চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অবিকল্প মোদী: অসাম্প্রদায়িকতার পরাজয় নাকি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য?

তীব্র বেকারত্বের মুখেও কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে পারেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। কৃষকের সংকট গেলো পাঁচ বছরে তীব্রতর হয়েছে। নোট বাতিলের ঘোরপ্যাঁচের খেলায় বিপর্যস্ত হয়েছেন সাধারণ মানুষ। পুরো দেশজুড়ে বিশেষ করে যেখানেই বিজেপির দাপট সেখানেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। মানুষে মানুষে হিংসা বেড়েছে। এমনকি শান্তির বাংলাতেও অশান্তির ছায়া গাঢ় হয়েছে ততোই, যতো প্রভাব বেড়েছে বিজেপির। বাংলার দুর্গা পূজার স্থানে জোর করেই প্রতিস্থাপন করা হয়েছে রামনবমী।

দলের মধ্যেও ছিলো নানামুখী টানাপোড়েন। লালকৃষ্ণ আদভানি এবং মুরলীমনোহর যোশীর মতো প্রবীণ নেতাদেরকে এবার মনোনয়নই দেননি মোদী-অমিত জুটি। মনোনয়ন পাননি লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজনও। এসব নিয়ে বর্ষীয়ান নেতারা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ ঝেড়েছেন। তবু তাদের নির্বাচনী প্রচারকাজে সম্পৃক্ত করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

আর বিরোধীদের তোপ ছিলো এবার সমান তালেই। ভারতের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে উত্তর প্রদেশের মায়াবতী-অখিলেশ যাদবের মহাজোট, পশ্চিমবাংলার মমতা ব্যানার্জি থেকে শুরু করে অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইড়ু-সবাই ছিলেন বিপক্ষে। বিপক্ষে তোপ দেগেছে সিপিআইএম-সহ বামফ্রন্টও।

কিন্তু তারপরও মোদি-অমিতের বিজেপি’র অভাবনীয় ভূমিধস বিজয়। এতোটাই, যে আগে থেকে কল্পনাও করা যায়নি। সবাই ধরেই নিয়েছিলেন, বিজেপি এককভাবে সর্বোচ্চ আসন পাবে, কিন্তু তা সরকার গড়ার জন্য যথেষ্ট হবে না। বিজেপিকে আশ্রয় করতে হবে শরিক দলগুলোর দাক্ষিণ্যের উপর। বিপরীতে কংগ্রেস গতবারের ৪৪ আসন থেকে বেড়ে শতাধিক হবে আর তার শরিক ও সমমনা সকল বিরোধী দলকে নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে সরকার গড়ার দাবি জানাবে। রুখবে বিজেপির সরকার।

লোকসভা নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে ভারতের বিরোধী দলগুলোর এ নিয়ে বৈঠক-দর কষাকষিও শুরু হয়ে গিয়েছিলো। সাত ধাপের নির্বাচনের শেষ ধাপের পরে এসে প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্থা ও মিডিয়ার বুথ ফেরত জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছিলো যে মোদির বিজেপি এককভাবেই সরকার গড়ার পথে রয়েছে। কিন্তু যেহেতু অতীতে বেশ কয়েকবার বুথ ফেরত জরিপ ভুল প্রমাণ হয়েছে, তাই কংগ্রেসসহ বিরোধীদের দৌড়ঝাঁপ থামাতে পারেনি ওই জরিপের ফল। ভারত-মমতা ব্যানার্জি-বিজেপি-প্রধানমন্ত্রী-নরেন্দ্র মোদি-রাহুল গান্ধী-মোদির রাজনীতিতে খরাকিন্তু ২৩ মে’র সকাল না গড়াতেই চারদিকে সব স্তব্ধ, সুনশান নীরবতা। কেবল গেরুয়া শিবিরেই উচ্ছ্বাসের ঢেউ। সে ঢেউ মাড়িয়ে সন্ধ্যার আগে নরেন্দ্র মোদি যখন এলেন জনসমক্ষে, বললেন- “আমার ফকিরের ঝুলি মানুষ ভরিয়ে দিয়েছে। আমি এর মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করবো।” এখানেই মোদির বিশেষত্ব। তার অনন্যতা। বিনয়। বিরোধীরা যেখানে নির্বাচনী প্রচারে উদ্ধত হয়েছেন, মোদি তার জবাব দিতেও থেকেছেন বিনয়ী। পশ্চিম বাংলার অধিপতি মমতা ব্যানার্জি যখন বলেছেন, “মোদির গালে গণতন্ত্রের থাপ্পড় দেবো”, প্রত্যুত্তরে মোদি বলেছেন, “দিদির থাপ্পড় আমার আশীর্বাদ হবে।”

বিনয়ের পরীক্ষায় হেরেছেন মমতা। হেরেছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীও। ভোটের আগে মোদি নিজেকে বলেছেন ভারতের জনগণের ‘চৌকিদার’। তাকে কটাক্ষ করে রাহুল বলেছেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে চোর বলাটা সম্ভবত ভালোভাবে নেননি ভারতের জনগণ। ভালোভাবে নেননি কংগ্রেসের অন্য নেতারাও। আজ তারাও বলছেন, এ স্লোগান ভুল ছিলো।
নরেন্দ্র মোদির বিনয়ের আরো প্রকাশ ভোটের ফলাফলের পর। যে জ্যেষ্ঠ নেতাদের দূরে ঠেলেছিলেন তিনি ভোটের আগে, ফল প্রকাশের পরপরই সেই আদভানি ও যোশীদের বাড়িতে গিয়ে প্রণাম ঠুকে এসেছেন। গেছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ‘বাঙালি বাবু’ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতেও। শ্রদ্ধার এই পরাকাষ্ঠা যদি মেকিও হয়, তাও মোদিকে এগিয়ে রাখছে অন্যদের তুলনায়। এই বিনয় ভোটে জেতার অন্যান্য উপাদানগুলোর মধ্যেও অনন্য।

বাংলাদেশের গেলো সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাই ছিলেন তার দল ও জোটের মুখ। কিন্তু তার বিপরীতে বিএনপি-জামায়াত-বিশ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সুপ্রিম বেগম খালেদা জিয়া যখন জেলে, দ্বিতীয় প্রধান তারেক রহমান বিদেশে পলাতক, তখন ওই দুই বিরোধী জোটের প্রধান মুখ কে- তা তারা প্রকাশ্যে বলতেই পারেননি। ফলে তারা নির্বাচনে জিতলে তাদের প্রধানমন্ত্রী কে হতেন- তা পরিষ্কার হয়নি মানুষের সামনে। নেতাবিহীন ওই দুই রাজনৈতিক জোট হালে পানি না পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিলো এটাও।

একইভাবে বিজেপির নরেন্দ্র মোদির বিপরীতে ভারতের সর্ববিরোধী জোটের মুখ কে হবেন তা পরিষ্কার করতে পারেননি তারাও। ভোটের আগে জোট, নাকি ভোটের পরে জোট-এ নিয়ে দ্বিধা তো ছিলোই। শেষ পর্যন্ত ভোটের আগে জোট গড়া সম্ভব হয়নি তাদের দ্বারা। ফলে বিজেপি বিরোধী সব ভোট এক ব্যালটে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন ভারতের বিরোধী রাজনীতিকরা। আবার ভোটের পরে জোট হলে তার নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তাও পরিষ্কার ছিলো না ফল বেরোনোর দিন পর্যন্ত। গ্রান্ড ওল্ড পার্টি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি তথা গান্ধী পরিবারের বর্তমান কান্ডারী রাহুল গান্ধী, নাকি উত্তর প্রদেশের ‘বুয়া‘ খ্যাত মায়াবতী, নাকি বাংলার মমতা! ঠিক করতে পারেননি তারা নিজেরাও। এই নেতা নির্ধারণের ব্যর্থতাও বিরোধীদের ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবার অন্যতম কারণ বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

ভারতের মানুষ একটি শক্তিশালী সরকার দেখতে চেয়েছেন। কারণ একদিকে পাকিস্তান, অন্যদিকে চীন, আর তার সাথে দেশের ভিতরেও উগ্র সশস্ত্র জঙ্গিবাদী শক্তির আশঙ্কা-এই পরিস্থিতিতে নানা মতের রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গড়া একটি ঝুলন্ত সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতোখানি ভূমিকা রাখতে পারতো তা নিয়ে সংশয় কাজ করেছে ভারতের ভোটারদের মাঝে। কংগ্রেস নিজেই যেখানে এককভাবে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখতেই পারেনি, সেখানে সাধারণ ভোটাররা তো তাদের উপর আস্থা রাখতে পারবে না-এটাই ছিলো বাস্তবতা। বিপরীতে মোদি-অমিত জুটির বিজেপি পরিষ্কারভাবে জোর গলায় বলতে পেরেছে-আমরাই ফিরছি। আর ভোটের আগে আগে পুলওয়ামার ঘটনাপ্রবাহ তথা পাকিস্তানভীতিকে পুঁজি করতে পেরেছেন মোদি ভালোভাবেই। ভোট চলাকালীনই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস তাদের ভারতীয় শাখা গঠন এবং কাশ্মির এলাকায় প্রদেশ গঠনের ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলো। ফলে এই ইসলামি জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীকে মোকাবিলা করতে একজন ‘শক্ত পুরুষ’ এর উপরই আস্থা রাখতে চেয়েছেন ভারতের মানুষ। হোক সে পুরুষও সাম্প্রদায়িক, থাক তার হাতেও গুজরাট দাঙ্গার রক্তের অভিযোগ!

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দুদের জন্য যে ভারতের জন্ম, সে ভারতের সিকিভাগ জনসংখ্যা এখন মুসলমান। সারা দুনিয়াজুড়ে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের জুজু দেখিয়ে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগাভাগির দাগ কাটতে পেরেছে সফলতার সাথেই। কিন্তু বিজেপি-বিরোধীরাও কি ধর্মকে নির্বাচনের হাতিয়ার করেননি? করেছেন। রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কাও গেছেন মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিতে। তাদের সাম্প্রদায়িক অস্ত্র ধারালো না হলেও ওই অস্ত্র তারা হাতে তুলেছেন। ঠিক যেন বাংলাদেশের জামায়াত-বিএনপি’র ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির বিপরীতে ধর্মাশ্রয়ীদের সাথে আওয়ামী লীগের একটু আপোসকামিতার মতো। কিন্তু ভারত যেখানে আজ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগাভাগিতে উন্মত্ত, গো-মাংসের উন্মাদনায় হিংসায় মত্ত, সেখানে ধর্মাশ্রয়ের ধারালো অস্ত্রের বিপরীতে ভোতা অস্ত্র কাজ করবে কেন? কাজ করেনি।

কাজ করেনি বামপন্থীদের নেতৃত্বে কৃষক অভ্যুত্থানও। দেশের বিভিন্ন অংশের বঞ্চনার শিকার কৃষকদের সংগঠিত করে দিল্লি-অভিমুখী লংমার্চ সংঘটিত করেও তো ভারতের বামপন্থীরা এবার হালে পানি পায়নি। বরং যে বাংলায় তারা ক্ষমতায় ছিলেন টানা ৩৪ বছর, যে ত্রিপুরায়ও ছিলেন প্রায় একই সময়কাল, সেই দুই রাজ্যে এবার তাদের ঝুলিতে শূন্য। দক্ষিণের কেরালায় তারা প্রাদেশিক সরকারের অধিপতি থাকলেও ঝুলিতে এসেছে মাত্র একটি আসন। কিছুদিন আগে কৃষক অভ্যুত্থান হলো ভারতের যে অংশে, সেখানকার বিধানসভা নির্বাচনেও তো তারা দাঁড়াতে পারেননি। বরং বামপন্থীদের সংগ্রামের ফসল সেসময় গোলায় তুলেছিলো কংগ্রেস। টানা তিনটি রাজ্যে বিধানসভা দখল করেছিলো তারা। আর এবারের লোকসভায় বামেদের সব ভোট গেছে রামের গোলায়।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবাংলায় বামদের যে পরিমাণ ভোট কমেছে, বিজেপির সে পরিমাণ ভোটই বেড়েছে। আবার ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর রাজ্যজুড়ে বামপন্থীদের যে সকল পার্টি অফিস দখলে নিয়েছিলো মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস, লোকসভায় নিজেরা হেরে বিজেপিকে জিতিয়ে আজ সেগুলো উদ্ধারে অনেকটাই সফল হচ্ছেন রাজ্যের বামপন্থীরা। অবশ্য নতুন করে আবার বিজেপির কাছেও পার্টি অফিস হারাতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু কোথায় যেন বাম-রামের নতুন সন্ধির গন্ধ! পশ্চিমবাংলা তথা ভারতের বামপন্থীদের তরফ থেকে সে কথা ঠারেঠোরে স্বীকারও করে নেওয়া হচ্ছে বটে।

গত আট বছরে মমতার ক্যাডার বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত বামদের যেভাবে মেরেছে, খুন-জখম-ধর্ষণ করেছে, সে পরিস্থিতিতে সিপিআইএম তথা বামপন্থী পার্টিগুলোর নেতারা নিচের স্তরের কর্মীদের কিংবা সমর্থক-ভোটারদের রক্ষা করতে পারেনি। কেউ কেউ তো লাল পতাকা ছেড়ে ঘাসফুলে মুখ ঢেকেছেন, বাকিরা উপরতলায় লড়াই করলেও নিচে নেমে হাল ধরেননি। ফলে মার খেতে খেতে নিচের তলার পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন বাঁচার তাগিদে তারা আশ্রয় খুঁজেছেন বিজেপির পদ্মফুলে।

বামপন্থীদের তরফ থেকে যদিও বলা হচ্ছে যে বামদের রামে ভর করাটা স্রেফ সাময়িক, কিন্তু ফেরাটা কি ততো সহজ হবে? বামরা সংগ্রাম করেছেন, করছেনও। কিন্তু তার ফল গোলায় তুলছে অন্যরা। কখনো কোথাও কংগ্রেস, কখনো কোথাও বিজেপি। ভুলটা কোথায়? বামরা কি তবে কেবল পুঁথিতেই আটকে থাকলেন? সময়ের সাথে মিলিয়ে মানুষের চোখের পরিবর্তিত ভাষা তারা পড়তে পারছেন না? নাহলে ত্রিপুরার ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রী কমরেড মানিক সরকার যেখানে সারা ভারতের মধ্যে সৎ মুখ্যমন্ত্রীর তালিকায় সবার উপরে ছিলেন, তিনিও কেন হারলেন?

পশ্চিমবাংলায় ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকে হারার পর গত আট বছরে বামফ্রন্টের কোনো মন্ত্রী-এমএলএ-এমপি’র গায়ে বহু চেষ্টা করেও কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার কোনো কালির দাগ লাগাতে পারেনি। অর্থাৎ, সততার পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ পূর্ণমান নিয়েই। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষকে আবার জয় করতে পারছেন না কেন? কেবল চটকদারি রঙচঙা রাজনৈতিক মোহই কি মানুষকে পথভ্রষ্ট রাখছে? নাকি বামদেরই কোথাও বড় ধরনের ঘাটতি আছে মানুষের মন পড়ার ক্ষেত্রে? ভারতের বামপন্থীদের সামনে সম্ভবত আজ সময় এসেছে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে ভাবার। সম্ভবত নেতৃত্ব নিয়েও।

কংগ্রেসের সভাপতি তথা গান্ধী পরিবারের বর্তমান কান্ডারী রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও দূরদর্শিতা নিয়ে কথা আছে এখনো। এখনো তিনি ‘পাপ্পু’ নামেই পরিচিত। তার বেহাল দশায় ঠেক দিতে শেষ মুহূর্তে এসে মাঠে নামানো হয় তার বোন সুদর্শনা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। বলা হয়, প্রিয়াঙ্কা হলেন ঠাম্মা ইন্দিরা গান্ধীর ফটোকপি। কিন্তু ইন্দিরার মতো দক্ষতার পরিচয় তিনিও দিতে পারেননি। উত্তর প্রদেশের বারানসী আসনে নরেন্দ্র মোদি যেখানে প্রার্থী হলেন, তার বিপরীতে প্রিয়াঙ্কা প্রার্থী হবেন হবেন করেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। এ ধরনের আরো কিছু সিদ্ধান্তহীনতাই কংগ্রেসকে দুর্বল করেছে। আর মানুষ তো স্বতঃসিদ্ধভাবেই শক্তির পূজারী। লোকসভা নির্বাচন-ভারত-ভাগ্য নির্ধারণতাই জিতেছেন শক্তিমান নরেন্দ্র মোদি, অ-বিকল্প নরেন্দ্র মোদি। বিরোধীরা যেখানে দিশাহীন, সিদ্ধান্তহীন, মোদি সেখানে হাজারো সঙ্কট মোকাবিলায় ব্যর্থতা সত্ত্বেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন বিকল্পহীন হিসেবে। এই বিকল্পহীনতাই তার জয়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামক।

তাহলে কি ভারতে আরো একবার অসাম্প্রদায়িকতা পরাস্ত হলো? ১৯৮০ সালে জন্ম নেওয়া বিজেপি এ পর্যন্ত চারবার জনরায়ে ভারতের মসনদে বসার সুযোগ পেলো। এর আগে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে দু’বার। আর এই নিয়ে টানা দু’বার মোদির নেতৃত্বে। এ সময়কালে কতোখানি পাল্টালো ভারত? সাম্প্রদায়িকতার হিংসা নিঃসন্দেহে বেড়েছে। জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে মানুষ মারা হচ্ছে বিভিন্ন স্থানেই। গোমাংস কাণ্ডে খুনোখুনিও হয়েছে বহুবার। এসব হিংসা এতোদিন পশ্চিমবাংলা আর ত্রিপুরায় না থাকলেও এখন শুরু হয়েছে। রাম মন্দির আর বাবরি মসজিদ বিতর্কে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে এর আগেই। গুজরাটের সবরমতী এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার ঘটনারও সাক্ষী হয়েছে ভারত।

কিন্তু যে নরেন্দ্র মোদির হাতে গুজরাটের রক্তের দাগ লেগে থাকার অভিযোগ, সেই মোদি যখন কেন্দ্র সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তখন তিনি বিনয়ী। বলছেন, “ধর্মের কার্ড খেলে ভারতকে অন্যরাই এতোদিন বিভাজিত করে রেখেছেন। এ সুযোগ আর দেওয়া হবে না।” বলছেন, “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস-এই নিয়েই নতুন ভারত।” এমনকি প্রণব বাবুও মোদির এই স্লোগানের ভূয়সী প্রশংসা করে তার দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করে মিষ্টিমুখ করিয়েছেন। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু মুসলমান অধ্যুষিত অনেক এলাকাতেও বিজেপি ভালো ফল করেছে।

ভারতের সাম্প্রদায়িকতা আজকের নতুন ঘটনা নয়। এর জন্ম ১৯৪৭ সালে। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের সময়ই। সে সময় জাতি নয়, সংস্কৃতি নয়, ভাষা নয়, কেবল ধর্মের ভিত্তিতেই দুটো দেশের জন্ম হয়েছিলো। হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান তথা ভারত আর মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান বানিয়ে ভারতবর্ষকে দুই ভাগ করা হয়েছিলো।

পাকিস্তানের এক ভাগ আজ বাংলাদেশ। না, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। বাংলা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর একাত্মবোধ আর বাঙালি জাতীয়তাবোধের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে ত্যাগ করতে যুদ্ধও করেছিলো বাংলাদেশের মানুষ। ফলে তৎকালীন ভারতবর্ষের মধ্যে আজকের বাংলাদেশই কেবল নিজেকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারত কিংবা পাকিস্তান তা পারেনি।

কিন্তু জন্মের পর থেকেই সামরিকতন্ত্র আর স্বৈরাচারী শাসন পাকিস্তানকে গ্রাস করেছে। আর গণতন্ত্র ভারতকে সৌন্দর্য দিয়েছে। এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আগেও তিনবার বিজেপির শাসন দেখা হয়েছে। চতুর্থবারে এসে যেন নরেন্দ্র মোদির ভারত গণতন্ত্রের সৌন্দর্য থেকে নিজেকে বিচ্যুত না করে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View