মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে বিচার প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দিয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাকামীদের বিচার চাইলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তাদের বক্তব্য, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই সাকা চৌধুরী বা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং অন্যদের মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের বিচার হলে ‘একইরকম অপরাধে’ কেনো মুক্তিযোদ্ধাদের বিচারের আওতায় আনা হবে না সেই প্রশ্নও তুলেছে অ্যামনেস্টি।
ফাঁসির রায় নিশ্চিত হওয়ার পরও তারা রিভিউ আবেদনের যে সুযোগ পেয়েছে ২ নভেম্বর তার শুনানির দিন চারেক আগে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বিরোধীদলের নেতা হিসেবেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।
অ্যামনেস্টির এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ১৯৭১ সালে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে তার বেশিরভাগই করেছেন জামায়াতের নেতারা। তাই বিচারের আওতায় তারাই আসছেন বেশি। কিন্তু এই তালিকা থেকে যেমন বিএনপির নেতারা বাদ যাননি তেমনই বাদ যাচ্ছেন না আওয়ামী লীগে থাকা কোনো নেতাও।
‘এরইমধ্যে আওয়ামী লীগে থাকা যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত নেতারাও বিচারের আওতায় এসেছেন। যুদ্ধাপরাধ করে রাজনীতি করি বলেই আমি মাফ পেয়ে যাবো এমনটাতো কখনো হওয়ার কথা নয়।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তাদের বক্তব্য, জাতিসংঘও নাকি একইরকম প্রশ্ন তুলেছে। আদতে জাতিসংঘ কখনোই ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, তবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তাদের আপত্তি ছিলো।
এ বিষয়ে তুরিন আফরোজের বক্তব্য: আমরা আমাদের দেশের নাগরিকের বিচার করছি, তাতে মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কি আছে? এদেশে এতোসব বিচার হচ্ছে, সেসব ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন নেই। শুধুমাত্র সেই সব নেতা যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিস্ট নিয়োগ করেছেন তাদের বিচার নিয়েই কেনো প্রশ্ন উঠছে?
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এতোদিন ‘মানবাধিকার রক্ষায়’মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আপত্তি তুললেও এখন আর শুধু সেই অবস্থানে নেই। এবারের বিবৃতিতে সেই প্রসঙ্গের পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলে যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারাও যুদ্ধাপরাধ করেছে দাবি করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রশ্ন তুলেছে, শুধু এক পক্ষের বিচার হবে কেনো? ‘যুদ্ধাপরাধ করা মুক্তিযোদ্ধাদের কেনো বিচার করা হচ্ছে না সেই প্রশ্নও তুলেছে অ্যামনেস্টি।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, যুদ্ধ করাটা কিন্তু অপরাধ নয়, অপরাধ হচ্ছে যুদ্ধের আইন ভাঙা। সেই সময়ে স্বাধীনতাকামী মানুষগুলো আত্নরক্ষার্থে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু তারা তো পাকিস্তানীদের গিয়ে মেরে আসেনি, যেটা পাকিস্তানী সেনারা করেছে, আমাদের দেশের যেসব রাজাকার-আল বদর ছিলো তারা করেছে।
‘আল-বদর রাজাকাররা পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে মিলে শুধু যুদ্ধরত মানুষদেরই হত্যা করেনি, হত্যা করেছে এবং দেশের সাধারণ নিরপরাধ নাগরিকদের ধর্ষণ করেছে। এরকম অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলায় প্রসিকিউশনের ৬ নম্বর সাক্ষী নিয়েও কথা রয়েছে। সেখানে আসামীপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য প্রতিধ্বনি করে বলা হয়, ৬ নম্বর সাক্ষী বলেছিলেন যে তার বক্তব্য যিনি সমর্থন করতে পারেন তিনি মারা গেছেন। ‘কিন্তু আসলে তিনি মারা যাননি এবং এ বিষয়ে একটি হলফনামাও দিয়েছেন।’
তবে পাল্টা যুক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ কি বলেছে সে বিষয়ে একটি শব্দ উচ্চারণ না করে সর্বোচ্চ আদালত ‘ব্যর্থ’ হয়েছে বলে অভিযোগ এনেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
এরকম অভিযোগকে আন্তর্জাতিক আইনে শিষ্টাচার বহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।
‘যে কোনো যুদ্ধাপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এবং সেটা প্রথমে হতে হবে তার দেশে। এটাই আন্তর্জাতিক নিয়ম। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা কি করে এর বিরুদ্ধচারণ করতে পারে তা কারো বোধগম্য নয়।’
বিবৃতিতে অ্যামনেস্টির সাউথ এশিয়া রিসার্চ ডিরেক্টর ডেভিড গ্রিফিথ বলেন: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অপরাধগুলো ভীতিকর। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড শুধুমাত্র সন্ত্রাসের দিকে ঠেলে দিবে। ন্যায্য বিচার ছাড়া মৃত্যুদণ্ড আরো বিরক্তিকর।
তিনি দাবি করেন, সাকা এবং মুজাহিদের বিচার এবং আপিল প্রক্রিয়া পরিস্কারভাবেই ত্রুটিপূর্ণ ছিলো। ২ নভেম্বর রিভিউ আবেদনের শুনানির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন: ‘এখন তারা যে মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষায় আছে সেটা ন্যায়বিচারের বদলে ভুলভাবে বিচারের ফল।’
মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদের আবেদনের শুনানি আগামী ২ নভেম্বর আপিল বিভাগের বিশেষ বেঞ্চে হবে। এর আগে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দু’জনকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। রিভিউ আবেদন নাকচ হয়ে গেলে তাদের ফাঁসি কার্যকর করতে আর কোনো বাধা থাকবে না।







