অর্ধনারীশ্বর। অর্ধেক নারী আর অর্ধেক ঈশ্বর। অতৃপ্তির আঁচে শুরু হয় সময় ফুরিয়ে আসার সুর। ভারতীয় নৃত্যের আদিশাস্ত্র’তে একে বলা হত ওড্র-মাগধী। ভুবনেশ্বরের কাছে উদয়গিরি পর্বত শরীরে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে মিলেছিল খোদাইচিত্র। ভারতের আটটি ধ্রুপদী নৃত্যশৈলীরও অন্যতম ওড়িশি নাচ নিয়ে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের শেষ দিনের শুরু হয়।
বিদূষী সুজাতা মহাপাত্রের অনুপম নৃত্যশৈলীতে সূচনা হয় শেষের। সহশিল্পী সৌম্য বোসকে নিয়ে ওড়িশির বিভিন্ন প্রকার নৃত্যশৈলী পরিবেশন করেন সুজাতা মহাপাত্র। সৌম্যরঞ্জন যোশি’র বাঁশি, রুপকের পারিদারমেশ চন্দ্র দাসের বেহালা, একলব্য মৃদুলির পাখোয়াজ এবং জয়দেব দাশ এর মায়াবী আলোক প্রক্ষেপণে কৃষ্ণ বিরহাতুর রাধা ‘র ত্রিভঙ্গির বিভিন্ন মুদ্রায় মোহিত হয় এক ঘন্টার শেষের সূচনা পর্ব।
ব্রিটিশ আমলে নৃত্যশৈলীটি প্রায় মরে গিয়েছিল। কিন্তু ৪৭ এর স্বাধীনতার পর পুনরুজ্জীবন ঘটে। ওড়িশি নৃত্যে ত্রিভঙ্গি (মাথা, বুক ও শ্রোণীর স্বতন্ত্র সঞ্চালনা) এবং চৌকা (মৌলিক চতুষ্কৌণিক ভঙ্গিমা) এ দুয়ের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব নাচটিকে অন্যান্য শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী থেকে পৃথক করেছে।
ওড়িশি সংস্কৃতিতে তিনটি ঘরানার উপস্থিতি দৃশ্যমান। মহারি, নর্তকী ও গোতিপুয়া। ওড়িশার মন্দিরগুলিতে দেবদাসীদের মহারি নামে অভিহিত করা হত। শব্দটির উৎস মহা ও নারী শব্দদ্বয়; দুয়ে মিলে মহারি বা নির্বাচিত কথাটি এসেছে। এই দেবদাসীরা মূলত পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নর্তকী ছিলেন। প্রাচীন মহারিগণ মন্ত্র ও শ্লোকের ভিত্তিতে নৃত্য (বিশুদ্ধ নৃত্য) ও অভিনয় (কাব্যপাঠ) উপস্থাপনা করতেন। পরবর্তীকালের মহারিগণ জয়দেব রচিত গীতগোবিন্দম্ কাব্যের গীতিকবিতাগুলির সঙ্গতে নৃত্য উপস্থাপনা শুরু করেন। ভিতরি গৌণী মহারি-রা মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু বাহারি গৌণী মহারি-রা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারলেও গর্ভগৃহে তাঁদের প্রবেশাধিকার নেই।
গোতিপুয়া ঘরানার শুরু খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে। এই ঘরানার উদ্ভবের অন্যতম কারণ ছিল বৈষ্ণবধর্মে নারীর নৃত্য স্বীকৃত ছিল না। গোতিপুয়ারা’য় ছোটো ছোটো ছেলেদের মেয়ে সাজিয়ে দেবদাসীদের মাধ্যমে নৃত্যশিক্ষা দেওয়া হত। এই সময় বৈষ্ণব কবিরা ওড়িয়া ভাষায় অনেক রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদ রচনা করেন। গোতিপুয়ারা এই সকল পদের সঙ্গতে মন্দিরের বাহির প্রাঙ্গনে নৃত্য করত। নর্তকী নৃত্যশৈলীটির উদ্ভব প্রাক-ব্রিটিশ যুগে। ওড়িশার রাজপ্রাসাদে এই নৃত্য উপস্থাপিত হত। এই সময় দেবদাসীপ্রথার অবমূল্যায়ণ ভীষণভাবে সমালোচিত হয়। এই কারণে মন্দির থেকে দেবদাসী প্রথার উচ্ছেদ করা হয় এবং রাজসভাতেও এই প্রথা অপ্রচলিত হয়ে পড়ে। কেবলমাত্র গোতিপুয়া ঘরানার কিছু উদাহরণ টিকে যায়। এই নৃত্যর পুনরুজ্জীবনের সময় প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক উপাদানগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যার ফলে বর্তমানে এই নৃত্যশৈলীতে শুদ্ধতাবাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা হয়।
তারপর কেবল অপেক্ষা পণ্ডিত বিশ্বমোহন ভট্ট এর মোহন বীণা, ব্রজেশ্বর মুখার্জির খেয়াল, পণ্ডিত কুশল দাস ও কল্যাণজিত দাসের বাঁশি, পণ্ডিত কৈবল্যকুমারের সেতারের জন্য। আর উৎসবের শেষ ভোর হবে পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া’র বাঁশির ইন্দ্রজালে।
ছবি: তানভীর আশিক








