চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘অন্ধজনে দেহো আলো’

আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তাও শতাব্দী, যুগ কিংবা বছর পরে নয়, মাত্র এক মাসের মধ্যেই। আজ থেকে ঠিক এক মাস আগে (১৮ মার্চ) করোনাভাইরাসের প্রচণ্ড ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে প্রশাসনের নির্দেশকে অমান্য করে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলায় হেয়ালী আর আবেগী এক গণজমায়েতের আয়োজন করা হয়েছিল।

সেদিন প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য সেই বিশাল গণজমায়েতের আয়োজন করে রায়পুরের হায়দরগঞ্জ সাইয়্যেদ মঞ্জিল। আর মোনাজাতে বয়ান করেছিলেন চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব মাওলানা ছাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন আল-মাদানী।

বিজ্ঞাপন

তাদের ওই কাণ্ড দেখে পুরো দেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছাড়িয়েছিল দেশের গন্ডি। আন্তর্জাতিক বহু গণমাধ্যমের প্রথম পাতায় জায়গা করেছিল সেই খবর। তা দেখে বেশির ভাগ মানুষেরই মন্তব্য ছিল, এ যেন করোনাভাইরাসকে তাড়াতে গিয়ে তাকে সমাদরে ডেকে আনার আয়োজন। পরে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। কিন্তু ওই নড়াচড়া পর্যন্তই।

আজ এক মাস পরে আবার সেই ঘটনা ঘটলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পূর্ব অনুমতি এবং ঘোষণা ছাড়াই অঘোষিত লকডাউনের মধ্যে সেখানে লাখো মানুষ যোগ দিয়েছে খেলাফত মজলিশ নেতা জুবায়ের আহমদ আনসারীর নামাজে জানাজায়। করোনাঝুঁকি আর সরকারের নির্দেশ থোরাই কেয়ার করে সকালে তারই প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় ওই বিশাল জমায়েতের আয়োজন করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তাতে ইমামতি করেন জুবায়ের আহমেদের ছেলে মাওলানা আসাদ উল্লাহ।

বিজ্ঞাপন

অদ্ভুত! আমরা জানি, গত এক মাসে বিশ্বের সাথে সাথে বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতির কথা না হয় বাদই দিলাম। লক্ষ্মীপুরের সেই সমাবেশের দিনই প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল দেশে। এই সংখ্যা এখন সরকারি হিসাবেই ৮৪ জন। আর আক্রান্ত ২ হাজার ১৪৪ জন। পৃথিবীর বড় বড় দেশও তাদের নাগরিকের প্রাণ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে এবং হচ্ছে।

ভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য সরকার প্রায় মাসখানেক ধরে অফিস-আদালত-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ সবকিছুই বন্ধ রেখেছে। সীমিত করা হয়েছে উপাসনালয়ে গিয়ে প্রার্থনাও। এতে কোটি কোটি মানুষ নানাভাবে কষ্ট সহ্য করছেন। বহু মানুষের ঘরে খাবার নাই। অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যত অন্ধকারে ঢাকা। তারপরও তারা সর্বোচ্চ ত্যগ স্বীকার করে ঘরে অবস্থান করছেন। আর কিছু মানুষ এ কি করছে!

ধরে নিলাম মৃত ব্যক্তি বড় ধর্মীয় বক্তা, তাকে অসংখ্য মানুষ ভালোবাসেন; এমনকি তার জন্য সীমাহীন আবেগ রয়েছে অগণিত মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু তাই বলে কি এমন আত্মঘাতী আয়োজন করতে হবে? দেশের এই পরিস্থিতিতে অন্যভাবেও তো তাকে শ্রদ্ধা জানানো যেত? তাহলে কেন এত বড় ঝুঁকি নেওয়া হলো? পুরো জাতিকে ঝুঁকিতে ফেলা হলো?

আর স্থানীয় প্রশাসনের বড় কর্মকর্তারাই বা কি করলেন? সব জেনেও কেন আয়োজকদের শুধু অনুরোধ করেই চুপ করে থাকলেন? কেন আরও বড় পদক্ষেপ নিলেন না? চোখ বন্ধ করে থাকলেই কি প্রলয় বন্ধ হবে?

আমরা জানি, এর সদুত্তর কেউ দিতে পারবেন না। একে অন্যের কাঁধে দায় চাপাবেন। লক্ষ্মীপুরের মতো একইভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারপর আর কারো দায় থাকবে না। আর ক্ষতি যা হবে, সেটা পুরো দেশের, জাতির। আমাদের প্রশ্ন, এই অন্ধত্ব দূর হবে কবে?