এমনকি যে মন্ত্রী দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকেও অমানবিক ঢঙয়ে বিদ্রূপ করেছেন তারও পদত্যাগের দাবি ছিল না।

কোটা আন্দোলন কিংবা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সহ স্বতঃস্ফূর্ত যেসব আন্দোলন সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশকে নাড়া দিয়েছে সেসব আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল না সেখানে সরকারের বিরুদ্ধাচরণও। এই আন্দোলনকারীরা নিজেদের অরাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রমাণে জাতির জনকের ছবি নিয়ে রাস্তায় নামলেও এটা সরকারের দায়িত্বশীলদের চোখে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তারা এই আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের বিভ্রান্ত করতে সরকারের এই ভূমিকা হতাশার। এই আন্দোলনগুলোতে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে সরকার হয়ত নিজেদের বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা হওয়ার নয়। আখেরে এর ফল সরকারের অনুকূলে নাও আসতে পারে।

সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া আদায়ে রাস্তায় উপস্থিতি জনিত সকল আন্দোলনই অরাজনৈতিক, এবং এইসব অরাজনৈতিক আন্দোলনে কোন রাজনৈতিক দলের উসকানি দেওয়ার যে অভিযোগ সেটাই হয়ত অন্য কোন ষড়যন্ত্র; মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করছে না, মন্ত্রী হয়ত সেটা জানেন বা জেনেও না জানার মতো অবস্থায় আছেন। মন্ত্রীদের দৈনন্দিন কাজগুলো কঠিন ও চ্যালেঞ্জের। ‘চ্যালেঞ্জিং টাইমস’ পার করা মন্ত্রী হয়তো সাধারণ জনগণ থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন বলে জনগণের মনের ভাষা ধরতে পারছেন না। অথচ চ্যালেঞ্জিং টাইমসের চ্যালেঞ্জ জয়ে এটা তার খুব দরকার ছিল!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)