চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অভিমানে প্রস্থান নয়, শক্তি নিয়ে ফিরে আসুন

❛পড়বো, খেলবো, শিখবো❜- নীতিবাক্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ❛বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন❜ এর নাম জানে না, এমন মানুষের সংখ্যা এখন খুব কমই বলা যাবে। প্রতিষ্ঠার সাত বছর হলেও করোনাকালে এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটি নিজেদেরকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মানববাদকে শিরে ধরে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচিগুলো করোনা আক্রান্ত দেশে অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে। বিদ্যানন্দ করোনার শুরু থেকেই যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে তা অভূতপূর্ব।

এই সময়টা বিদ্যানন্দের, তারা ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এই করোনাকাল অতিক্রান্তের পর দেশ-মানুষ-পৃথিবী যখন স্বাভাবিক হতে শুরু করবে তখন এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা মানুষ স্মরণ করবে। মানুষের দুর্দিনে নিজেদেরকে প্রকাশ না করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বিদ্যানন্দ, তা অতুলনীয়।

বিজ্ঞাপন

২০১৩ সালে লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুভিত্তিক সাবেক পেশাদার ও সমাজকর্মী কিশোর কুমার দাশ স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। সমাজের অনগ্রসর শ্রেণি থেকে ওঠে আসা কিশোর স্বাভাবিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। সেই আন্তরিকতা থেকে গড়ে তুলেন এই প্রতিষ্ঠান। এক টাকায় আহার, এক টাকায় চিকিৎসা, এক টাকায় আইন সেবা, এক টাকায় স্যানিটারি প্যাড, শিক্ষাবৃত্তি, এতিমখানা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, অনাথালয়, গ্রন্থাগারসহ নানা সামাজিক কর্মসূচি পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিদ্যানন্দ করোনা দুর্গত দেশে বিনামূল্যে মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করছে। জেলায়-জেলায় খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। করোনাযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) বানিয়ে সেগুলো বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে। মসজিদ, মন্দির, হাসপাতাল, বাসস্টেশন, রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে জীবাণুনাশক ছিটিয়েছে। মানুষের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় অস্থায়ী হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেছে। ওসব জায়গায় সরবরাহ করেছে পানি, সাবান; নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে বিতরণের জন্যে তৈরি করেছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক। এছাড়া পুরো রমজান মাসজুড়ে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন বিভিন্ন এলাকায় দুস্থ পরিবারগুলোকে ইফতার ও সেহরি দিচ্ছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে আরও জানা যায়, করোনার কারণে নিম্ন আয়ের যেসকল মানুষ তাদের সর্বশেষ সঞ্চয় হারাবেন তাদের পুনর্বাসনের জন্যে প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্যে পুঁজির ব্যবস্থা, নতুন রিকশা ক্রয়, দরিদ্র নারীদের জন্যে গরু-বাছুর ক্রয়, কৃষকদের জন্যে বীজ-সারের ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, নারীদের সেলাই মেশিনের কিনে দেওয়ার পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।

এমন এক প্রতিষ্ঠান অদ্য বড়ধরনের এক সমস্যার মুখে পড়েছে বিশেষত বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশের পদত্যাগের ঘটনায়। যদিও শেষ পর্যন্ত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন জানিয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে এই পদত্যাগ গ্রহণ করা হচ্ছে না। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান-প্রধানের পদেই থাকছেন কিশোর কুমার দাশ। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পদ তাদের কাছে মুখ্য নয়। সত্যিই তো, পদ তাদের কাছে মুখ্য নয় বলে কিশোর কুমার দাশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তি ও গ্রুপ-পেজের কিছু মানুষের সমালোচনা কিংবা আপত্তির মুখে নিজের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ ছাড়তে সামান্য ভাবেননি।

কিছু মানুষের সমালোচনার মুখে তার এভাবে ভেঙে পড়াটা উচিত হয়েছে, কি হয়নি, এনিয়ে আলোচনার আগে অন্তত তার সৎ উদ্দেশ্য এবং ব্যক্তিগত প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা না থাকার যে চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে সেটা দুর্দান্ত এক উদাহরণ হয়ে থাকবে। পদের প্রতি মোহ নয়, ব্যক্তির চাইতে প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি শিরে তুলে ধরার যে প্রয়াস সেটা উদাহরণ হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

এবার আসা যাক, কারা তাদের সমালোচনা করছে, কেন করছে? বিদ্যানন্দের প্রাথমিক বক্তব্যে টের পাওয়া যায় ওখানে একশ্রেণির ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সংযোগ ছিল। ফাউন্ডেশনের নাম কেন বিদ্যানন্দ- এই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যখন বলা হয় ❛বিদ্যানন্দ নামটি দিয়েছেন এক মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট। ‘আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন’ স্লোগানে তিনি এই নাম দিয়েছিলেন। অনেকেই ব্যক্তির নাম থেকে বিদ্যানন্দ নামের উদ্ভব ভেবে ভুল করেন। এজন্য আমরা নামটাই পরিবর্তন করতে চেয়েছি, কিন্তু স্বেচ্ছাসেবকরা রাজি হয় না। বিদ্যানন্দের প্রবাসী উদ্যোক্তা সশরীরে খুব অল্পই সময় দিতে পারেন। ৯০ ভাগ মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরাই চালিয়ে যান বিশাল কর্মযজ্ঞ। তবুও উদ্যোক্তার ধর্ম পরিচয়ে অনেকেই অপপ্রচার চালায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে। সে সমস্যাও আশা করি সমাধান হয়ে যাবে। বিদ্যানন্দ-প্রধান গত মাসেই পদ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। বিষয়টি আমরা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম কোভিড-১৯ ক্যাম্পেইনের পরে। ত্যাগের উপর ভিত্তি করে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা। আর্থিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত ত্যাগে স্বেচ্ছাসেবকরা রচনা করে অনুপ্রেরণার গল্পগুলো। নিশ্চিত থাকেন, তাদের সে যাত্রা অব্যাহত থাকবে আগামীতেও। ক্ষমা চাচ্ছি এই হতাশার বার্তার জন্য। গত মাসের এই সিদ্ধান্তটি আমরা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম কোভিড-১৯ ক্যাম্পেইনের পর। কিন্তু অনেকগুলো পেজ থেকেই প্রচুর নেগেটিভ লেখা শেয়ার হচ্ছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্যাম্পেইনটি।❜ -এখানে এই ব্যাখ্যায় এটা পরিস্কার হয়ে যায় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অনেকেই সমালোচনা করছিলেন। এই সমালোচনায় নিশ্চিতভাবেই হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন কিশোর কুমার দাশ, যা তাকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল বলে ধারণা করা যায়।

খেয়াল করলে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ধর্মীয় অনুভূতির জিগির প্রবল। এই জিগিরকারীদের অধিকাংশই ফেসবুকীয় ধার্মিক জনগোষ্ঠী। ব্যক্তি জীবনে ধর্ম পালনে তারা কতখানি আগ্রহী এ আলোচনায় যাচ্ছি না, তবে এরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অতিমাত্রায় ধর্মীয় সংবেদনশীল। তাদের এই ধর্মীয় অনুভূতির প্রাবল্য নতুন কিছু নয়। এই দেশে বিভিন্ন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং জনহিতকর অনেক কাজে তাদের অধিকাংশই ধর্মীয় জিগির তুলে বাধা দিতে পিছপা হয় না। এটা আমাদের জন্যে নতুন কিছু নয়। অনলাইনে তাদের এই সমাজবিধ্বংসী ও নৈতিকতা বিবর্জিত রূপের প্রকাশ নতুন কিছু নয়। বিদ্যানন্দ-প্রধানের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে তাদের এই জিগিরকে তাই নতুন এবং অস্বাভাবিক কিছু ভাবছি না। এইধরনের ধর্মীয় অনুভূতির ন্যক্কারজনক প্রকাশকে যেখানে আমাদের গুরুত্বহীন ভেবে এগিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল সেখানে বিদ্যানন্দের কিশোর কুমার দাশের এখানে গুরুত্ব দিয়ে দেখাটাকেই অস্বাভাবিক ঠেকেছে। তিনি এই গোত্রভুক্ত মানুষের এইধরনের আচরণের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা ছিল। হয়ত পরিচিত ছিলেন কিন্তু বিদ্যানন্দের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে কিছুটা হলেও আবেগী হয়ে পড়েছিলেন। এই আবেগ তার ব্যক্তি পর্যায়ে রেখে পরক্ষণে ভুলে যাওয়ার উচিত ছিল, কিন্তু এখানে তিনি প্রভাবিত হয়ে গেছেন। এই প্রভাব থেকেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত।

এখানে তার প্রতি আমাদের অভিমান রয়েছে, তবে এজন্যে তাকে দায়ী করছি না। অভিমানের কারণ তিনি একজন যোদ্ধা, সম্মুখসারির যোদ্ধা; আর যোদ্ধাদের একটাই মিশন থাকে, এবং সেটা জয়ের। তিনি জয়ী হতে চান ঠিক, তবে তার পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত উদাহরণের নয়। এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তি পর্যায়ের আত্মত্যাগের হলেও সামষ্টিক পর্যায়ে এটা আত্মত্যাগের হয়নি। কারণ যে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে তিনি নিজের মেধা-মনন ও শ্রমের মাধ্যমে বিজয়ী করার মিশনে রয়েছেন সেখানে তার ব্যক্তিক সিদ্ধান্তের প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপরই পড়ে।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নাম কে দিয়েছেন- এই আলোচনারও দরকার নাই। এটা মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট দিয়েছেন, নাকি অন্য কেউ দিয়েছেন এটা আলোচনার দরকার ছিল না। দরকার ছিল না পুরো প্রতিষ্ঠানের কত শতাংশ স্বেচ্ছাসেবক কোন ধর্মাবলম্বী সেটারও প্রকাশের। কারণ এই প্রতিষ্ঠান ধর্মের নাম নিয়ে, ধর্মীয় কোনো কর্মসূচি নিয়ে তার বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছে না। মানববাদ যেখানে মুখ্য ধর্মবাদ সেখানে স্বাভাবিকভাবেই গৌণ। এই স্বাভাবিকতাকে মাথায় রাখা দরকার ছিল তার এবং বিদ্যানন্দের। আশার কথা বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠান-প্রধান কিশোর কুমার দাশের পদত্যাগকে গ্রহণ করেনি। তাদের কাছে এই পদত্যাগকে যৌক্তিক মনে হয়নি।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন মানুষের জন্যে কী করে চলেছে, তার স্বীকৃতি দেবে মহাকাল। কতিপয় সাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষের কটূক্তি, আপত্তি, সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া মানে তাদের কাছে নত হয়ে যাওয়া, তাদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া। স্বেচ্ছাসেবার ঔদার্য-আবেদন যাদের কাছে মূল্যহীন তারা সকল ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। চিন্তার দীনতা যাদেরকে অক্টোপাসের মত ঘিরে রেখেছে তাদের যেকোনো দাবিকে এমন গুরুত্ব দেওয়া বিদ্যানন্দের জন্যে মানায় না, কিশোর কুমার দাশের জন্যে মানায় না।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান রেখেই বলি আপনি অভিমানে ভুল করেছেন। বিদ্যানন্দ যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে পদত্যাগ গ্রহণ না করা মাধ্যমে, তাদের এই সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন। কিশোর কুমার দাশ আপনি অভিমানে পদত্যাগ করেছিলেন, এবার আরও শক্তি নিয়ে ফিরে আসুন। এই দেশ আপনাদের কাছ থেকে আরও অনেক কিছু চায়। আপনারা অভিমানে হেরে গেলে আমাদের বিজয়ী হওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)