গোটা পৃথিবীতেই শরৎ এবং বসন্তের মধ্যবর্তী সময়টি শীতকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলায় অবশ্য শরৎ এবং বসন্তের মাঝে শীত ব্যতীত হেমন্তর উল্লেখ বিদ্যমান। মূলত: আপন অক্ষবৃত্তে পরিভ্রমণের সময় পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব যে সময়টা সবচেয়ে বেশি থাকে, সে সময়টাই শীতকাল।
মেরু প্রদেশে দ্রুততম সূর্যোদয় এবং সবচেয়ে দেরিতে হয়ে থাকা সূর্যাস্তের সময় মূলত: পৃথিবীর অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশের হের-ফেরের কারণে হয়ে থাকে। প্রতিবছর ২০-২২ ডিসেম্বর বছরের ক্ষুদ্রতম এবং ২১শে জুন বছরের দীর্ঘতম দিন হয়ে থাকে। সূর্যের সাথে পৃথিবীর এই আবর্তন পরিক্রমায় সৃষ্ট দূরত্বের পার্থক্যের কারণেই যা ভূগোলের প্রাথমিক পাঠ থেকে যে কেউ জানেন।
শীতকাল নিয়ে গ্রিক পুরাণে প্রচলিত কাহিনী হচ্ছে যে পাতালের রাজা হাদেস পৃথিবী বা দেমেতেরের মেয়ে পার্সেফোনেকে অপহরণ করে নিয়ে যান। পৃথিবী বা দেমেতের এ ঘটনায় ভয়ানক কষ্ট পান। পৃথিবীকে সামলাতে দেবরাজ জিউস হাদেসকে বলেন, পার্সেফোনেকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে।
চতুর হাদেস তখন পার্সেফোনেকে পাতালপুরীতে মৃতদের খাদ্য কৌশলে খাইয়ে দেন। এই প্রেক্ষিতে দেবরাজ জিউস নিয়ম করেন যে বছরের ছয়মাস পার্সেফোনে পাতালের উপরে পৃথিবীতে তার মায়ের কাছে থাকবে। আর বাকি ছয় মাস থাকবে পাতালে। পার্সেফোনে যখন মায়ের কাছে থাকেন সেই ছয় মাস বসন্ত আর গ্রীষ্মকাল। যে ছয় মাস মা’কে ছাড়া পাতালপুরীতে নিরানন্দ অবস্থায় সে থাকেন, সেই সময়টি শীতকাল।
পশ্চিমে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারিত হবার আগে ইউরোপীয় প্যাগান ধর্ম অনুসারে শীতের সময়টা নানা ধরণের অনুষ্ঠান হতো। একটি বড় কারণ ছিল এ সময় কৃষি কাজের পরিশ্রম তুলনামূলক কম থাকে আর সামনেই বসন্তে ফসল কাটা হবে। এই উপলক্ষে রোমক স্যাটার্নালিয়া (সবুজ বৃক্ষ এবং আলোর অনুষ্ঠান) বা স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ান আর জার্মান সংস্কৃতিতে ইয়ুল পার্বণের নানা আচার পরবর্তীতে ক্রিস্টমাসে গৃহীত হয়েছে। এমনকি আজকের ক্রিস্টমাস ক্যারল গানের অনুষ্ঠান পর্যন্ত অতীতে প্যাগান ইউরোপের শীতকালীন কোলেদা গানের আচারেরই সংশোধিত রূপ।
খোদ ২৫শে ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন বা বড়দিনের সর্বজনীন আচার রোমক সম্রাট অ্যারেলিয়ান (২৭০-২৭৫ অব্দ) প্রবর্তিত দাইস নাতালিস সলিস ইনভিক্টি (Dies Natalis Solis Invicti) বা অপ্রতিহত সূর্যের জন্মদিনের অনুকরণে গৃহীত। বারো শতকের সিরিয়ান আর্চবিশপ জ্যাকব বার-সালিবি রচিত একটি পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায়, অতীতে প্যাগান বা পৌত্তলিকেরা ২৫শে ডিসেম্বর সূর্যের জন্মদিন উপলক্ষে আলো জ্বালাতো। খ্রিষ্ট ধর্মের প্রবর্তকগণ ইউরোপে নতুন ধর্মকে জনপ্রিয় করতে ২৫শে ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন হিসেবে সাব্যস্ত করেন আর দেখতে দেখতে আঠারো এবং উনিশ শতক নাগাদ ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিন অনুষ্ঠান অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। অবশ্য এই সব আচার-অনুষ্ঠানের মূল পশ্চিমে শীতের শেষে বসন্তের আগমন উপলক্ষে নানা কৃষিভিত্তিক পার্বণ।
আন্তর্জাতিক পরিসরে শীতকে কেন্দ্র করে তুলনামূলক ধর্ম বা পুরাণের বিশ্লেষণে যাবার আগে বাংলায় শীতকে ঘিরে নানা আচার-অনুষ্ঠান, লোককথা বা সমগ্র বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথের লেখায় শীতের উল্লেখ কিভাবে এসেছে সে নিয়ে একটু বরং আলোকপাত করা যাক।
পুষ্যা এবং মঘা- এই দুই নক্ষত্রের নামে বাংলার শীতের দুই মাস পৌষ এবং মাঘের নামকরণ হয়েছে। মূলত: বাংলা বারো মাসের নামই কোন না কোন নক্ষত্রের নামে। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের নামে বৈশাখ, চিত্রা নক্ষত্রের নামে চৈত্র বা জ্যেষ্ঠার নামে জৈষ্ঠ্য। খনার বচনে শীত নিয়ে জনপ্রিয় শ্লোকগুলোর মধ্যে- যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ, যদি বর্ষে আগনে, রাজা যায় মাগনে প্রভৃতি আজো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
বাংলা সাহিত্য এবং সঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের প্রকৃতি পর্যায়ে শীত নিয়ে গান সংখ্যা মোট বারোটি। বর্ষা, বসন্ত বা শরৎকে কেন্দ্র করে কবির গানের সংখ্যার তুলনায় শীতকে নিয়ে লেখা গানের সংখ্যা অবশ্য বেশ কমই বলা যায়। তবু শীতের জীর্ণতা আর রুক্ষ কঠোরতা নানা ভাবে ফুটে উঠেছে এই স্বল্প সংখ্যক গানেই।
এর ভেতর কিছু গান বিশিষ্ট শিল্পীদের কণ্ঠে অমরত্ব পেয়েছে। যেমন, দেবব্রত বিশ্বাস বা জর্জ দা’র গমগমে পৌরুষ স্বরে শীতের বনে কোন্ সে কঠিন আসবে ব’লে/শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে বা রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গলায় এল যে শীতের বেলা বরষ-পরে…এমন সব গান চিরস্মরণীয়। এল যে শীতের বেলা গানটিতে একাধিক রাগ ভেঙে-চুরে ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ।
ইমন কল্যাণ বা পূরবী মিলে-মিশে যায় ফসলক্ষেতে শীতের সন্ধ্যার কাজ শেষের শূন্যতা আর আকাশে উদীয়মান সন্ধ্যাতারার মন কেমন করা বিষাদমগ্ন সৌন্দর্য বোঝাতে। প্রথম অন্তরার পর সঞ্চারীতে খুব সাদাসিধাভাবে বলা হয়: বাহিরে কাজের পালা হইবে সারা/আকাশে উঠিবে যবে সন্ধ্যাতারা।
শীত যেন এক সন্ন্যাসী যাকে উদ্দেশ্য করে বাংলাগানের প্রধান ভাস্কর বলেন, হে সন্ন্যাসী, হিমগিরি ফেলে নীচে নেমে এলে কিসের জন্য… যাহা-কিছু ম্লান বিরস জীর্ণ দিকে দিকে দিলে করি বিকীর্ণ/বিচ্ছেদভারে বনচ্ছায়ারে করে বিষণ্ণ।
তবে শীত বাঙালীর জন্য শুধু রিক্ততাই বহন করে আনে না। কৃষি প্রধান বাঙালীর জন্য ফসল কাটার মাস পৌষ অনেক আনন্দ নিয়ে আসে বৈকি। সেই আনন্দ উদযাপিত হয়: পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়/ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে, মরি হায় হায় হায় জাতীয় আহ্বানে। শুধু গান বা কবিতা রচনা নয়, রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে পৌষ মেলার প্রবর্তন করে গেছেন। ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর (১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কুড়ি জন অনুগামীকে নিয়ে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের থেকে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। এটিই শান্তিনিকেতনের পৌষ উৎসবের মূল ভিত্তি।
১৮৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর (১২৯৮ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ) শান্তিনিকেতনে একটি ব্রাহ্মমন্দির স্থাপিত হয়। ১৮৯৪ সালে ব্রাহ্মমন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী স্মরণে মন্দিরের উল্টোদিকের মাঠে একটি ছোটো মেলা আয়োজন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের সেই পৌষমেলা শুধুমাত্র বীরভূম জেলার নয়, অন্যান্য অঞ্চলের পর্যটকেদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। প্রথম দিকে ব্রাহ্মমন্দিরের (যা কাঁচমন্দির নামেও পরিচিত) উত্তর দিকের মাঠে মেলা আয়োজিত হত। সেই দিন সান্ধ্য উপাসনার পর বাজি পোড়ানো হত। পরে মেলার আয়তন বৃদ্ধি পেলে শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীর মাঠে মেলার আয়োজন শুরু হয়।
প্রতিবছর শান্তিনিকেতনে পৌষ উৎসব শুরু হয় ৭ পৌষ (২৩ ডিসেম্বরের কাছাকাছি কোনো তারিখ) তারিখে। ভোরবেলায় সানাই বাদনের আয়োজন করা হয়। বৈতালিক দল গান গাইতে গাইতে আশ্রম পরিক্রমা করে। এরপর ছাতিমতলায় উপাসনার আয়োজন করা হয়। এরপর উপস্থিত সবাই গান গাইতে গাইতে উত্তরায়নে উপস্থিত হন।
আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চল বা শহরে শীতের সময়েই মূলত: নানা গানের অনুষ্ঠান, কনসার্ট থেকে পালা গানের আসর, যাত্রা, সার্কাস বেশি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। গরমের দেশে শীতের এ সময়টা তুলনামূলক সুখপ্রদ। নানা ধরণের শীতকালীন সব্জি বা পিঠে-পুলির এটাই সময়।
তবে শীত নিয়ে গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যত পুরাণ, লোককাহিনী, গল্প, কবিতা বা গানই প্রচলিত থাকুক না কেন, ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে নর্ডিক বা নর্স পুরাণে ফিম্বুল উইন্টার-এর রূপকল্পনা। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সু্ইডেন, আইসল্যান্ড বা গ্রিনল্যান্ডের মত উত্তুরে দেশগুলো যখন প্যাগান ছিল বা আঞ্চলিক কৃষ্টি নির্ভর বহু দেব-দেবীর উপাসনা করতো, সেই সময়কার নর্ডিক বা নর্স পুরাণে ফিম্বুল উইন্টারের কথা বলা হয়েছে।
এই ফিম্বুল উইন্টার হলো শীতের সেই নিষ্করুণ রূপ যখন পরপর তিনটি বছর শুধু শীতকালই আসবে আর কোন গ্রীষ্মকাল দেখা দেবে না। প্রকৃতির সেই নিষ্ঠুরতা এতই চরম হবে যখন দশ দিগন্ত হতে উড়ে আসা তীব্র তুষারপাতে শস্যহীন, ফসলহীন মানুষ হতাশার অন্তিমে গিয়ে ভাই ভাইকে হত্যা করবে। দেখা দেবে রাগনারোক বা প্রলয়কাল। দেব-দেবীরা পর্যন্ত পরষ্পরের সাথে যুদ্ধ করবে। ভ্রাতৃ-সম্বন্ধ বা জ্ঞাতি সম্বন্ধ সব মুছে যাবে।
সম্ভবত: ৫৩৫-৫৩৬ অব্দে গোটা উত্তর ইউরোপে তাপমাত্রা ভয়াবহ কমে আসার সময়টি এই পুরাণকথায় বর্ণিত। ৬৫০ অব্দে নর্ডিক দেশগুলোয় সূচীত এক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানে নর্ডিক তাম্র যুগের শেষ হয়। এই জলবায়ু পরিবর্তনের আগে নর্ডিক দেশগুলোয় জলবায়ু তুলনামূলক উত্তপ্ত এবং আরামদায়ক ছিল। প্রাচীন নর্স ভাষায় ফিম্বুল অর্থ বিশাল বা ভয়াবহ। ফিম্বুল উইন্টার অর্থ তাই ভয়াবহ শীত। এই নিষ্করুণ শীতে নেমে আসবে অনি:শেষ রক্তক্ষয়ী আর ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ।
নর্ডিক অঞ্চলের পুরনো দিনের কাব্য পোয়েটিক এড্ডা-য় এই ভয়াবহ সময়ের বিবরণ রয়েছে কবিতার ছন্দে। তেরো শতকের এই কাব্য সঙ্কলনে অতীতের গল্প-গাঁথা বা প্রোজ এড্ডা থেকে ফিম্বুল উইন্টার এবং রাগনারোকের কথা ছন্দবদ্ধ করা হয়।
বলা হয় যে খোদ দেবতা থর, তির, ফ্রেইর, হেইমডাল্লর বা লোকি পরষ্পর দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন। গোটা পৃথিবী তলিয়ে যাবে অতল জলে এবং তারপর নতুন উর্বরা মৃত্তিকা দেখা দেবে। মাত্র দু’জন মানব-মানবী এই বিপর্যয় সহ্য করতে পারবে এবং তারাই নতুন বংশ বিস্তার করবে। প্রখ্যাত জার্মান সুরকার রিচার্ড ভাগনার এই রাগনারোকের রূপকল্পনায় মুগ্ধ হয়ে সৃষ্টি করেন গটডেরডাম্মেরাঙ সিম্ফনী (১৮৭৬)।
তেরো শতকের নর্ডিক কাব্য সঙ্কলন পোয়েটিক এড্ডায় বলা হচ্ছে:
ভাইয়েরা যুদ্ধ করবে পরষ্পর/ হত্যা করবে একে অন্যকে আহা/ বোনের সন্তানেরা টুটাবে জ্ঞাতি-বন্ধন/ ক্রুর পৃথিবীতে বাড়বে গণিকাবৃত্তি/ -কুঠারযুগ, তরবারী যুগ/ -ঢাল ভেঙে টুকরো টুকরো/ বাতাসের যুগ, একটি নেকড়ে যুগ-/ গোটা পৃথিবী হঠকারী হবার আগে/ কোন মানুষেরই দয়া মায়া থাকবে না অন্য কারো প্রতি।
নৃ-তাত্ত্বিক এবং প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, নর্স পুরাণের এই প্রলয়কালের সাথে অন্যান্য ইন্দো-ইউরোপীয় পুরাণের প্রলয়কালের মিল আছে। ইরানের জরস্থ্রুসীয়ান ধর্মের বুন্দাহিশন বা ইইমা যেন নর্স ফিম্বুল উইন্টারের একটি রূপ। কিম্বা ভারতীয় পুরাণে দেবতা বিষ্ণু বন্য বরাহের রূপ ধরে যে প্রলয় সংহারী মূর্তিতে আবির্ভূত হন…এই যাবতীয় শেষ সংগ্রামের রূপকল্পটি সমগ্র ইন্দো-ইউরোপীয় সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বলেই মনে হয়।
(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







