চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আকাশ অর্থনীতির অপার হাতছানি

সারা দুনিয়াতেই আকাশ অর্থনীতির পরিধি বেড়েই চলেছে। অর্থনীতির এই যাত্রায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রুটে নিত্য নতুন সব এয়ারলাইন্স যোগ হচ্ছে। বাড়ছে সেবার পরিধি। উড়োজাহাজে চড়ে গন্তব্যে যাওয়ার পরিমাণও দিনে দিনে বাড়ছে। উড়োজাহাজে চড়ার খরচও এখন নাগালের মধ্যে। উচ্চবিত্তের বাহন বিমান ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত এমনকি আমজনতার বাহনে। চলাচলের অন্য সব পথের মতোই এখন যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে আকাশপথ।

আকাশে পথে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে এখন অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বেসরকারী এয়ারলাইন্সগুলো। বাংলাদেশে অনেক আগে থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এই কাজটি করে আসলেও তাদের সেবা ও আসন সংখ্যা ছিল সীমাবিদ্ধ। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সগুলো অপারেশনে এসে খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে বিমান সেবার গন্ডি। শুধু ডমেষ্টিক গন্তব্যই নয় আন্তর্জাতিক রুটেও এখন যাত্রীদের ভরসা প্রাইভেট এয়ারলাইন্স। এখন প্রায় দশটি বিদেশ এবং আটটি দেশি বেসরকারি উড়োজাহাজ গন্তব্যে হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে প্রতিদিনই ফ্লাই করছে । আর বিমান টিকেট কাটার সেই আগের দিনের ঝামেলাও এখন আর নেই। হাতের মুঠোয় মুঠোফোনের বাটন টিপলেই ঘরের দরজায় এসে হাজির বিমানের টিকেট।

উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সিভিল এভিয়েশনের হিসাবে দুই হাজার আঠারো সালে দেশের সব কটি বিমানবন্দর থেকে প্রায় এক কোটি যাত্রী দেশে বিদেশে যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে বিদেশে যাতায়াত করা যাত্রী ছিলেন বিরাশি লাখ পঁয়ষট্টি হাজার। আর হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী ছিলেন আঠারো লাখ একুশ হাজার। এই হিসাব থেকে পরিষ্কার যে যত লোকে বিদেশে যাতায়াত করছেন তার চার ভাগের এক ভাগে যাত্রী অভ্যন্তরীণ রুটে যাতায়াত করেছে। প্রতিবছর এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

বেসরকারি উড়োজাহাজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রিজেন্ট এয়ারওয়েজ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমরান আসিফ বলেন , ‘দুই হাজার বার তেরো সালে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী ছিলেন সাড়ে ছয় লাখ, দুই হাজার পনের সালে তা হয় সোয়া নয় লাখ। দুই হাজার সতের সালে যাত্রী বেড়ে হয় সাড়ে বারো লাখ। আর দুই হাজার উনিশ সালে তা বেড়ে হয় আঠারো লাখ একুশ হাজার। এই হিসাবে দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ রুটে ছয় বছরে যাত্রী বেড়েছে তিন গুণের বেশি। যার আশি শতাংশ যাত্রীই বহন করেছে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা। আন্তর্জাতিক রুটেও বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো ভাল করছে। ’

এই বিষয়ে বাংলাদেশের অন্যতম একজন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ মনিটর এর সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘উড়োজাহাজ পরিচালনা সংস্থাগুলোর হিসাবে দেশি বিদেশি মিলে উড়োজাহাজে যাত্রী পরিবহনের বাজার প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের। এই বাজারের বিশ থেকে বাইশ শতাংশ মাত্র দেশি উড়োজাহাজ সংস্থার দখলে, বাকি সাতাত্তর থেকে আটাত্তর শতাংশই বিদেশি উড়োজাহাজের প্রতিষ্ঠানের হাতে। দেশীয় এয়ার লাইনগুলোর ভাল করার অনেক সুযোগ রয়েছে আমোদের হাতে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে সবাই মিলে।’

অভ্যন্তরীণ রুটে যে চারটি সংস্থা উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে তার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশে এয়ারলাইন্স। বেসরকারি তিনটি সংস্থা হলো ইউএস বাংলা এয়ারলাইন, নভোএয়ার ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। দুই হাজার আঠারো সালে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে ছেচল্লিশ হাজার নয়শো আটাশিটি ফ্লাইট যাতায়াত করেছে। যার বেশির ভাগই বেসরকারি সংস্থার উড়োজাহাজ পরিচালনা করেছে।

বাংলাদেশে প্রাইভেট এয়ারলাইন্স যাত্রা শুরু করে উনিশো পঁচানব্বই সালের দিকে। মোট এগারোটি প্রাইভেট এয়ারলাইন্স বিভিন্ন সময় লাইসেন্স পেলেও এখন টিকে আছে মাত্র তিনটি।

উনিশো পঁচানব্বই সালে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে লাইসেন্স পায় অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন। উনিশো সাতানব্বই সালে তারা যাত্রী পরিবহন শুরু করে। তবে এক বছরও সেটি টিকে থাকেনি। একে একে বন্ধ হয়ে যায় জিএমজি এয়ারলাইন্স, এয়ার পারাবাত, এয়ার বাংলাদেশ, জুম এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার ও রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইন্স। এই এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে শুধু জিএমজি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করেছে৷ তবে এর কোনোটি এখন আর চালু নেই। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ যাত্রা শুরু করে এগারোটি উড়োজাহাজ নিয়ে। লিজে আনা এগারোটি উড়োজাহাজের সব কটি অকার্যকর হয়ে যায়। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করেও টিকে থাকতে পারেনি ইউনাইটেড।

বেসরকারি এয়ারলাইন্স বলতে এখন ইউএস বাংলা, নভোএয়ার এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজ টিকে আছে। নেপালে বাংলাদেশের ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পর বেসরকারি এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা এবং যাত্রীসেবা নিয়ে সাময়িক কিছু আলোচনা হয়েছিল৷ কিন্তু তার নেতিবাচক কোনো প্রভাব এই ব্যবসায় পড়েনি। ইউএস বাংলার এখন সাতটি অভ্যন্তরীণ এবং আটটি আন্তর্জাতিক রুটে, নভোএয়ার সাতটি অভ্যন্তরীণ এবং একটি আন্তর্জাতিক রুটে৷ রিজেন্ট এয়ার দুটি অভ্যন্তরীণ এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশে আমিরাত অপারেশনের ম্যানেজার সাঈদ আব্দুল্লাহ মিরান বলেন: বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর যাত্রীসেবা অনেক ভালো। কারণ, আন্তর্জাতিক  এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই তাদের যাত্রী পেতে হয়। যাত্রীসেবার প্রথম শর্ত হলো শিডিউলমতো ফ্লাইট অপারেশন। দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর অনবোর্ড সার্ভিসও বেশ মানসম্পন্ন। সে কারণেই দিন দিন যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে ফ্লাইটের সংখ্যাও বাড়ছে। আগে যেখানে দিনে একটি ফ্লাইটও চলতো না, এখন সেখানে দিনে দশ বারোটাটা ফ্লাইট চলছে। ’

এতো যাত্রী থাকার পরও কেন বাংলাদেশে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? কেন ব্যবসা করতে পারছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে জিএসএ এয়ার এশিয়ার পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চাকলাদার বলেন: ‘দশ বছরে উড়োজাহাজের ভাড়া বাড়েনি, বরং কমেছে। দুই হাজার বারো সালে ঢাকা চট্টগ্রাম রুটের ভাড়া ছিল সর্বনিম্ন চার হাজার টাকা। এখন সেই ভাড়া দুই হাজার সাতশো টাকা। সব রুটে একই অবস্থা। যাত্রী ধরতে সবাই ভাড়া কমিয়ে দেয়, এখন যাত্রী হারানোর ভয়ে সেই ভাড়া কেউ বাড়াতে পারছে না। অথচ এত কম ভাড়ায় কোনো উড়োজাহাজ সংস্থার চলা সম্ভব নয়। একটি প্রাইভেট এয়ারলাইন্স চালানোর জন্য যে ধরনের উদ্যোক্তা দরকার, যেমন দক্ষতা ব্যবস্থাপনা দরকার সেগুলো এখনো গড়ে ওঠেনি৷ ফলে কেউই টিকে থাকতে পারছে না৷ তারা মনে করছেন, দুটি কারণে এয়ারলাইন্সগুলো বন্ধ হয়েছে। একটি অব্যাহত লোকসান, অন্যটি ব্যবস্থাপনার ত্রুটি।’

নভো এয়ার এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারের ট্যাক্স, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মিটিয়ে বিমান সংস্থাগুলোর লাভ করে চলা একেবারেই অসম্ভব। পৃথিবীর সব দেশই নিজ দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর চার্জ কম নিয়ে থাকে, আমাদের উল্টো। এখানে চার্জ এত বেশি যে সব দিয়ে কোনো দিন লাভের মুখ দেখা যাবে না।’

রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমরান আসিফ বলেন, উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে গেলে নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রতিটি উড়োজাহাজের ইঞ্জিন ও ল্যান্ডিং গিয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এ রক্ষণাবেক্ষণের একটি পর্যায় হলো সি চেক। এই সি চেক নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ নেই। শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের ছাড়া আর কারও হ্যাঙ্গার নেই। সেই হ্যাঙ্গারের জন্য লাইনে থাকতে হয়। সময়মতো সেটা পাওয়া যায় না। অথচ এয়ারক্রাফটকে বসে রাখা যায় না। বসে থাকলেই লোকসান গুনতে হয়। ’

বেসরকারি উড়োজাহাজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, উড়োজাহাজ পরিবহন খাত নিয়ে সরকারের কোনো ভাবনা নেই। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ট্যাক্স আদায় করেই ক্ষান্ত। অথচ লাল লাখ মানুষ এই সেক্টর ব্যবহার করছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজি এর সঙ্গে যুক্ত।

তারা বলছেন, এই সেক্টরের কোনো নীতিমালা নেই। গত বাইশ-তেইশ বছরে সরকার বলতে গেলে এর জন্য কিছুই করেনি। যা হয়েছে তা উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো নিজেরাই করেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো জ্বালানি তেলের যে দাম দেয়, তা পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আবার অনেক দেশে অভ্যন্তরীণ রুটের ছোট উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং পার্কিং ফ্রি করা থাকে। এটাও ফ্রি করে দেওয়া হোক।

বিজ্ঞাপন

নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন: ‘উড়োজাহাজের ভাড়া বাড়িয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খরচ জ্বালানিতে। অভ্যন্তরীণ রুটের ক্ষেত্রে সেই জ্বালানি আন্তর্জাতিক রুটের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। জ্বালানির পাশাপাশি ট্যাক্সও কমাতে হবে। তা না হলে শুধু এয়ারলাইন্স ব্যবসা করে কেউ টিকে থাকতে পারবে না। ‘

ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শিকদার মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ তাদের অপারেশন সম্পর্কে বলেন- ‘ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রা শুরু দুই হাজার চৌদ্দ সালের সতের জুলাই। প্রথম ফ্লাইট ছিল ঢাকা যশোর রুটে। ছিয়াত্তর আসনবিশিষ্ট দুটি ড্যাশ আট কিউ চারশো উড়োজাহাজ দিয়ে উড়োজাহাজ পরিচালনায় নামে সংস্থাটি। শুরু থেকেই নিজস্ব কাটারিং, নিজস্ব টেইলারিংসহ ইন হাউস ট্রেনিং সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ইন ফ্লাইট সার্ভিস চালু করে ইউএস বাংলা।

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, যশোর, সৈয়দপুর, বরিশাল, রাজশাহী রুটে প্রতিদিন ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স যাত্রা শুরুর দুই বছরের মধ্যে পনের মে দুই হাজার ষোল তারিখে ঢাকা কাঠমান্ডু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে ঢাকা থেকে কলকাতা, চেন্নাই, মাসকাট, দোহা, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও গুয়াংজু রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা, চেন্নাই, দোহা ও মাসকাট রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস বাংলা। ইউএস বাংলাই একমাত্র বিমান সংস্থা, যারা চীনের কোনো গন্তব্য গুয়াংজু ও ভারতের চেন্নাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

বর্তমানে ইউএস বাংলার বিমানবহরে চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, চারটি নতুন এটিআর ৭২-৬০০ ও তিনটি ড্যাশ ৮ কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট রয়েছে। এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আরও দুটি আনকোরা এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট যুক্ত হবে। সব মিলে এ বছরের জুন নাগাদ মোট ১০টি নতুন এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট যুক্ত করবে সংস্থাটি।

বর্তমানে সপ্তাহে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে চারশটির বেশি ফ্লাইট পরিচালিত হয়। অভ্যন্তরীণ রুটে মোট যাত্রীসংখ্যার চল্লিশ শতাংশের বেশি যাত্রী বহন করছে ইউএস বাংলা। দেশে বিদেশে বর্তমানে প্রায় পনেরশো জন কর্মকর্তা কর্মচারী আছেন এ সংস্থায়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় দুই হাজার পাঁচ শ ট্রাভেল এজেন্ট রয়েছে ইউএস বাংলার। এ ছাড়া সারা দেশে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র আছে ত্রিশটি।

ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স শুধু যাত্রীই পরিবহন করে না সঙ্গে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যে কার্গো পরিবহন করে থাকে। ’

নভো এয়ার এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান তাদের অপারেশন নিয়ে বলেন- ‘তুসুকা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং নভোটেলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নভোএয়ারের যাত্রা দুই হাজার সাত সালে। শুরুতে ভাবনা ছিল কার্গো অপারেশন এবং বিভিন্ন এয়ারলাইনের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করা। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের ভাবনা তখনো ছিল না। দুই হাজার এগারো সালের শেষ দিকে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানিটি। এরপর দুই হাজার তেরো সালের নয় জানুয়ারি থেকে দুটো উড়োজাহাজ দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট শুরু করে। শুরুর গন্তব্য ছিল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও যশোর। আন্তর্জাতিক রুটে নামে দুই হাজার পনের সালের এক ডিসেম্বর থেকে। জেট দিয়ে অপারেশন শুরু করলেও টেকসই না হওয়ায় সেগুলো বিক্রি করে এটিআর ৭২-৫০০ মডেলের উড়োজাহাজ আনা হয়। এখন তাদের বহরে একই মডেলের সাতটি উড়োজাহাজ রয়েছে। প্রতি মাসে ষাট থেকে সত্তর হাজার যাত্রী বহন করছে নভোএয়ার।
উড়োজাহাজ সংস্থাটি প্রতিদিন ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছয়টি, চট্টগ্রামে ছয়টি, যশোরে পাঁচটি, সৈয়দপুরে পাঁচটি, সিলেটে দুইটি, বরিশালে দুইটি এবং রাজশাহী ও কলকাতায় একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

ভ্রমণকারীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের কলকাতা ও কক্সবাজারে ভ্রমণের জন্য দুই রাত তিন দিনের ভ্রমণ প্যাকেজ রয়েছে তাদের।

দুই হাজার তেরো সালের নয় জুন নভোএয়ার স্মাইলস নামে ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লাইয়ার প্রোগ্রাম শুরু করে। স্মাইলসের বিভিন্ন ধাপের সুবিধাগুলো হলো: অপেক্ষমাণ তালিকায় অগ্রাধিকার, সেলস কাউন্টার ও চেক ইন বা বোর্ডিংয়ে অগ্রাধিকার এবং অতিরিক্ত লাগেজ সুবিধা। এ ছাড়া টিকিটের জন্য মোবাইল অ্যাপ ও চেক ইন প্রক্রিয়া সহজভাবে সম্পন্ন করতে ওয়েব চেক ইন চালু করে। দুই হাজার চৌদ্দ সালে দেশের বেস্ট এয়ারলাইন হিসেবে পুরস্কার লাভ করে নভোএয়ার। প্রায় নয়শো কর্মী কাজ করেন এ সংস্থায়।’

রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমরান আসিফ তাদের সেবা সম্পর্কে বলেন- ‘জাহাজভাঙা শিল্প দিয়ে ব্যবসা শুরু হাবিব গ্রুপের। একে একে গড়ে ওঠে পাওয়ার প্ল্যান্ট ও সিমেন্ট কারখানা। তাদেরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচ জি এভিয়েশন লিমিটেড বা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ।

কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয় দুই হাজার দশ সালের জানুয়ারিতে, প্রথম যাত্রা শুরু হয় একই বছর দশ নভেম্বরে। প্রথমে দুটি ড্যাশ এয়ারক্রাফট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হয়। দুই হাজার তেরো সালে দুটি বোয়িং যুক্ত হয় বহর। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সূচনা হয় দুই হাজার তেরো সালের পনের জুলাই কুয়ালালামপুর ফ্লাইটের মাধ্যমে। এরপর দুই হাজার পনের সালে যুক্ত হয় আরও দুটি বোয়িং। তবে কিছুদিন অপারেশনের পর আগে আনা ড্যাশ দুটি বসে যায়। দুটির অপারেশন বন্ধ আছে। বহরে থাকা চারটি বোয়িংয়ের দুটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হ্যাঙ্গারে আছে। দুটি দিয়ে অপারেশন চালু আছে।

রিজেন্ট এয়ারওয়েজ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে মোট পাঁচটি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে চীন এবং হংকংয়ে পরিসেবা চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে। এয়ারক্রাফট সংকটের কারণে কাঠমান্ডু ও ব্যাংককের ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। অভ্যন্তরীণ রুটে চালু রেখেছে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম।

দুই হাজার বিশ সালে নভেম্বর মাসে এক দশক পূর্ণ হবে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের। দশক পূর্তিতে আরও চারটি এয়ারক্রাফট আনার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। দিল্লি, চেন্নাই ও দুবাইতে ফ্লাইট চালাতে চায় রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। তারা আশা করছে বর্তমানে যে সংকট আছে, তা ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাটিয়ে উঠবে।’

বাংলাদেশে সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্সের গ্রোথের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় ব্যবস্থাপক রিফাত কাদের বলেন, বাংলাদেশ তেত্রিশ বছর ধরে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স সেবা দিচ্ছে। কয়েকবছর আগেই আমরা আমাদের ক্যাপাসিটি বাড়িয়েছে। আমরা কোন দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দেই। এখন বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। তাই আমরা আরও বিনিয়োগের বিষয়ে ভাবছি। এখন প্রতি সপ্তাহে আমরা দশটি টি ফ্লাইট চালু রেখেছি এবং এর সংখ্যা খুব শিগগিরই আরও বাড়বে। ’

কাতার এয়ার ওয়েজের মার্কেটিং ডিরেক্টর বকশী মোহাম্মদ তৈয়ব তাদের অপারেশন নিয়ে বলেন- উনিশো পঁচানব্বই সাল থেকে আমরা এই দেশে ব্যবসা করছি। এখন আমরা প্রতিদিন তিনটি ফ্লাইট চালু রেখেছি। আর ষোল ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা চারটি ফ্লাইট চালু করবো। বাংলাদেশে প্রচুর ডিমান্ড আছে। এবং মানুষ কোয়ালিটি সার্ভিস চায়। আমাদের অনটাইম পারফরমেন্স একশত ভাগ। এটা আমাদের ষ্পেশালিটি। এই দেশে আমাদের বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ’

বাংলাদেশে আকাশ অর্থনীতির বিকাশে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা খুবই জরুরি, এই সেক্টর নিয়ে সরকার আরও ভাববে এবং নতুন নতুন পদক্ষেপ নেবে আর তাহলেই আকাশ অর্থনীতির বিকাশ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের জিডিপিতে এই সেক্টর আরও অবদান রাখতে পারবে বলে মনে করছেন এই সেক্টর সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন