চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত নিরাপদ প্রাণিখাদ্য প্ল্যানটেইন ঘাস

শেকসপিয়রের ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ নাটকের প্রথম অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যের কথোপকথনে প্ল্যানটেইন নামক এক ঔষধি গুল্মের উল্লেখ রয়েছে। যে গুল্মের পাতা ব্যথা-বেদনা নিরাময় করে। কথিত আছে, গ্রিক বীর আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে বিশ্ব জয় করে ফেরার সময় ইউরোপে নিয়ে আসেন প্ল্যানটেইন। ইউরোপ থেকে প্ল্যানটেইন যায় আমেরিকা, কানাডাসহ নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত। সেখানে এর পরিচিতি হয় white man’s footprint নামে। কারণ, তারা দেখল ইউরোপীয়রা যেখানে যায় সেখানেই জন্ম নেয় এ গাছ। তাই নেটিভ আমেরিকানদের কাছে প্ল্যানটেইন পায় এমন পরিচিতি।

প্ল্যানটেইনের বহুল প্রচলন নিউজিল্যান্ডে। গোখাদ্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের ডেইরি খামারগুলো প্ল্যানটেইন ব্যবহার করে আসছে অনেক আগে থেকেই। আমি প্ল্যানটেইনের পাতা প্রথম দেখি জাপানে। ২০০৯ সালের জুনে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে গিয়েছিলাম জাপানের ইউয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সাক্ষাৎ পাই বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ড. আল মামুনের। তিনি পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করছিলেন অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত পশুখাদ্য নিয়ে। তখন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে পশু মোটাতাজাকরণে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রমোটার। আর তার বিরুদ্ধে বিকল্প ও প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনই জাপানের বিজ্ঞানীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেখানে প্ল্যানটেইন নিয়ে গবেষণা করছিলেন ড. আল মামুন। প্ল্যানটেইন মূলত শীতপ্রধান দেশেই জন্মে। ড. আল মামুন তখন বলেছিলেন তার স্বপ্ন প্ল্যানটেইন একদিন বাংলাদেশে চাষ হবে।

এ বছরের মার্চের শেষ দিকে ড. আল মামুন আমাকে মানিকগঞ্জ যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। মানিকগঞ্জের গিলন্ডে গিয়ে দেখি তিনি তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তর করে ফেলেছেন। বাংলাদেশের মাটিতে ও আবহাওয়ায় তিনি চাষ করেছেন প্ল্যানটেইনের।

আশির দশকে এ দেশে গবাদি পশু মোটাতাজাকরণের ক্ষেত্রে গ্রোথ প্রমোটার বা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। বর্তমানে গবাদি পশু মোটাতাজাকরণে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়ে গেছে বহুগুণ। আর এসব সিনথেটিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রাণিদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করে। পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে উৎপাদিত ডিম, দুধ ও মাংসের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ে। এসব খাবার খাওয়ায় মানুষের শরীরেও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। এতে মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, হৃদরোগজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিস, অটিজমসহ বিভিন্ন ভয়াবহ রোগ দেখা দিচ্ছে।

গ্রোথ প্রমোটার ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক অনুধাবন করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্বে ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই বিজ্ঞানীরা গ্রোথ প্রমোটারের বিকল্প পশুখাদ্য খুঁজতে থাকেন। গবেষণায় দেখা যায়, ঔষধি উদ্ভিদ অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প পশুখাদ্য হতে পারে। গ্রোথ প্রমোটার, অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে এ বিষয়ে কিছুটা হলেও সচেতনতা এসেছে। প্রতি বছরই কোরবানি ঈদ সামনে রেখে এ বিষয়ে আগাম সতর্কতা প্রচার করে আসছি। তবে এখন যারা গরু মোটাতাজাকরণ করছেন বা বাড়িতে প্রাণিসম্পদের খামার বা দুগ্ধ খামার গড়ে তুলেছেন, তাদের জন্য প্ল্যানটেইন নামের ঔষধি ঘাস হতে পারে দারুণ এক পশুখাদ্য।

ড. মামুন জানালেন, খামার পর্যায়ে এ ঔষধি গুণসম্পন্ন ঘাসের ফল খুব ভালো। এটি গরু-ছাগল থেকে শুরু করে পোলট্রির জন্যও সমান উপকারী। আগেই বলেছি, দুগ্ধশিল্পের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র নিউজিল্যান্ডে এ প্ল্যানটেইনের বহুল প্রচলন। আমাদের দেশের প্রাণিসম্পদের খাদ্য চাহিদা বিবেচনায় সেখান থেকেও আমদানির কথা রয়েছে। কিন্তু তা নির্ভর করছে এ প্রকল্পের ফলাফলের ওপর। প্ল্যানটেইনের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের জন্য উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষকবৃন্দ। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় প্ল্যানটেইনের বিশেষত্ব সম্পর্কে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ ইনস্টিটিউটের সাবেক ডিজি ড. খান শহীদুল হক জানান, গবাদি পশুকে তিন ধরনের খাবার দিতে হয়। একটি হচ্ছে আঁশজাতীয়, দ্বিতীয়টি দানাদার আর তৃতীয়টি সাপ্লিমেন্ট খাবার। যে খাবারে বিভিন্ন নিউট্রিয়েন্ট যুক্ত করা হয়। প্ল্যানটেইনকেও সাপ্লিমেন্ট খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ এতে আছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও মিনারেল। ফলে এটি খাওয়ার পর গবাদি পশুর দুধ ও মাংসের গুণগতমানে যেমন পরিবর্তন আসে, তেমন বাড়ে পরিমাণে। শহীদুল হক আরও বলেন, গবাদি পশুর মাংসে হেম আয়রনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সবচেয়ে বড় কথা গবাদি পশুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর বিকল্প হতে পারে প্ল্যানটেইন।

প্ল্যানটেইনের উপকারিতা সম্পর্কে ড. মামুন বলেন, গবাদি পশু-পাখির স্বাভাবিক খাবারের সঙ্গে খুব সামান্য পরিমাণে (পোলট্রিতে ১%, ভেড়ায় ৪%, গরুতে ৫-১০%) প্ল্যানটেইন ঘাস বা এর পাউডার মিশিয়ে খাওয়ালে প্রাণীর (হিট স্ট্রেস) কমিয়ে প্রোটিন সংশ্লেষণ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় মাংসের উৎপাদন, স্বাদ বৃদ্ধি পায় ও পচন রোধ করে। এটি হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে দুগ্ধবতী ও গর্ভবতী প্রাণীর দুধের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থ-সবল বাচ্চা জন্ম দেয়। একইসঙ্গে ফ্যাটি অ্যাসিডের (ওমেগা-৬ ও ৩) অনুপাত কমাতে সহায়তা করে। এতে মানুষের হার্ট ভালো থাকে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও আয়ুষ্কাল বাড়ায়। রক্তে কলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ক্যান্সার ও অটিজম প্রতিরোধ করে।

Advertisement

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের মোহাম্মদ রাহাত ও আহমেদ হৃদয়। তারা গবেষণার আলোকে দেখালেন মুরগিকে প্ল্যানটেইন খাওয়ানোর সুফল। দেখলাম প্ল্যানটেইন খাওয়ানো মুরগির মাংসের রং কমার্শিয়াল ফুড খাওয়ানো মুরগির মাংসের তুলনায় লাল বেশি। এর কারণ হিসেবে জানালেন এতে হেম আয়রনের পরিমাণ বেশি। আরও দেখলাম প্ল্যানটেইন খাওয়ানো মুরগির মাংসে অতিরিক্ত চর্বি নেই। অথচ কমার্শিয়াল ফুড খাওয়ানো মুরগির মাংসে প্রচুর চর্বি।

এলাকার কোনো কোনো খামারি পুষ্টিমানসম্পন্ন এ ঘাস গরুকে খাইয়েছেন। তারাও জানালেন এ ঘাসের উপকারিতা সম্পর্কে। মোটাতাজাকরণ কিংবা দুগ্ধ খামারি, সবাই পাচ্ছেন বেশ উৎসাহজনক ফল।

ড. মামুন জানালেন তার গবেষণা সম্পর্কে, কীভাবে শীতপ্রধান অঞ্চলের উদ্ভিদ প্ল্যানটেইনকে আমাদের দেশের আবহাওয়ায় চাষ করছেন। প্ল্যানটেইন চাষের জন্য তিনি বেছে নেন শীতকালকে। এটি ৬০-২৪০ সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। তবে ২০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে বেশি ঔষধি গুণ থাকে। মামুন বলেন, নভেম্বরের শুরুতে বীজ ছিটিয়ে দিতে হবে। কোনো ধরনের বিশেষ যত্ন ছাড়াই এটি যে কোনো ধরনের মাটিতে জন্মাবে। বীজ বপনের ৪৫-৫৫ দিন পর প্রথমবার কেটে নেওয়া যাবে এ ঘাস। এরপর প্রতি এক মাস পরপর কেটে নেওয়া যাবে। এর উৎপাদন ব্যয় কম। ফলে দেশের কৃষক এটি ব্যবহার করলে খুব কম খরচেই অধিক লাভবান হবে।

বিভিন্ন এলাকার খামারির সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সংকটের জায়গাতেই রয়ে গেছে গরুর খাদ্যের দাম। এখন যারা দুগ্ধ খামার করছেন, শুধু গরুর খাদ্যের দুর্মূল্যই তাদের লোকসানে ফেলছে। খাদ্যের খরচ আর দুধের মূল্যে তারা পুষিয়ে উঠতে পারছেন না। এ বছর কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে অনেক খামারিই এমন অভিযোগ করেছেন। মানিকগঞ্জের এ এলাকার কৃষকও বলেছেন, ধানের চেয়ে খড়ের দাম বেশি। এক মুঠির দাম পড়ছে ১০ টাকা। তবে প্ল্যানটেইনের মতো এমন পুষ্টিমান ও ওষুধি গুণসম্পন্ন ঘাস সুলভে পাওয়া গেলে পাল্টে যেত আমাদের দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রাণিসম্পদ পালনের হিসাব-নিকাশ।

ড. মামুন বলছেন, কৃষকের মাঝে ইতিমধ্যেই এ পুষ্টিকর ঘাসের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কৃষকই এ পুষ্টিকর ও লাভজনক ঘাস আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আমাদের দেশের প্রাণিসম্পদের বহুমুখী সম্ভাবনা থাকার পরও দিন দিন প্রাকৃতিক গোচারণভূমি কমে যাওয়ার কারণে খামারিরা শতভাগ ঘরোয়া খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত লাভের আশায় গরুকে গ্রোথ প্রমোটার বা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াচ্ছেন। এর বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রমোটার খাওয়ানো বা ইনজেকশন প্রয়োগ করা গরুর শরীরে অস্বাভাবিক পানি জমে যায়, একইভাবে ওই গরুর মাংসও স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। বিষয়গুলো সম্পর্কে কিছুটা জনসচেতনতা আসার পর এখন সবাই প্রাকৃতিক খাদ্য বিশেষ করে কাঁচা ঘাস খাওয়ানো গরু ও মাংসের সন্ধান করছেন। এ ক্ষেত্রে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ঘাস উৎপাদন যেমন খামারিরা আকর্ষণীয় এক উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, একইভাবে ড. আল মামুনের দীর্ঘ গবেষণার আলোকে চাষ করা এই প্ল্যানটেইনও দেখাচ্ছে আশার আলো। সরকার শক্তিসম্পন্ন, রোগপ্রতিরোধী ও পুষ্টিকর এ ঘাস উৎপাদনের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে প্রাণিসম্পদের পুষ্টি উন্নয়নে এটি হবে এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)