চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আজ এই রাতটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতে ফেলার পর...

শুরুতেই বলে নেই, এই লেখাটা ম্যাচ রিপোর্ট নয়! আবার ম্যাচ নিয়েই। ম্যাচ রিপোর্ট ভেবে কেউ পড়তে শুরু করলে যেমন হতাশ হতে পারেন, বাড়তে পারে প্রশ্নও! আবার লেখাটি যখন আগাগোড়া মহাকালের সাক্ষী হয়ে যাওয়া এক ম্যাচ ঘিরে, তখন বেশিকিছু না ভেবে কেবল পড়ে ফেলাই যায়! লেখাটা যে ঐ, ঐ ম্যাচটা নিয়ে, বুড়োকালে স্মৃতির অতল ঘেঁটে যেটার জম্পেশ গল্প ফাঁদা যাবে এভাবে… যেদিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ।

তবুও একটা নাম তো থাকা চাই। কী নাম দেয়া যায় তবে এই লেখাটার? একটা বিশ্বকাপ জেতা মনের খেরোখাতা? আচ্ছা, থাক!

বিজ্ঞাপন

কী লেখা যায় আজ? কী ভাবছি, কেমন অনুভব হচ্ছে, এসব? নাকি টাইগারপ্রেমীরা কেমন ভাবতে পারেন, কেমন অনুভব হচ্ছে তাদের, তাদের টলটল চোখে কতশত খুশির অনুরণনের ছোটাছুটি, অনুমান করার চেষ্টা? একটা বিশ্বকাপ জিতে ফেলার পর মনের ভাষাটা কী সত্যিই লিখে ফেলা যায় সবটুকু? সামান্যটুকু? বিশ্বকাপ জেতা বুঝি এতই সস্তা! মন চাইল আর লিখে দিলাম, জিতেই গেলাম।

একটা বিশ্বকাপ জিতে ফেলা নিশ্চয় এতটা সরলরৈখিক পথরেখা হয়। চড়াই-উতরাই, ভাঙা-গড়া, কঠোর প্রস্তুতি-প্রজ্ঞা-প্রত্যয়, ব্যর্থতা-সাফল্য, মুষড়ে পড়া, আবার ঘুরে দাঁড়ানো, বাথরুমে আটকে নিথর বসে থাকার পর মিথ্যেমিথ্যি ফ্ল্যাশ চেপে চোখ মুছে আসা, দেখা না দেখা এমন কত গোপন গল্পের সমাহারের মিশ্রণ মিলেই তো এই বিশ্বকাপ ট্রফি। যেটা এনেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল।

আজ বরং থাক অন্যসব কথা তাই! কথা হোক শুধু আকবর-অভিষেকদের নিয়ে। লাল-সবুজদের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্মৃতি রোমন্থন করার সুযোগ দেয়া যুবা টাইগারদের নিয়ে। আপনার-আমার সবার মনের কথাই তো সুবাস ছড়াবে, লাল-সবুজের এই নক্ষত্রদের কিছু কথা বলতে পারলেই। বিশ্বকাপ তো জিতেছে আসলে একটি মন, একটি স্বপ্ন, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের চাওয়া নিয়ে বোনা একটিমাত্র স্বপ্ন।

বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ এনে দেয়া প্রথম কোনো দলের অধিনায়ক আকবর আলী দেশ ছাড়ার আগে বলে গিয়েছিলেন, বিশ্বকাপ জিতে ফিরতে পারে এই দলটা। কেনো, কী আছে এই দলটার মজ্জায়, বলে গিয়েছিলেন সেসবের কিছুও। বাকিটুকু তিনি আর তার সতীর্থরা বলেছেন সাউথ আফ্রিকার সবুজ গালিচা মাঠের ইঞ্চি ইঞ্চি জুড়ে দৌড়ে-দাপিয়ে।

গত দুবছরে অনেক পরিকল্পনা এঁটে, অনেক ম্যাচ খেলে-জিতে, অনেক ভুল করে-শুধরে এগোনো দলটা বিশ্বকাপের আয়োজক সাউথ আফ্রিকার মাঠেই কোনো সিরিজ আয়োজন করতে পারেনি বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে। তাই আসরের মাসখানেক আগে যাওয়া। ভালো প্রস্তুতি নিতে। ক্রিকেটীয় ভাষায় কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে।

মানিয়ে নেয়ার ঝাঁজে প্রথম পোড়ে জিম্বাবুয়ে। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে। পরের ম্যাচে জ্বলে অঙ্গার বাছাই খেলে কোয়ালিফাই করা স্কটল্যান্ড। তারপর পাকিস্তান ম্যাচে খানিকটা ধাক্কা। ব্যাটিং বিপর্যয় বা সতর্ক সংকেত। বৃষ্টিতে ভেস্তে যাওয়া ওই ম্যাচে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেও শ্রেয়তর রানরেটে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ।

ব্যাটিংয়ে বারোটা বাজার অ্যালার্মিং পাকিস্তান ম্যাচটা তাঁতিয়ে দিল টাইগার যুবাদের। যে উত্তাপে কোয়ার্টারে উড়ে যায় স্বাগতিক সাউথ আফ্রিকা। স্পিনার রাকিবুল হাসান হ্যাটট্রিক এনে দেন। সেমিতে নিউজিল্যান্ডকে একপেশে খেলে হারিয়েছে বাংলাদেশ। ঠাণ্ডা মেজাজে সেঞ্চুরি করে আসা মাহমুদুল হাসান জয় পরিচয় রাখেন ক্রিকেট মেধার।

আসে ফাইনালের টিকেট। দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো টাইগার দল বিশ্বকাপের ফাইনালে। বাংলাদেশের আগেই শিরোপা মঞ্চে ভারত। যাদের বিপক্ষে ফাইনালে শুধু হতাশারই গল্প। জুনিয়ররা এশিয়া কাপে, সিনিয়ররা তো তিন তিনটি ফাইনালে হেরেছে। ব্যতিক্রম শুধু টিম টাইগ্রেস, ভারতে হারিয়েই তারা এনেছিল এশিয়া কাপ শিরোপা।

বিজ্ঞাপন

ফাইনালে ভারত হলেও তো হারার আগে হেরে বসার সুযোগ নেই। আকবর-জয়দের এই দলটার নার্ভ তো আরও বেশি করেই তেমন নয়। পচেফস্ট্রুমে ফাইনাল-মহারণে নেমে বাউন্সার, প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের দিকে তেড়ে যাওয়া, চোখ রাঙানি, জ্বালা ধরানো দেহভাষা, আম্পায়ারের সতর্কবার্তা, পরে একটা করে উইকেট তুলে মুখে আঙুল চেপে চুপ-চুপ উস্কানি!

কী ছিল না যুবাদের বোলিংয়ের সময়টাতে। বোলিং বৈচিত্র্য তো ক্রিকেটীয়ই, বেশ ছিল তার বাইরের ব্যাপার-স্যাপারও! আর ছিল ভেতরের আগুন। যে আগুনে বেশ পুড়েছে ভারতের ব্যাটসম্যানরা। ৫০ ওভারও খেলতে পারেনি। ১৬ বল হাতে রেখেই অলআউট, সেটিও ১৭৭ রানে।

জয়শালের ৮৮, ভার্মার ৩৮ আর জুরেলের ২২ রান। বাকিদের আর কাউকেই দুঅঙ্ক ছুঁতে দেয়নি বাংলাদেশ। দুঅঙ্ক তো দূরের কথা, ৫-পর্যন্তই পৌঁছাতে দেয়নি। অধিনায়ক গার্গের ৭ ছাড়া ৩-এর উপরে যেতে পারেননি কোনো ভারতীয়।

সেমিতে ছিলেন না, ফাইনালে একাদশে জায়গা পেয়েই বাজিমাত করেছেন অভিষেক দাস। ব্রেক-থ্রু এনে দেয়াসহ ৩ উইকেট নামের পাশে। ২টি করে ঝুলিতে পুড়েছেন শরিফুল ও সাকিব। রাকিবুলের ভাগে এক উইকেট।

বোলাররা তো মঞ্চ গড়েই দিয়েছেন। বাকি কাজটা তখন ব্যাটসম্যানদের। শুরুটা হল চ্যাম্পিয়নের মতোই। ৫৩ বলে ৫০ রানের ওপেনিং জুটি। উৎসবের আমেজ তখন ছড়িয়ে পড়ছে একটু একটু করে।

কিন্তু ম্যাচটা তো বিশ্বকাপের ফাইনাল, আর খেলাটা ভারতের বিপক্ষে। নিরস সমাপ্তি হয়ত মানবেন না স্বয়ং ক্রিকেট বিধাতাও! থরে থরে উত্তেজনা যেন থাকা চাই-ই চাই। তামিম ১৭ করে ফেরার পর আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান জয় ৮ রানে সাজঘরে হাঁটা দিলেন। সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন হ্যামস্ট্রিংয়ে টান পড়া ইমনকে।

এরপর বিষ্ণোইয়ের লেগস্পিনে এলোমেলো হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। হৃদয় রানের খাতা খুলতে পারেননি, শাহাদাত ফিরে চাপ বাড়িয়ে যান, শামীম ও অভিষেক উইকেট ছুঁড়ে সেই চাপ পাহাড়সম করে ফেলেন। ম্যাচে তখন পুরো ব্যাকফুটে বাংলাদেশ!

ব্যাকফুটে, কিন্তু পরাস্ত নয়। উইকেটে একপ্রান্ত আগলে দলনেতা আকবর, খোঁড়াতে খোঁড়াতেই ফিরলেন ইমন। দুজনে জমে গেলেন উইকেটে। জুটিতে যোগ করলেন ৪১ রান। এলোমেলো হয়ে পড়া পথ থেকে কিছুটা কাঁটা সরালেন।

দারুণ খেলতে খেলতে ৪৭ করে উইকেট দিয়ে এসে ইমন আবারও শঙ্কা জাগিয়েছিলেন। আকবর সেই মেঘকে আর জমতে দেননি। বিশ্ব জয়ে নোঙর ফেলেই থেমেছেন। ৩ উইকেটের জয় তোলার সময় ৪৩ রানে অপরাজিত বাদশা আকবর!

থরে থরে সাজানো রোমাঞ্চের শেষে তাই বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে বাংলাদেশ। ফাল্গুন যেন কটাদিন আগেই এসে পড়েছে এবার। হরেক ফুল আর সুবাস বিমোহিত করে ফেলেছে টাইগার ক্রিকেটপ্রেমীদের। পাখিদের গানে গানে নাচছে লাল-সবুজের প্রতিটি সমর্থক। আজ আর থামার কোনো কারণ নেই।

আজ শুধু তাই কিশোর কুমারের সেই অমর গানটাই যথার্থ, একটু শব্দ এদিক-ওদিক করে হলেও… আজ এই রাতটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো, আমাদের পড়বে মনে কাছে দূরে যেখানেই থাকো! …হাওয়ার গল্প আর পাখিদের গান শুনে শুনে, আজ এই ফাল্গুনে দুটি চোখে স্বপ্ন শুধু আঁকো। …আজ শুধু গান আর হাসাহাসি। আজ এই রাতটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো।